অর্থ পাচার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৬, ০০:৫৭
মায়ানমার থেকে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকা উখিয়া, টেকনাফ ও চট্টগ্রাম হয়ে দেশের ভিতর বানের মতো ঢুকছে মাদকের চালান। এ সব চালানে সিংহভাগই বহুল আলোচিত মাদক ইয়াবা। রাতারাতি কালো টাকা কামাতে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাদক চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ায় মাদকের চালান কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না। মাদকবিরোধী সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, মাদক পাচারকারীদের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা।
 
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইয়াবা সেবনকারীদের সংখ্যা দেশে সর্বাধিক। এই ধরনের মাদকে তরুণ-যুবকরাই বেশি আসক্ত। ইয়াবা চালানের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তারা মনে করছেন, সারাদেশে এই মাদকে আসক্ত তরুণ-যুবকের সংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ। ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল্য আগে ছিল প্রতিটি ৫০০ টাকা। বর্তমানে তা কমে প্রতিটির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকা। আনুষ্ঠানিক কোনো জরিপ না হলেও তারা মনে করছেন, বছরে দেশ থেকে ইয়াবা পাচারকারীরা ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা পাচার করছে। মাদক খাতে বিপুল অঙ্কের কালো টাকার বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক।
 
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক আলী আসলাম ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, মাদক, বিশেষ করে ইয়াবার চাহিদা দেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে। পাচার হয়ে আসা মাদকের মধ্যে বেশি আসছে ইয়াবা, তারপর আসছে ফেন্সিডিল ও হেরোইন। তবে এ সব মাদকের কোনোটিই দেশের ভিতর উত্পাদন হয় না। এগুলো আনতে গিয়ে নিঃসন্দেহে দৃর্বৃত্তরা দেশের বাইরে পাচার করছে বিপুল অঙ্কের টাকা। তিনি বলেন ইয়াবাসহ অন্য মাদকদ্রব্য যে পরিমাণে পাচার হয়ে আসছে তার মাত্র ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ ধরা পড়ছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ডসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। বাদবাকী ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ চালান নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচে-কানাচে। দেশের ভেতরেও ইয়াবার চাহিদা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইয়াবা ধরা পড়ার পরিমাণই তা প্রমাণ করে। তার মতে, চট্টগ্রামই সারাদেশে ইয়াবা ছড়িয়ে দেওয়ার ট্রানজিট পয়েন্ট। মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবার বেশিরভাগ চালানই আসে জলপথে।
 
বছরওয়ারি ইয়াবা ধরা পড়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি জানান, ২০১১ সালে ৮ লাখ পিস, ২০১২ সালে ১৩ লাখ পিস, ২০১৩ সালে ২২ লাখ পিস, ২০১৪ সালে ৬৭ লাখ পিস এবং ২০১৫ সালে ১ কোটি ৯৫ লাখ পিস ইয়াবা ধরা পড়েছে। তিনি জানান, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে চট্টগ্রামের ৭০/৮০টি স্কুল কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ইয়াবা ও মাদকবিরোধী প্রচারণা চালানো হয়েছে। তিনি মনে করেন এই প্রচারণাটি সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিতে এখনই শুরু করা দরকার। প্রতি মাসে একবার দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘ডোপ টেস্ট’ করা দরকার। যার শরীরে মাদকের অস্তিত্ব ধরা পড়বে তাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার নিয়ম চালু করারও পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, উত্সুক্য থেকে একবার দু’বার মাদক গ্রহণের চেয়ে, সঙ্গদোষে পড়ে মাদক গ্রহণ সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আফজল হোসেন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, পারিবারিক অশান্তি, দারিদ্র্য, প্রেমে ব্যর্থতা, বেকারত্ব ইত্যাদি নানা কারণ তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকাসক্তির দিকে নিয়ে যায়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার এবং এর মাধ্যমে মাদকের সহজলভ্যতা একটি বড় আশঙ্কার কারণ। এজন্য প্রতিটি পরিবার ও সরকারকে সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
 

ইত্তেফাক/এএন