আমার মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হয়ে ওঠার গল্প

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৫

আমি মূলত মুক্তিযু্দ্ধ, গণহত্যা, স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে কাজ করি। যদিও আমার পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রাচীন বাংলা নিয়ে। আমার শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরীর প্রাচীন বাংলার সর্বশেষ ছাত্র আমি। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পরবর্তী সময়ে গবেষণার ক্ষেত্র নির্বাচনে আমি প্রাচীন বাংলা থেকে সরে আসি। আমার প্রথম গ্রন্থ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে। মূলত দেড় শতক আগে পুরান ঢাকার ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্রাহ্ম স্কুল থেকে কীভাবে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপান্তর সেটাই উঠে এসেছিল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্তদের স্মৃতিচারণে। আমার সম্পাদনায় গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। ২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আমার প্রথম গ্রন্থ ‘মুজাফরাবাদ গণহত্যা’ প্রকাশ পায়। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সম্পাদনায় দেশের সবগুলো বধ্যভূমি, গণকবরগুলো নিয়ে গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট নামে একটি সিরিজ প্রকাশ করা হচ্ছে। এই সিরিজে আমার ছয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এটি ছাড়া আমার আরো পাঁচটি গ্রন্থ রয়েছে  ‘জগতমল্লপাড়া গণহত্যা’, ‘ঊনসত্তরপাড়া গণহত্যা’, ‘বন্দরগ্রাম গণহত্যা’, ‘পাহাড়তলী গণহত্যা’ ও ‘নাথপাড়া গণহত্যা’। আমি মূলত মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ধরনের তথা ব্যতিক্রমী বিষয়গুলোকে গবেষণার জন্য বেছে নিই। একাত্তরে শরণার্থী-জীবনের সাথে, মুক্তিযুদ্ধের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত চিকিত্সা সেবার বিষয়টি। শরণার্থী শিবিরে প্রায় এক কোটি শরণার্থীর স্থাস্থ্যসেবা, ভয়াবহ কলেরা, জয়বাংলার (চোখ ওঠা রোগ) প্রকোপ, প্রায় সাত লক্ষ শরণার্থীর মৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন একটি অধ্যায়। সেটি নিয়ে আমার গবেষণা এই বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশ করেছে ‘সময় প্রকাশন’ গ্রন্থটির নাম ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতের চিকিত্সা সহায়তা’। পিএইচডি গবেষণায় যখন ভারতের আসামের শিলচরে কাজ করেছি, সন্ধান পাই দুষ্প্রাপ্য বেশকিছু পথকবিতা, স্থানীয় পথকবিরা যা একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে লিখেছেন, দেশে ফিরে আমার সুপারভাইজার অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে দুষ্প্রাপ্য এসব কবিগানের পুস্তিকাগুলো দেখাই। অধ্যাপক মামুনের পরামর্শে সেই সব কবিগান নিয়ে লিখি ‘মুক্তিযুদ্ধে বরাকের কবিতা ও কবিগান’। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আমার আরেকটি গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা : শরণার্থী, সংবাদপত্র ও সাধারণ মানুষ’। মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার ভূমিকাকে অন্য আলোয় দেখার প্রয়াস এই গ্রন্থ। একাত্তরের ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুষ্প্রাপ্য দলিলগুলো নিয়ে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সাথে যৌথভাবে প্রকাশিত হয়েছে ‘গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’র তিনটি খণ্ড। সিরিজটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা ‘অনন্যা’।

পিএইচডি করেছি মুক্তিযুদ্ধের অনালোচিত একটি বিষয় নিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহের সাধারণ মানুষের ভূমিকা’। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ভারতের পাঁচটি সীমান্ত রাজ্যের কাঁটাতার ধরে প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার আমি ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেছি। খুঁজে ফিরেছি অতীত, সাধারণের অভিজ্ঞতায় কথ্য ইতিহাসে অন্য এক একাত্তরকে খুঁজে পেয়েছি। যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে আমার অভিসন্দর্ভটি তৈরি করেছি।

শিক্ষকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি আমার সমস্ত স্বপ্ন গণহত্যা জাদুঘরকে ঘিরে। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গণহত্যা জাদুঘরটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনুকূল্যে খুলনায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মতো একটি বৃহত্ জাদুঘর স্থাপনের কাজ চলছে। শুরু থেকেই আমি ট্রাস্টি হিসেবে এর পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে অধ্যাপক মামুনের সাথে কাজ করছি, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণাকেন্দ্রে। যেটি বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। গত দুই বছরে আমরা প্রায় শতাধিক মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ক নতুন বই প্রকাশ করেছি। প্রায় ১০০ নতুন গবেষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার ইতিহাস চর্চার সাধারণ সমীকরণ আমরা পাল্টে দিচ্ছি। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের মতো একজন বড় প্রথিতযশা ইতিহাসবিদের সাথে কাজ করতে পারা। আর অধ্যাপক মামুন আমার অধ্যাপনার, গবেষণার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজ করার ভিত্তিটি তৈরি করে দিয়েছেন, সম্পৃক্ত করেছেন আমাকে গণহত্যা জাদুঘরের সাথে, গবেষণা কেন্দ্রের সাথে। অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী ইতিহাস চর্চার ধারণা নিয়ে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিমরা কাজ করছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। ২০১২ সালে এসে অধ্যাপক মামুন প্রায় দুই দশক ধরে করে আসা ইতিহাস আন্দোলনকে একটি সাংগঠনিক ভিত্তি দিলেন। গড়ে তুললেন ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী’, আমাকে শুরু থেকেই এর সাথে কাজ করার সুযোগ দিলেন। করলেন প্রতিষ্ঠাকালীন দপ্তর সম্পাদক। দেশের ইতিহাসবিদ ও ইতিহাসপ্রেমীদের সর্ববৃহত্ এই প্লাটফর্মে আমি বর্তমানে যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। এটি আমার আরেকটি স্বপ্নের জায়গা।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিলোনিয়া গড়ে ২০১৮ সালে উদ্বোধন করা হলো ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান’। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে নির্মিত প্রথম উদ্যান। প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এই উদ্যানের সাথে জড়িয়ে আছে আমার স্মৃতি। সেই এক ইতিহাস, এক গৌরবময় গল্প। ২০১২ সালে এই উদ্যানের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে আমি এর সাথে সম্পৃক্ত হই। মূলত অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন গণহত্যা জাদুঘরের পক্ষে এখানে একটি ভাস্কর্য উদ্যান নির্মাণের প্রস্তাব দেন। ত্রিপুরার তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে ভাস্কর্য উদ্যান নির্মাণের জন্য অনুমতি দেন এবং পার্কটি তুলে দেন আমাদের হাতে। অধ্যাপক মামুন বাংলাদেশের নানাজনের কাছে দ্বারস্থ হয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন। ভাস্কর বাছাই করে বিলোনিয়ায় তৈরি করলেন ভাস্কর্য উদ্যান। উদ্যানের প্রবেশদ্বারের ফলকে নিজের নামটি দেখলে আনন্দে চোখে অশ্রু চলে আসে। দেশের বাইরে এত বৃহত্ একটি কর্মযজ্ঞের সাথে নিজের সম্পৃক্ততা আমাকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে।

আমার জন্ম, শৈশব ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাজীবনও চট্টগ্রামে। এরপর ভর্তি হই ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। ২০১১ সালে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ ও আদরের। পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে নিজ শহর ছেড়ে রাজধানীতে আসি। চিকিত্সক বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে ডাক্তার হবে। কিন্তু আমি হেঁটেছি অন্য পথে। বাবাকে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করি, আমার লেখালেখির জগত্, মুক্তিযুদ্ধচর্চা এগুলো নিয়ে তাঁর ভাবনা। কেননা আমার লেখালেখির একনিষ্ঠ পাঠক আমার বাবা।

নিয়মিত পত্রিকায় উপসম্পাদকীয়, রাজনৈতিক ভাষ্য লিখছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি নিরন্তর। এর স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে পেয়েছি জাতীয় অধ্যাপক সালাউদ্দীন আহমেদ পুরস্কার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ কর্তৃক ‘তরুণ মুক্তিযুদ্ধ  গবেষক’ পুরস্কার। এসব সম্মাননা নিরন্তর কাজের উত্সাহ দিচ্ছে।

কর্মজীবনে ২০১২ থেকে অধ্যাপনা করছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। আমার প্রকাশিত গ্রন্থ ১৫টি, এছাড়া দেশি, বিদেশি জার্নালে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে দশটি প্রবন্ধ।

 

লেখক :সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়