একটি ভ্রাম্যমাণ বিলাপ

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৩

বিজয় সরণির মোড়ে জ্যামে আটকে গাড়ির গতি স্থির হলে সতেজ বিরক্তি এসে মগজের কোষে আছড়ে পড়ে। আবুল ফজল সময় দেখেন—বিকেল ৪:২৭। কে জানে কতক্ষণ আটকে থাকতে হয়! গাড়ি থেকে নেমে পড়েন তিনি। ফুটপাতে উঠে দাঁড়ানোর আগেই সংসদ ভবনের আঙিনায় ক্রীড়ারত বাতাসেরা তাকে ঘিরে ধরে। কাঁচাপাকা চুলে নাড়া দিয়ে অদৃশ্য হাওয়ারা তার মুখে আদর বুলিয়ে আবার ছুট লাগায়। অস্থির ও ভ্রমণরত বাতাস কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে। বৈশাখের যুবতী বিকেল এখানে ভীষণ বর্ণিল। সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর জারুল ডালভর্তি ফুল নিয়ে সুসজ্জিতা রাজকন্যার মতো অকপট সৌন্দর্য প্রদর্শন করছে।

আবুল ফজল গাড়ির কিউ থেকে চোখ সরান। শেষ বিকেলের সূর্য এখন নমনীয়। অনেক বছর পর যেন আবুল ফজল একটা পরিপূর্ণ আকাশ দেখার সুযোগ পেলেন। তিনি খানিকটা হেঁটে লেকের কাছে গিয়ে দাঁড়ান। তার দূরাচারী দৃষ্টি আকাশে স্থিত হয়। একটু আগের ঘন নীল সামিয়ানার মতো আকাশটা হঠাত্ কমলা হয়ে গেছে। কমলার এই বিন্যাসে কযেক খণ্ড ধূসর মেঘ অবুঝের মতো ঢুকে পড়ে। ধূসর ও কমলার ভেতর একটু একটু দেবে থাকা নীল রঙও নজর কাড়ে আবুল ফজলের। সিঁড়ির সবচে উঁচু ধাপে বসে পড়েন তিনি। লেকের পানি কিংবা অদূরে দণ্ডায়মান বৃক্ষসারির সবুজ অথবা বিন্যস্ত প্রকৃতির মুগ্ধতা ডিঙিয়ে তার দিকে বিলাপের সুরটা ধেয়ে আসছে না যা হোক। কান চেপে ধরা বিরক্ত ও অভ্যস্ত করতল দুটো আজ অনেকদিন পর তার মাংসল ঊরুতে বিশ্রামের সুযোগ পায়।

ঝরঝরে সাচ্ছন্দে হাত দুটোকে শিশুর মতো কোলের ওমে শুইয়ে দেন তিনি। কিশোর স্বভাবের চঞ্চল বাতাস, কৃষ্ণচূড়ার দুর্দান্ত লাল, জারুলের মিষ্টি বেগুনি আর রাধাচূড়ার সহিষ্ণু হলুদ তার চারপাশে আজ প্রতিরোধ প্রাচীর তুলে দিয়েছে। বিনানো বিলাপের সুর এই পারিপাটি শান্তির ভেতর নিশ্চয় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। হয়তো অতৃপ্ত ও বেদনাহত ক্রন্দনও এই মোহময় সৌন্দর্যে আপন যন্ত্রণা ভুলে প্রশমিত এখন। তাহলে কি বিলাপের অসহনীয় ধ্বনির কাছ থেকে পরিত্রাণ পেলেন তিনি? তবু আবুল ফজল পুরোপুরি উত্কণ্ঠামুক্ত হতে পারেন না। খরগোশের মতো কানে দুটো সজাগ করেন—সত্যি, কোনো কান্নার সুর শোনা যাচ্ছে না। সরু দৃষ্টিতে একবার স্থবির যানজটের দিকে তাকান। বড় বাক্সে মতো সাদা জিপটার পেছনে স্লিম ফিগারের একটা এলিয়েন। বেনসন কালারের। ওটার নম্বরও তাঁর ঠোঁটে সঠিক সংখ্যায় উচ্চারিত হয়—২১-০৬৬৩। গাড়িটা তার নিজের। পেছনে গিজগিজানো অনেকগুলো রিকশার পর মালপত্রে ঠাসা একটা নীল রঙের পিকআপ। তার পেছনে আরো গাড়ি আরো ... আরো...। এই প্রথম বড় নয়নাভিরাম লাগে জ্যামের এই দৃশ্য। এই সবের ফাঁদে কান্নাটা সম্ভবত আটকে আছে। নয়তো এত দীর্ঘ সময় ধরে—কই এত লম্বা বিরতি তো নেয় না।  রিনরিনে সুরের ধাক্কায় আবুল ফজলের স্বস্তিতে চির ধরে—তবে কি আবার ফিরে এল বিলাপটা? আগেই তাকে অভয় দান করে। প্রেমিক যুগলের অর্থহীন কিন্তু যৌক্তিক হাসির তোড়ে কিছু চড়ুই অথবা ভাত শালিক কিংবা হতে পারে কয়েকটা দোয়েল উড়াল মারে। সুরই, তবে কান্নার নয়, হাসির রিনরিনে সুর। এই প্রাণবন্ত আর নিবিড় সুখের জমাটি আয়োজনে আবুল ফজলের কাছে কান্নাটা আজ আপোসকামী হয়েছে সম্ভবত। আয়েশি ভঙ্গিতে চোখের দৃষ্টিকে আরো ছড়িয়ে দেন তিনি। রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া আর জারুলের সারিতে হঠাত্ চোখে পড়ে কাঁঠালি চাঁপার দুটো/একটা বিরল উপস্থিতি। চন্দ্রিমা উদ্যানের ঘন বৃক্ষগুলোতে লুকিয়ে থাকা বাতাস লেকের জল টপকে সংসদ ভবনের এমপি হোস্টেলের দিকে দ্রুত ধাবমান হলে লাল সিঁড়ির ধাপে তরতাজা কয়েকটা কাঁঠালি চাঁপা এলিয়ে পড়ে। ফুলগুলোর সৌন্দর্য দুর্মরভাবে আবুল ফজলকে প্রলুব্ধ করলে সেগুলো কুড়োবার জোর একটা তাগিদ বোধ করেন। লোকজনের উপস্থিতিতে সংকোচ বোধ করলেও মাঝবয়সী আবেগকেই প্রশ্রয় দেন তিনি। তার আঙুলগুলো আন্তরিক তত্পরতায় ফুল ক’টি কুড়োয়। নাকের সঙ্গে লাগিয়ে গভীর শ্বাস নিয়ে ফুলের গন্ধ নেন। মুহূর্তেই আবুল ফজল লম্বাগাড়ির সার, ফুলেল বৃক্ষরাজি, লেকের জল ফেরিওয়ালাদের নানামাত্রিক স্বর টপকে যেতে থাকে সন্ধ্যাকুঁড়া গ্রামে। একটা সোমেশ্বরী নদী, প্রাইমারি স্কুলের বিরাট খেলার মাঠে বন্ধুদের কাঁধে হাত রাখতেই শৈশবের টাটকা গন্ধ পান। তখনই জ্যামটা সম্ভবত খুলতে শুরু করে। হর্নের স্থৈর্যহীন চিত্কার তাকে টেনে-হিঁচড়ে সংসদ ভবনের লেকের কাছে নিয়ে আসে। আবার তিনি ভীতকম্পিত হয়ে ওঠেন। নিশ্চয় সেই কান্নাটা এক্ষুনি আবার ফিরে আসবে। সেই ভ্রাম্যমাণ বিলাপধ্বনি সঙ্গী হয়েছিল। করতল দুটো ভিরু শালিকছানার মতো তির তির করে কাঁপে।

আবুল ফজল হাতে একটা অদৃশ্য ধাতব স্পর্শের অনুভবে মনোবল ফিরে পান। হাতে ৩০৩ রাইফেল। ১৯৭১ সাল। স্বাধীনতা যুদ্ধ। বাড়িতে একটা চিরকুট লিখে সীমান্ত পার হয়ে একেবারে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে যুদ্ধের নয় মাসে বেশ ক’টি অপারেশনে সরাসরি অংশ নিলেও স্মৃতির কাঠখড়ে লক্ষ্মীপুর অ্যামবুশের ঘটনাটাই দাউদাউ জ্বলে ওঠে। ফুলপুর থানায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা নিয়মিত টহলরত দলের ওপর আক্রমণ করেছিল তারা। তারিখটা স্পষ্ট মনে আছে। ১৩ জুলাই। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কনভয়ের ওপর আক্রমণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ১৭। এ গ্রুপের যোদ্ধা মো. ইয়াসীন ছিল মা-বাবার একমাত্র সন্তান। ওর বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। তিনি ২৫ মার্চ রাতেই ঢাকার বাসায় পাকিস্তানিদের বর্বোরোচিত হামলায় শহিদ হন। ইয়াসীনকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিল ওর মা। শুনে বিস্মিত হয়েছিল আবুল ফজল। ভীষণ সাহসী ছিল ছেলেটা। মৃত্যুকেও যেন অবজ্ঞা করতে পারে—কম বয়সী আবেগ-উদ্দীপনায় অথবা সদ্যপ্রয়াত পিতৃহত্যার প্রতিশোধস্পৃহায়। ছেলেটা ছিল সাদামাটা। কিন্তু ও হাতে সবসময় একটা দামি রোলেক্স ঘড়ি পরে থাকত। ক্যাম্পে তো বটেই, এমনকি কোনো যুদ্ধ অপারেশনে গেলেও হাতের ঘড়িটা খুলত না। এ নিয়ে সবাই ওকে ঠাট্টাও করত—

—কী ইয়াসীন, ঘড়িটা প্রেমিকার দেয়া?

—নাকি যুদ্ধ করতে করতে মারা গেলে মৃত্যুর সঠিক সময় জেনে মরতে চাও?

এ রকম দুষ্টুমিতে ও রাগ না করলেও প্রাণবন্ত হয়ে আনন্দ কৌতুকে যোগও দিত না। ফজল দেখেছে, এতে ছেলেটার ঠোঁটের ঘেরে ম্লান হাসি ফুটত শুধু। এ বিষয়ে আবুল ফজল তার কৌতূহলকে অক্ষত রাখতে না পেরে একদিন জিজ্ঞেস করে জানতে পারে। ঘড়িটা ইয়সীনের বাবার। যুদ্ধে আসার আগে ওটা ওর মা নিজের হাতে পরিয়ে বলেছেন—তোমার বাবার স্মৃতিই স্বাধীনতা অর্জনে তোমাকে প্রাণিত করবে, সাহস জোগাবে। তার হত্যার প্রতিশোধ নেবে, শত্রুর হাত থেকে প্রিয় জন্মভূমিকে স্বাধীন করবে। এসব জানার পর কেউ কখনো ঘড়ি বিষয়ক কৌতুকে আর বিব্রত করেনি ইয়াসীনকে।

লক্ষ্মীপুর অ্যামবুশে যখন মুক্তিবাহিনীর জয় সুনিশ্চিত তখন হঠাত্ই পাকিস্তানি বাহিনীর নিক্ষেপ করা একটা শক্তিশালী গ্রেনেডে শত্রু কনভয়ের কাছাকাছি থাকা ইয়াসীন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মৃত্যুর পর ও মূলত একটা লাশ থাকে না। দলা দলা থেতলানো মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়। ওর পোড়া কালচে অস্থি, চামড়া, দলা মাংসকে কোনোরকমে একটা কাপড়ে বেঁধে ফুলবাড়িয়ার রাধাকানাই গ্রামের একটা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ওর ছিন্ন বাঁ হাতটি নামা ধানক্ষেত থেকে যখন পাওয়া যায় ঘড়িটা তখনো যান্ত্রিক দায়িত্বপালনে নিষ্ঠাবান ও তত্পর ছিল। ঘড়ি পৌঁছে দেয়ার কঠিন দায়িত্ব বর্তায় আবুল ফজলের ওপর।

ইয়াসীনের আম্মা খুব স্বাভাবিকভাবে ঘড়িটা গ্রহণ করেন। তার অভিব্যক্তিত্বে বরফশীতল বিষণ্নতা লেপ্টে থাকতে পারে হয়তো, বা গভীর রক্তক্ষরণে স্নাত পাঁজরগুলো তিনি শাড়ির আঁচলে ঢেকে রেখেছেন কিংবা বিষাদের ঘন আস্তরে স্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবু আবুল ফজল প্রচণ্ড রকমের ধাক্কা খায়। মানুষ কীভাবে এতটা সহনশীল আর সংযমী হয়! স্বামীহারা এই মহিলার পুত্রই ছিল একমাত্র ও শেষ ভরসা। তার চোখে শ্রাবণের ঘোর বর্ষণ আশা করেছিল আবুল ফজল, সদ্য জবাই হওয়া হরিণীর অসহ্য কাতরতায় ভূলুণ্ঠিত যন্ত্রণার দৃশ্য দেখার নিশ্চিত ধারণা ছিল তার। আর কিছু না বলে তাকে বসিয়ে রেখেই ঘড়িটা নিয়ে ইয়াসীনের আম্মা ভেতরে চলে যান। এরপর আবুল ফজলও আর বসেনি।

রাস্তায় নেমে শোককাতর জননীর আচরণ বিশ্লেষণে যখন ঘোর মগ্ন তখনই সমস্ত প্রকৃতি বিদীর্ণ করে, গ্রামের কয়েক হাজার বিঘা জমির মাটি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে, বৃক্ষের সমস্ত শাখা-প্রশাখায় তোলপাড় তুলে একটা শোকতুর গলা উচ্চকিত কান্নায় ভরে ওঠে — আমার ইয়াসীনরে তোমরা কেন নিয়া আসলা না, দেখাইলা না, ওর বিচ্ছিন্ন নখ, ঠোঁটের খসে পড়া মাংস, পুড়ে যাওয়া এক টুকরো অস্থি দেখলেও ঠিকই চিনতে পারতাম ও আমার ইয়াসীন, আমার কলিজার টুকরা...। বিলাপের সুরটা ক্রমশ তীক্ষ্ম থেকে তীক্ষ্মতর হয়ে আবুল ফজলকে ধাওয়া করে। বাসে মাইল মাইল পথ অতিক্রম করার পরও কান্নার তীব্র যন্ত্রণা বিন্দুমাত্র কমে না। দু হাতে কান চেপে ধরে আবুল ফজল। সেই থেকে শুরু। তবে সারাক্ষণই যে বিলাপটা তত্পর থাকে তাও নয়। এখন যেমন একটা স্বস্তিদায়ক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মগ্ন কান্নার সুরটা অন্তর্হিত হয়েছে। আবুল ফজলের কানে হর্নের শব্দ আসে। জ্যাম খুলতে যাচ্ছে সম্ভবত। দ্রুতপায়ে গাড়ির দিকে হাঁটেন তিনি।

রাস্তায় দাঁড়ানো গিজগিজানো বাক্সগুলোয় প্রাণের স্পন্দন জাগে। পিঁপড়ার সারির মতো গতিশীল হওয়ার জন্য গাড়িগুলো নানামাত্রিক হর্নের ধ্বনিতে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করে। বিজয় সরণিকে ঠেলেঠুলে মহাখালী ফ্লাইওভার, কি বনানী বা বাড্ডার দিকে নিয়ে যেতে ব্যতিব্যস্ত হয় বাহনগুলো। পায়ের গতি দ্রুত করেন আবুল ফজল। গাড়ির দরজা খুলে যান্ত্রিক গর্তে নিজেকে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করেন। কিন্তু সহজে পরিত্রাণ মেলে না। পাঁচ/দশ মিনিটেও পুরো টায়ার ঘোরে কি ঘোরে না—গাড়ির এমন গতি। আবার সেই সংসদ এলাকাতেই, সেই লাল কৃষ্ণচূড়ার দাউদাউ সৌন্দর্যে আবারও চন্দ্রিমা উদ্যানের বনজ সবুজের কাছাকাছি গাড়িটা ঠেসে যায়। চন্দ্রিমা উদ্যানের প্রতিটি বৃক্ষই যেন ঋজু ভঙ্গিতে আকাশছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছ। এই স্থবিরতা খারাপ লাগে না। চোখের আওতায় থাকা টাটকা সবুজ সমস্ত আবদ্ধতাকে হটিয়ে মগজের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাস নামিয়ে দেন আবুল ফজল। এসির ঘেরাটোপে হয়তো ঘাম ঝরা বন্ধ করা যায় কিন্তু মনের গুমোট বাষ্প গুড়োয় তার কী সাধ্য! দিন সরে যাচ্ছে, পাখিরা আয়োজন করে ঘরে ফেরে এখানে। বিচিত্র কলকাকলিতে চনমনে হয় মন। জিয়া উদ্যানের লেকের পাড়ে একদল যুবক গলা ছেড়ে গান করছে। পাশের লাল রাস্তায় এক অন্ধ ভিখিরি সাদা ছড়ির খটখট শব্দ তুলে নিঃসংকোচে হেঁটে যাচ্ছে। তার ছড়িটা তৃতীয় নয়ন হয়ে শব্দের দ্যোতনা তৈরি করে পথ দেখিয়ে নিচ্ছে তাকে। এই সব রচিত জীবনে সংযোজিত হয় অন্যরকম দৃশ্য। কানের লতি ওজনসর্বস্ব সস্তা ঝুমকায় যতটা অবনত, তার চেয়েও উদ্ধত দেখায় শাড়ির পেঁচানো ঘেরে সংরক্ষিত উঁচু স্তনদ্বয়। ঠোঁটে ঘষা আগুন রঙা লিপস্টিক। প্রলুব্ধ করার সবরকম আয়োজনে এরা একান্ত আন্তরিক। দোকানি যেমন তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পণ্যটির প্রদর্শনে ক্রেতার মনোযোগ কাড়তে চায়—চার-পাঁচ জনের ভ্রাম্যমাণ  দেহপসারিণীর দলটাও এর ব্যতিক্রম নয়। চন্দ্রিমা উদ্যানের বৃক্ষরাজি ওদের জন্য তৈরি করছে সান্ধ্যকালীন প্রয়োজনীয় অন্ধকার আর নির্জনতা। ‘গাছ সব সময় মানুষের বন্ধু’ একটা গাছে পেরেক মারা সাইনবোর্ডের বাণীটুকু পড়তে গিয়ে একধরনের ঝাঁঝাল কৌতুক বোধ করে আবুল ফজল। ভয় করে—বিলাপটা না আবার ফিরে আসে। সম্ভবত জটের গেরোগুলো খুলতে শুরু করেছে। চাকা সচল হলে মিটারের গতি ৩০ থেকে ৪০-এ উঠতে থাকে ক্রমশ। অস্থির বাতাসে গাড়ির ভেতর একটা কচমচ শব্দ তৈরি করে। পত্রিকার কয়েকটা পাতা হাওয়ার তোড়ে দলছুট হতে থাকলে খপ করে ধরে ফেলে আবুল ফজল। এতক্ষণে মনে হয় তাড়াহুড়ো করে বেরোনোয় আজ পত্রিকা পড়া হয়নি। বাসি কাগজের তরতাজা খবরের আহ্বানে ফজল কৌতূহলী না হয়ে পারে না। পত্রিকার কালো অক্ষরগুলো পোকার মতো চোখের সামনে বিনবিনায়—

—জঙ্গিদের হাতে উন্নত প্রযুক্তির বোমা।

—বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় তরুণীর গায়ে এসিড।

—আমলাতন্ত্রের কারণে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট মৃতপ্রায়।

—উত্তরায় চিকিত্সকের বাসা থেকে গৃহপরিচারিকার লাশ উদ্ধার।

মাথাটা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে আবুল ফজলের। হঠাত্ জ্বলে ওঠা বোধের ভেতর ’৭১-এর সেই দ্রোহ অনুভব করেন তিনি। মিনিট দশেক চলার পর আবারও গাড়িটা মসৃণ রাস্তার বুকে আটকে যায়। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। লম্বা কিউ-এর শেষে থাকলেও এ প্রান্তে ঠিকই খবর চলে আসে—রিকশারোহী এক মহিলার গলার চেন ছিনতাই করে নিয়ে যাবার আগে তার তিন বছরের শিশুপুত্রটিকে ছুরিকাহত করে গেছে দুর্বৃত্তরা, কী সর্বনাশের কথা! ও প্রান্তের হূদয়বিদারী আহাজারি রক্তস্রোতের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে এদিকেও এসে আছড়ে পড়ে। আবুল ফজল প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি খরচ করে দড়াম শব্দে দরজা খুলে লাফিয়ে বাইরে নামেন।

তারপর মানুষের ঠাস বুনট ঠেলে সামনের দিকে দ্রুত হাঁটতে শুরু করেন। তার গতি এসে থামে একেবারে মূল ঘটনার জমজমাট ভিড়ভাট্টা, হৈচৈ ও শোকাবহ স্রোতের শেষ রেখায়। মহিলা ও শিশু কণ্ঠের কান্না উচ্চগ্রামে উঠছে ক্রমাগত। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে বাচ্চাটার ক্ষতস্থান থেকে। ওদেরকে দ্রুত হসপিটালে নেয়ার প্রয়োজনীয় কর্তব্য ভুলে লোকজন একনাগাড়ে প্রশ্নের পর প্রশ্নের ঢিল ছুড়ছে। ওদের উত্সাহের ভাঁজে চিড় ধরাচ্ছে মহিলার গলার মিনতি—প্লিজ আপনারা আমার ছেলের চিকিত্সার জন্য একটা ব্যবস্থা করেন। ওকে এক্ষুনি হাসপাতালে নেয়া দরকার। তবু ঠাসানো কান্নার ভেতর ডুবে যাওয়া অনুরোধের দিকে উত্সুক জনতার ভ্রুক্ষেপ নেই। সামনে ভয়াবহ যানজট। আপনি এখন এগুবেন কী করে? উল্টো সমস্যার ছক তৈরি করে ঝুলিয়ে দেয় সামনে। অসীম কৌতূহল নিবৃত্ত করতে বেপরোয়া কণ্ঠগুলো প্রশ্ন করেই চলছে—

—ওরা কতজন ছিল? কী অস্ত্র ছিল হাতে? পিস্তল না ছুরি? কীভাবে অ্যাটাক করল? সব প্রশ্নের ভাঁজে গুঁতো মেরে মহিলা উঁচুগলায় আর্তনাদ করে ওঠে—আপনাদের পায়ে পড়ি, আমার বাবুকে বাঁচান।

মানুষের ভিড়, চুকচুকানো আফসোস, টহল পুলিশের হঠাত্ তত্পরতাকে অগ্রাহ্য করে আবুল ফজলের কানে ঠিক তখনি সেই ভ্রাম্যমাণ বিলাপটা হুড়মুড় করে ঢুকতে থাকে। তার চোখের কালো মণি দুটো একটু বেশি গোল আর চঞ্চল হয়ে ইতিউতি ঘুরে কান্নার উত্স খোঁজে। যেন বিলাপের এই তীক্ষ্ম স্বরটা কোনো দৃশ্যমান বস্তু—ভালো করে খুঁজলেই চোখের গর্তে আটকে ফেলা যাবে। ক্রন্দনধ্বনি আজকে যেন আবুল ফজলের কানের ফুটো ভেদ করে তার মগজ ফুটো করে দেবে। ইয়াসীনের মায়ের তীক্ষ্ম ও ধারালো কান্নার সুর দীর্ঘপথ ভ্রমণ করেও ক্লান্ত নয়। বিলাপের সুরটা যেন কালো ধোঁয়ার মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। বলক ওঠা ক্রুদ্ধতা নিয়ে আজ এই ধ্বনি সমস্ত শূন্যতা ভরাট করে ক্রমশ ফেনায়িত হচ্ছে। অপ্রতিরোধ্য এই তীব্র বিলাপ আজ আবুল ফজলের কান দুটো বধির না করে ছাড়বে না। তবু তার করতল দুটো কান চেপে ধরে এই তরঙ্গায়িত বিলাপকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে না। বরং কান্নার অদৃশ্য দেয়াল ডিঙিয়ে, মানুষের স্পর্ধিত কৌতূহলে ছিঁড়েফুঁড়ে তিনি দ্রুতপায়ে ছুটে যান রক্তাক্ত শিশু কোলে বসে থাকা জননীর কাছে। মায়ের কোল থেকে মুমূর্ষু বাচ্চাটাকে নিজের দু বাহুতে জড়িয়ে ধরে একবার শুধু সমবেত জনতার দিকে স্থৈর্যহীন ক্রোধে তাকান। তারপর বলেন—চলো মা, এক্ষুনি ওকে নিয়ে হাসপাতালে যাই, দ্রুত, শিশুটির রক্তস্রোতে তার কাঁধ ভিজে উঠতে থাকলেও জননীর উত্কণ্ঠিত দীর্ঘশ্বাস সুবিশাল শূন্যতায় চির ধরালেও তীব্র বিলাপধ্বনিটি আজ আর আবুল ফজলের পিছু ধাওয়া করে না। দীর্ঘ বছর ধরে ভ্রাম্যমাণ এই বিলাপ আজ ফিরে যায় অনির্দেশ্য ও অদৃশ্য জগতে। সম্ভবত কোনোদিন সে আবুল ফজলের কাছে আর ফিরে আসবে না।