হুসনা বানুর হারমোনিয়াম

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৩

গলাভাঙা মাজাভাঙা বৃদ্ধ ওস্তাদ রেখে মেয়েকে গান শেখানোর মানে এই নয় যে—বাবা চাচ্ছেন তার মেয়েটি সংগীতশিল্পী হয়ে উঠুক। উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। আমাদের ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহরে সেকালে পাত্রী দেখতে এলে পাত্রীর গুণাগুণ পরীক্ষার সময় যে সব প্রশ্ন করা হতো তার মধ্যে ছিল : রান্নাবান্নায় কেমন? কোরমা রাঁধতে পারো তো? সহি কোরআন পাঠ জানো তো? তাহলে একটু শোনাও দেখি। উলের কাজ পার? কুর্সিকাঁটায় জাফরি করা টুপি বানিয়েছো কখনো? একেবারে শেষ প্রশ্ন—গান গাইতে পারো তো? উত্তর হ্যাঁ হলে, খালি গালায় না হারমোনিয়াম বাজিয়ে? অন্যান্য পরীক্ষায় পিছিয়ে থাকলেও হারমোনিয়াম বাজিয়ে পরপর দুটো গান শোনাতে পারলে পাত্র হাতছাড়া হবার কথা নয়। কারণ পাত্রপক্ষে গানের ভক্ত অন্তত একজন তো থাকবেনই। পাত্রীর গুণগান তিনিই করবেন। বলবেন, এমন গানের গলা—একেবারে কোকিলকণ্ঠী।

মেয়ের জন্য বৃদ্ধ ওস্তাদ রাখার কারণ একটাই—মেয়ে যেন তার প্রেমে না পড়ে।

হারমোনিয়ামে দুটি গান তুলতে পারলেই কাজ চালানো যায়, চারটি হলে তো কথাই নেই। ততদিনে বুড়ো ওস্তাদ বাদ পড়ে যান কিংবা পাত্রীর ছোট বোনের জন্য নিয়োজিত হন।

পাত্রীর কণ্ঠে দুটির বেশি তিনটি গান কেউ শুনতে চেয়েছেন, এমন নজির খুব কম। হুসনা বানুকে যখন কুমিল্লা শহরের পাত্রপক্ষ দেখতে এল গানপর্বে ‘মধুমালতী ডাকে আয়’ এবং ‘একটা গান লিখ আমার জন্য’ গাওয়ার পর যখন যন্ত্রটা সরানো হচ্ছে পাত্রের বাবা বললেন, একটা নাত-ই-রাসুল শোনাবে না মা?

অবশ্যই শোনাবো, বলে হারমোনিয়ামের ওপর হাত রেখে খালি গলায় গাইল—‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’।

এ বিয়ে ঠেকায় কে? পাত্রের বাবা নিজেই বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা কবুল করে নিচ্ছি।

হুসনা বানু গান জানে এই সুনামটাই কাল হলো। বিয়ের দ্বিতীয় বছরেই তার স্বামী শফিউদ্দিন হারমোনিয়ামের রিডগুলো একটা একটা করে ভেঙে লাকড়ির চুলাতে ঢুকিয়ে দিল। অতঃপর হুসনা বানু নিজেই খোলটাকে ভেঙে ফালি ফালি করে চুলোতে দিয়ে শফিউদ্দিনকে বলেছে, আপনাদের অনেক খড়ির দাম বেঁচে গেল। এই ভাঙচুর নিয়ে একটা থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে পারত, করেনি। হুসনা বানু এমন একটা ভাব করল যেন কিছুই হয়নি।

অন্তত দু সপ্তাহ পর টের পেয়ে হুসনা বানুর শ্বশুর বলেছেন, শফিউদ্দিন কাজটা ভালো করেনি। তুমি তার অনুমতি নাও, আমি তোমাকে ইন্ডিয়া থেকে পাকড়াশি কোম্পানির হারমোনিয়াম আনিয়ে দেবো।

হুসনা বানু হাসিমুখেই বলল, থাকুক আব্বা। স্বামী পাবার জন্য গান ধরেছিলাম, পেয়ে গেছি, এখন আর কী দরকার।

এই ঘটনা ১৯৬৩ সালের। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারি মধ্যে হুসনা বানু চার সন্তানের মা হন—তিন মেয়ে ও এক ছেলে। চতুর্থ সন্তান তখন পেটে। সত্তরের নভেম্বরের দিকে হুসনা বানু যখন হঠাত্ খালি গলায় বেশ উচ্চৈঃস্বরে গান গাইতে শুরু করে, ব্যাপারটা মন্দ জিনের আছর হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। সে-সময় তার গাওয়া অধিকাংশ গানের শিল্পী একজনই—সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। রান্নাগরে গিয়ে গাইছে, ‘নিধাধামা পানি সারেগা গা রে পাখি গা/ সোনার খাঁচা দেবো/ সোনার শিকল দেবো/ সোনায় ভরিয়ে দেবো গা।’ বিছানায় শুয়ে গাইছে, ‘কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি, কী মিষ্টি সকাল’। বাথরুম থেকে শোনা যাচ্ছে—‘পিয়া পিয়া পিয়া কে ডাকে আমারে মায়াময় এই মধু সন্ধ্যায়’।

শফিউদ্দিন ওয়াপদার হিসাব শাখায় চাকুরি নিয়ে ১৯৬৫-তে ঢাকায় চলে আসে। বাসা নেয় রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ফার্স্ট লেনে, অফিস থেকে বাড়জোর দশ মিনিটের হাঁটাপথ।

সত্তরের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরপর একদিকে গর্ভবতী অন্যদিকে জিনে ধরা মেয়ের দেখাশোনা করতে শফিউদ্দিন শাশুড়িকে নিয়ে আসে, সাথে আসে কুসুম বানু, তার শ্যালিকা। অ্যালোপ্যাথ ডাক্তার বলেন, এটা একধরনের মানসিক সমস্যা, প্রেগন্যান্সিতে কারো কারো হয়ে থাকে। ভালো করে ঘুমালে প্রকোপটা কমে যাবে। সন্তান জন্মদানের দিন যত ঘনিয়ে আসে হুসনা বানু ততই সুস্থ হয়ে ওঠে। ২২ ফেব্রুয়ারি সোমবার তৃতীয় কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। মেয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি দেখে মা চলে গেলেন, রেখে গেলেন অবিবাহিত ছোট মেয়েকে।

মার্চের ২৫ তারিখ রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তাণ্ডব শুরু হলে হুসনা বানু কান খাড়া করে রাখে। সে রাতের শেষপ্রহরে হুসনা বানু গান ধরে, ‘কে তুমি আমারে ডাকো, অলখে লুকায়ে থাকো’।

শফিউদ্দিন ধমকে ওঠে। বলে, তোমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই হুসনা। দেশের এই অবস্থা, আর তুমি...।

হুসনা বানু হেসে ওঠে, আমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই।

খুব কাছে থেকেই গোলার শব্দ আসছে। প্রতিধ্বনিটাই বেশি স্পষ্ট, একবার মনে হয় দক্ষিণ দিক থেকে আসছে একবার পূর্ব দিক থেকে।

শফিউদ্দিন একবার জানালা খুলে রাস্তার দিকে তাকায়। টর্চ হাতে কেউ একজন ফার্স্ট লেন থেকে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের দিকে যাচ্ছে। আবার গোলার শব্দ হতেই মানুষটা দ্রুত পিছিয়ে আসে। পেছাতে পেছাতে একেবারে তাদের ঘরের কাছাকাছি।

শফিউদ্দিন জানালা নিয়ে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করেন, কে ওখানে?

জবাব আসে, অসুবিধে নেই। আমি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের খোকা, অবস্থা খুব খারাপ। ইত্তেফাক অফিসটাকে শেষ করে ফেলেছে। এখনো আর্মি আছে। আবার অ্যাটাক হবে। ফ্যামিলি গ্রামে পাঠিয়ে দিন।

শফিউদ্দিন আবার জিজ্ঞেস করেন, কোনো ক্যাজুয়ালিটি?

অফিসে নাইট শিফটে যারা ছিল, আগে সরে গিয়ে না থাকলে বাঁচার কোনো কারণ নেই। খবর পাচ্ছি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইকবাল হলে জগন্নাথ হলে সব শেষ।

শফিউদ্দিন কথা বলছে জানালা দিয়ে, কিন্তু হুসনা বানু ততক্ষণে দরজা খুলে বাইরে এসে বলল, চলেন, আর্মি কী করে দেখে আসি।

শফিউদ্দিন দ্রুত বেরিয়ে কাতরস্বরে বলল, হুসনা, তুমি ঘরে যাও। বাচ্চা কাঁদছে।

হুসনা বানু খিলখিল করে হেসে ওঠে।

এবার শফিউদ্দিন ভয় পায়। ব্যাপারটা তো হাসির নয়। হুসনা কি কিছুই বুঝতে পারছে না?

পরদিন ২৬ মার্চ, শুক্রবার। ছুটি তো রোববার। কারফিউ জারি হয়েছে, নতুবা অফিসে যাবে কি-না এ দ্বিধায় পড়ত। কী ঘটছে জানার জন্য এদিক-ওদিক যারা উঁকি দিচ্ছে, শফিউদ্দিন তাদের একজন। শুনল স্টেট ব্যাংকের ভেতরে আর্মি, ওয়াপদা গেটে আর্মি, গভর্নর হাউজের চারদিকেই আর্মি।

মানুষ ঢাকা ছাড়ছে—বুড়িগঙ্গা, মেঘনা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা—এসব নদী পেরোতে পারলে সম্ভবত কিছুটা নিরাপত্তা মিলবে।

২৭ মার্চ, শনিবার চার-পাঁচ ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হলে চার সন্তান, শ্যালিকা ও স্ত্রীসহ রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাড়ি ছেড়ে আরো দুটি পরিবারের সাথে হাটখোলার মোড় পেরিয়ে সোজা কিছুদূর এগিয়ে খ্রিস্টানদের কবরস্থানের পাশ দিয়ে কিছুটা হেঁটে কিছুটা রিকশায় সদরঘাটের কাছাকাছি এসে নৌকায় নদী পেরিয়ে জিঞ্জিরার শুভাড্যায় পৌঁছাল। তাঁদের সাথে দুই পরিবারের একটি শফিউদ্দিনের সহকর্মী আবুল কালাম আজাদের। শুভাড্যার বাড়িটি তারই শ্বশুরের।

নবম শ্রেণির ছাত্রী কুসুম বানু একইসঙ্গে শফিউদ্দিনের কন্যাশিশু এবং স্ত্রীকে সামলাচ্ছে। আবার ছয় চার ও তিন বছর বয়সী আরো তিনটি শিশুর ওপর নজর রাখছে। হুসনা বানুর ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ ছিল—যতটা বেশি সময় ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারবেন, ততটাই মঙ্গল।

অস্থিরতা বেড়ে যাবার কারণে এপ্রিলের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার রাতে হুসনা বানুকে একটু বাড়তি মাত্রার ঘুমের ওষুধ দেয় হয়। পরদিন শুক্রবার সকালের দিকে ভীষণ গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, আর শোনা যায় মানুষের চিত্কার—পালাও পালাও, জিঞ্জিরা ছেড়ে পালাও।

বুড়িগঙ্গার গানবোট মরিয়া হয়ে উঠেছে। জিঞ্জিরার দিকের লোকালয়ে অবিরাম গোলাবর্ষণ করে চলেছে। গোদামে আগুন দিয়েছে। থমকে আছে ওপারের পলায়নপর মানুষজন।

কুসুম বানু বোনের বাচ্চাদের নিয়ে প্রস্তুত, কিন্তু হুসনা বানু বালিশ আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে। চোখ খুলছে না। ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় খুলতেও পারছে না। এর মধ্যেই ছোট্ট শিশুটি একবার মায়ের দুধ খেয়ে নিল।

হুসনা বানুকে টেনে হিঁচড়ে তুলে শফিউদ্দিন-পরিবারও এগুচ্ছে, আগে গুলির আওতার বাইরে পৌঁছে গন্তব্য ঠিক করবে।

মানুষের যে স্রোত তার সাথে তাল মিলিয়ে এগুতে পারলে ভালো, নতুবা পদপিষ্ট হয়ে মরতে হবে। প্রায় আধঘণ্টার পথ হাঁটার পর কুসুম চেঁচিয়ে ওঠে, দুলা ভাই, আপা নেই।

শফিউদ্দিন ছেলে কাঁধে ঘুরতে চেষ্টা করে, কিন্তু উপায় নেই। মানুষের ঢল অগ্রাহ্য করে পেছনে ফিরে যাবার কোনো উপায় নেই। তার কানে আসছে অন্য এক নারীর চিত্কার, আমার মিতু কোথায়? আমার মিতু কোথায়?

কিন্তু মিতুর জন্য যে পেছন ফিরে উল্টোদিকে যাবেন সে উপায়ও নেই। মিতুর মায়ের গগনবিদারী চিত্কার অন্য কোনো সময় হলে সকলকে স্তব্ধ করে দিত।

হুসনা বানু যে নেই, কুসুম ছাড়া যেন আর কেউই তা টের পায়নি। একসময় কুসুমও নির্বাক হয়ে যায়। কিন্তু তখনো মনে হচ্ছে কানের পাশ দিয়ে বোধহয় গুলিটা চলে গেল। পেছনে তখনো বিস্ফোরণের শব্দ।

প্রতিটি বিস্ফোরণের সাথে ঘাড়ের ওপরের শিশুটি বাবার মাথার চুল আঁকড়ে ধরে তার ছোট্ট শরীরটাকে বাবার সাথে মিশিয়ে দেয়।

আবারও চিত্কার—আব্বা কোথায়? আব্বা কোথায়? যারা চিত্কার করছে তারা শিশু নয় মাঝবয়সী; তার মানে তাদের আব্বা বুড়ো মানুষ।

দেড় ঘণ্টা পর কুসুম বলল, দুলাভাই, আর পারছি না। তিনটি কথা বলা শিশুর একজনও বলছে না, মা কোথায়? দেশের পরিস্থিতি যেন তারা ভালোই জানে। সেই মুহূর্তে তাদের কী করণীয় তাও তাদের জানা।

নদীর ঘাটে একটি গ্রামীণ বাজারের পাশ দিয়ে যাবার সময় টিউবওয়েল থেকে পানি চেপে খেলো। চায়ের দোকান থেকে আধাকাপ দুধ নিয়ে কোলের বাচ্চাটিকে একটু খাওয়াতে চেষ্টা করল। এই শিশু চিত্কার করে বলার চেষ্টা করল না, দুধের কৌটা কোথায়। চুকচুক করে কয়েক চামচ খেয়ে নিল।

আরো দু দিন পথে কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত শফিউদ্দিন চার সন্তান ও কুসুম বানুকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছাল।

যদি কুসুম সাথে না থাকত, হুসনা বানুর অন্তর্ধানের পুরো দায়ই এসে পড়ত শফিউদ্দিনের ওপর।

শফিউদ্দিন তাদের পৌঁছে দিয়ে হাতে কিছু টাকা নিয়ে সে রাতেই আবার জিঞ্জিরার উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। তার মন বলে—হুসনা বানুর আর কোনোদিনও খুঁজে পাবে না। তবুও খুঁজতে থাকে।

 

দুই.

একাত্তরের এপ্রিলের দুই তারিখ একমাস এগার দিন বয়সী যে কন্যা শিশুটিকে ঘুম ঘুম চোখে শেষবারের মতো বুকের দুধ খাইয়ে হুসনা বানু অন্তর্হিত হলো, তার বয়স এখন পুরো আটচল্লিশ বছর। সে-সময় ক্লাস নাইনের ছাত্রী কুসুম বানুর বয়স এখন বাষট্টি বছর। সে-সময় পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী শফিউদ্দিন যদি এখনো বেঁচে থাকত, তার হতো তিরাশি বছর। তখন হুসনা বানুর বয়স কত ছিল—পঁচিশ। তাহলে এখন তার বয়স হতো তিয়াত্তর বছর।

তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে আমিই সবার ছোট। আমার নাম জ্যোত্স্না। চাঁদনি রাতে আমার জন্ম হয়নি, আমাকে দেখলে কারো চাঁদের আলোর কথা মনে হবে—এমনও নয়। তবুও আমার নাম জ্যোত্স্না। আমি একটি সরকারি কলেজে রসায়ন শাস্ত্রের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। পদোন্নতি পেয়েছি অল্পদিন আগে। আমার মায়ের নাম কুসুম বানু। বাবা শফিউদ্দিন। বাবা একধরনের গোয়ার্তুমির কারণে কুসুমকে বিয়ে করেননি। কুসুম চেয়েছে, কুসুমের পরিবারের লোকজনও চেয়েছে।

বাহাত্তরে যখন দীর্ঘদিন নিখোঁজ কারো কারো প্রত্যাবর্তন ঘটতে থাকল, তার বিশ্বাস পাল্টে গেল, বললেন, হুসনা বানু ফিরে আসবে। বাহাত্তরের ডিসেম্বরে বাবা ইন্ডিয়ার পাকড়াশি কোম্পানির হারমোনিয়াম কিনলেন। খুব যত্ন করে বাক্সটি তাঁর বিছানার একপাশে রেখে দিলেন। সেই বিছানাতেই বাবার সাথে আমরা ঘুমিয়েছি। বাবা ওয়াপদার চাকরি ছেড়ে দিয়ে কুমিল্লার একটি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন।

কুসুমকে বিয়ে করার প্রস্তাবটি বাবার কাছে বারবার এসেছে। কিন্তু বাবা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা কথাই বলেছেন, কুসুম এলেই সবচেয়ে ভালো হতো, কিন্তু হুসনা বানু হঠাত্ একদিন এসে যখন দেখবে—কুসুম আমার বিছানায়, খুব কষ্ট পাবে। আমি বিয়ের পরপর হুসনা বানুর ওপর একটা বড় অবিচার করে ফেলেছিলাম। আমি যে মুখ খুলে ক্ষমা চাইব সে সাহস ও শক্তি আমার নেই। বিছানায় বরং হারমোনিয়ামটাই থাকুক। ক্ষমা চাওয়ার বদলে একটা কিছু করা।

পঁচাত্তরে যখন কুসুম বানুর বিয়ে হয়, আমি অনেকটা বিবাহপূর্বজাত সন্তানের মতোই তার সাথে তার শ্বশুরবাড়ি চলে যাই। কুসুম বানুর স্বামী ওয়াজিউল্লাহ আমাকে তাচ্ছিল্য করেননি। পড়াশোনা করিয়েছেন, তার তিন সন্তান। কিন্তু তিনি যখন বলেন, চারই বলেন—জ্যোত্স্না আমার বড় মেয়ে। আমি তাকেও বাবা ডাকি।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে আমার প্রথম বাবা শফিউদ্দিন হূদরোগে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। একটা সফল বাইপাস সার্জারি হলো। বাবার বন্ধুদের একজন বললেন, এখনই তো সময়। হার্ট তাজা থাকতে থাকতে আরেকটা বিয়ে করেনে।

বাবা বললেন, আইনটা খুব বাজে। হুসনা বানুর লিখিত অনুমতি না নিয়ে যদি বিয়ে করি, নারী নির্যাতনের মামলায় পড়ে যাব।

বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, মানুষ সর্বোচ্চ কত বছর বাঁচে? মাত্র ক’দিন আগে শতবর্ষী বৃদ্ধের মৃত্যুসংবাদ পড়েছি। বললাম, একশ বছর।

বাবা বললেন, না সর্বোচ্চ বাঁচার রেকর্ড হচ্ছে ১২২ বছর ১৬৪ দিন।

বালিশের নিচ থেকে একটা নিউজ ক্লিপ বের করে বললেন, এ ছবি দেখ, এই মহিলার নাম জিন লুই ক্যালমেন্ট। জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৫ আর মৃত্যু ৪ আগস্ট ১৯৯৭। এটাই বিশ্ব রেকর্ড।

কোথাকার বাবা?

ফ্রান্সের। জিন ক্যালমেন্ট গান গাইতেন।

কথা এই পর্যন্তই।

পরের বছর তেমন হাকডাক না পিটিয়ে একদিনের জ্বরেই বাবা অজ্ঞান হয়ে যান, দ্বিতীয় দিন মারা যান। বিছানাতেই হারমোনিয়ামের পাশে।

বাবার কুলখানির পর যখন ঢাকা ফিরে আসি, রেজিস্টার্ড ডাকে একটি চিঠি পাই। আজকাল তো কেউ চিঠি লেখে না, কাগজপত্র কিছু পাঠালে কুরিয়ার সার্ভিসেই পাঠায়।

বাবার যেদিন জ্বর, সেদিনের চিঠি। সেদিনই রেজিস্টার্ড ডাকে পাঠানো। ছোট্ট চিঠি।

স্নেহের জ্যোত্স্না,

আমার আদর নিও।

হুসনা বানুর সন্তানদিগের মধ্যে তুমিই সর্বকনিষ্ঠ। সম্ভাবনা তত্ত্ব অনুযায়ী ভাইবোনদের মধ্যে তুমিই সবার পরে মৃত্যুবরণ করিবে। আমি হিসাব করিয়া দেখিয়াছি হুসনা বানুর দীর্ঘজীবী হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে এবং যদি জিন লুই ক্যালমেন্টের সমান বয়সও পায় তা হইলে ২০৬৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত টিকিয়া থাকিবার কথা। হুসনা বানু যেখানে থাকুক এই সময়ের মধ্যে ফিরিয়া আসিবে বলিয়া আমার বিশ্বাস। আমি হারমোনিয়ামটি তাহাকেই দিবার জন্য তোমার নামে রাখিয়া গেলাম। নিজ দায়িত্বে ইহা তোমার গর্ভধারিণী জননী হুসনা বানুকে দিয়া আমার জন্য তাহার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করিবা।

আমার দিন শেষ হইয়াছে। তোমার সহিত আর সাক্ষাত্ নাও হইতে পারে।

ইতি

তোমার আব্বা

শফিউদ্দিন আহমদ

পুনশ্চ : যদি তুমি অন্তরের ডাক পাও সে ততদিন তুমি টিকিয়া থাকিবে না, তাহা হইলে অনুরূপ একটি নির্দেশের মাধ্যমে হারমোনিয়ামখানা তোমার কনিষ্ঠ সন্তানের নিকট হস্তান্তর করিবা।