দেশপ্রেম-সংগ্রামের প্রতীক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৬, ১৯:৩৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ব্রিটিস শাসনামল থেকে ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬৬-এর ছয় দফা, ‘৬৯-এর ‘গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান ‘মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন’সহ সব জাতীয় আন্দোলনের সূতিকাগার এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ।
 
এসব আন্দোলন থেকে উদ্দীপনা নিতে এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণীয় করে রাখতে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একাধিক ভাস্কর্য। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপিত হয়েছে। এসবের মধ্যে কলাভবনের সামনে ‘অপরাজেয় বাংলা’, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে ‘শান্তির পায়রা’, সড়ক দ্বীপের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’, টিএসসি চত্বরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য’, বেগম রোকেয়া হলের
ভেতরে ‘রোকেয়া ভাস্কর্য’, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে ‘মা ও শিশু ভাস্কর্য, জগন্নাথ ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মাঝামাঝি ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ উল্লেখযোগ্য।
 
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আসলেই কল্পনায় ‘অপরাজেয় বাংলা’র ছবিই প্রথমে ভাসে। ঢাবি আর অপরাজেয় বাংলা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আন্দোলন, মিছিল-মিটিংয়ের প্রাণকেন্দ্রও এই ভাস্কর্যটি। এখানে ছাত্র সংগঠনগুলোর বার্ষিক সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়।
 
এর নামকরণের পেছনে রয়েছে এক দারুণ ইতিহাস। ১৯৭৩ সালে ‘স্বাধীনতা ভাস্কর্য; নামে এর প্রাথমিক কাজ শেষ হয়। এই বছরের ২২ জুলাই তৎকালীন ‘দৈনিক বাংলায় সাংবাদিক সালেহ উদ্দীন ‘অপরাজেয় বাংলা’ শিরোনামে একটি উপসম্পাদকীয় লেখেন। সেই থেকে লোকজনের মুখে স্বাধীনতা ভাস্কর্যটির নাম হয় ‘অপরাজেয় বাংলা’।
 
IMG1
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিরল যারা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেন নি।
 
প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এর পাদদেশে ভিড় করেন। সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান ভাস্কর্য নিদর্শন। এটিও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সকল দাবি-দাওয়া, আন্দোলনের অন্যতম স্থান। দেশে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কিংবা সন্ত্রাসবাদ-মৌলবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে উত্তপ্ত হয়ে উঠে এই ভাস্কর্যের পাদদেশ। এখানে জমায়েত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে।
 
১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মিছিলে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মঈন হোসেন রাজুসহ সব শহীদের স্মরণে নির্মিত এ ভাস্কর্যটি। 
 
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বুকের তাজা খুন ঢেলে স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা উপহার দিয়েছে যারা তাদের স্মরণে নির্মিত এটি। এর নিচে খোদাই করে লেখা আছে ‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই-তার ক্ষয় নাই।’ প্রকৃতপক্ষে, দেশমাতৃকার জন্য নিজের জীবনকে যারা বিলিয়ে দিয়েছে, আজীবন তারা এ জাতির হৃদয়ের মণিকোঠায় ভাস্বর হয়ে থাকবেন।
 
IMG0
 
জগন্নাথ হলের পশ্চিম পাশে ফুলার রোডে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ভাস্কর্যটির অবস্থান। এক জায়গাতে এত ভাস্কর্য দেশের আর কোথাও নেই। মূল ভাস্কর্যটিতে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ তথা বিজয়ের আনন্দ ঠাঁই পেয়েছে।
 
ভাস্কর্যের সর্ব উঁচুতে বন্দুকের সঙ্গে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা বাঁধা। তার নিচে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক তর্জনীর উঁচু ভঙ্গিটি। মূল ভাস্কর্যটি ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন মনীষীর ছোট ছোট অনেক ভাস্কর্য। রাতে ভাস্কর্যটি অনুপম সৌন্দর্য নিয়ে উদ্ভাসিত হয়। অনেক রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা বোঝাতে রাতে লাল বাতি জ্বলে ওঠে। ভাস্কর্যটিতে ৪২টি বাতি, একটি সংকেত বাতি, একটি লাইটিং, একটি পানির পাম্প ও ছয়টি পানির ফোয়ারা সংযুক্ত করা হয়েছে।
 
ইট, পাথর আর কংক্রিট দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ভাস্কর্যগুলো নির্মিত হলেও এগুলো মোটেও জড় বস্তু নয়। ভাস্কর্যগুলো দেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থী-দর্শনার্থীরাদেশের জাতীয় আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাগ্রত হয় দেশপ্রেম।
 
ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় আমরা ভাস্কর্য স্থাপন করেছি। এগুলো আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এগুলোকে ধারণ করে। প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা এই ক্যাম্পাসে পড়ালেখা করতে আসে, তখন তারা এই ভাস্কর্যগুলো সম্পর্কে জানে। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ইতিহাস-ঐতিহ্য সঞ্চারিত হয়।
 
 
 
 
ইত্তেফাক/এমআই