বিআইডব্লিউটিসি’র ব্যয়বহুল নতুন জাহাজে লোকসান

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৬, ০০:০৯
দু’টি জাহাজ নির্মাণ করে ৫০ কোটি টাকা গচ্ছা দেওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় বিআইডব্লিউটিসি আরো নতুন জাহাজ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এ দু’টির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ কোটি  টাকা। এর বাইরে আরো চারটি জাহাজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বিআইডব্লিউটিসি’র। এ তথ্য জানিয়েছেন সংস্থার কর্মকর্তারা।
 
বিআইডব্লিউটিসি’র নৌযানে যাত্রী পরিবহনে সমস্যা ও সম্ভাবনা শীর্ষক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত আলোচকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। গত ৯ অক্টোবর জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে বিআইডব্লিউটিসি এ সভার আয়োজন করে। সভায় উপস্থিত বেসরকারি বিলাসবহুল ও অত্যাধুনিক  লঞ্চের মালিকরা সংস্থার সর্বশেষ নির্মিত ‘এমভি বাঙালি’ ও ‘এমভি মধুমতি’ জাহাজ দু’টির নির্মাণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিপুল টাকা ব্যয় নির্মিত সরকারি এ জাহাজ দু’টি সংস্থার লোকসানের বোঝা ভারী করছে। অথচ ৮-১০ কোটি টাকা কম খরচ করেও বেসরকারি লঞ্চ মালিকরা বিলাসবহুল ও অত্যাধুনিক নৌযান তৈরি করে বিপুল মুনাফা করছেন। নতুন নতুন বেসরকারি এসব নৌযানে যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে  পড়েন।
 
বিআইডব্লিউটিসি’র নৌযান দু’টি নির্মাণের পরই যাত্রীদের আস্থা হারায়। ভুল নকশায় তৈরি সরকারি জাহাজ যাত্রীবান্ধব হয়নি। ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণের কারণে জ্বালানি ব্যয় বেশি হওয়ায় ট্রিপ দিলেই লোকসান গুণতে হয় ‘এমভি বাঙালি’ ও ‘এমভি মধুমতি’কে।  ফলে লাভের আশা বাদ দিয়ে লোকসানের পরিমাণ কমাতে অলস বসিয়ে রাখা হয়। অলস বসিয়ে রাখা জাহাজ দু’টি যাতে অচল না হয়ে পড়ে সে জন্য  সপ্তাহে মাত্র একদিন রকেট সার্ভিসের যাত্রী পরিবহন করছে। তাতে প্রতি ট্রিপেই লোকসান হচ্ছে লাখ টাকার উপরে। ৬০-৬৫ বছরের পুরানো জাহাজ যাত্রী পরিবহন করলেও নতুন নির্মাণ করা জাহাজ অলস বসিয়ে রাখা হচ্ছে।  এ অবস্থায় নতুন জাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ যাত্রীদের আদৌ কোনো উপকারে আসবে নাকি বিআইডব্লিউটিসি’র লোকসানের বোঝা আরো বৃদ্ধি করবে তা নিয়ে সভায় প্রশ্ন ওঠে।
 
সংস্থার নিম্নমানের যাত্রীসেবা ও নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরা হয়। সভায় উপস্থিত বিআইডব্লিউটিসি’র পরিচালক (বাণিজ্য) শহিদুল ইসলাম যাত্রীদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বলেন, এ সব চিহ্নিত করতেই আমরা এ সভার আয়োজন করেছি। আরো দু’টি জেলায় এ রকম মতবিনিময় সভা করা হবে। একই সাথে তিনি জানান, নতুন আরো দু’টি জাহাজ ২০১৮ সালের জুন মাসে এ রুটে যুক্ত হবে। সংস্থার অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল আরো দু’টি জাহাজ নির্মাণের খবরে যাত্রীরা খুশি হতে পারেননি। কারণ, ইতোপূর্বে নির্মাণ করা জাহাজ ‘এমভি বাঙালি’ ও ‘মধুমতি’ শুরু থেকেই  যাত্রী পরিবহনে অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। এ জাহাজ দু’টি নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে বিআইডব্লিউটিসি’র ৪৪ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছিল। নির্মাণ শেষে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৪৯ কোটিতে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান পরে আরো তিন কোটি টাকার দাবি আদায় করেছে। চুক্তির মেয়াদ ৬ মাস অতিক্রমের পর দু’টি নৌযানের মধ্যে ‘এমভি বাঙালি’ সরবরাহ করা হয়।  ২০১৩ সালের ২৯ মার্চ ঐ জাহাজটি প্রধানমন্ত্রী  উদ্বোধন করেন। পরের বছর ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অপর জাহাজ ‘এমভি মধুমতি’ উদ্বোধন করেন।
 
জাহাজ দু’টি ঢাকা-বরিশাল রুটে যুক্ত করা হয়। যাত্রী সুবিধাহীন জাহাজের পরিচালনা ব্যয় বিআইডব্লিউটিসিকে হতবাক করে। সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিনের পুরানো ও অধিক যাত্রীবহনে সক্ষম নৌযানের চেয়ে নতুন এ নৌযান দু’টি’র জ্বালানি খরচ দ্বিগুণের বেশি। সংস্থার ৯৬০ জন যাত্রী বহনক্ষম শতবর্ষের  পুরানো প্যাডেল জাহাজগুলোতে ঘণ্টায় জ্বালানি ব্যয় হয় হয় ৯৫লিটার। নতুন ‘এমভি মধুমতি’ ও ‘এমভি বাঙালী’ সাড়ে ৭শ’ করে যাত্রী বহনক্ষম হলেও প্রতি জাহাজে জ্বালানি পুড়ছে ঘন্টায় ২শ’ লিটার। ‘এমভি বাঙালী’ সার্ভিসে আসার পরই নির্মাণ কৌশলে ত্রুটির কারণে যাত্রী দুর্ভোগের বিষয়টি নজরে আসে। সে অভিজ্ঞতায় ‘এমভি মধুমতি’তে কিছু সংশোধনী আনা হলেও তা পরোপুরি যাত্রীবান্ধব হয়নি। শুধুই সময় ক্ষেপণ ও নির্মাণব্যায় বেড়েছে।
 
স্বাধীনতার পর যে সব জাহাজ নিয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র পথচলা শুরু হয়েছিল তার সবগুলোই বৃটিশ আমলে তৈরি। ১৯৫২সালের পরে নতুন কোন জাহাজ এ বহরে যুক্ত হয়নি। ২০০০ সালে বিদেশ থেকে এমভি বারো আউলিয়া নামে একটি জাহাজ এনে বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে যুক্ত করা হয়েছিল। বার বার বিকল হওয়ার কারণে ঐ জাহাজটি এখন সার্ভিস সংকুচিত করে চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটে চলছে।
 
ইত্তেফাক/এএন