নন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মানবেতর জীবন-যাপন

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৬, ১৩:৫৪
মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে। চোখ-মুখ জুড়ে কেবলই হতাশা, অপ্রাপ্তি আর বিষণ্ণতার ছাপ। জেঁকে বসেছে সংসারের অজস্র চাহিদাও। বুকের ভেতরে কষ্টের দগদগে ক্ষত নিয়ে আনমনে হয়ে গেছেন মো. ফিরোজ আল
 
জীবন তরঙ্গে আজ ভাটা পড়ছে। কন্ঠে আর উচ্চারিত হয়না জ্ঞানের বাণী, সেখানে আজ ডাক পড়ছে ‘রিকশা আছে, যাবেন ভাই!’ চোখ দুটো আর স্বপ্ন দেখায়না। কষ্টের আবরণে ঢাকা পড়া চোখ দুটো নির্বাক হয়ে কেবলই এদিক ওদিক যাত্রী খোঁজে।’ মানুষ গড়ার এই কারিগর জীবন-জীবিকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন রাজপথে মানুষ বহনের কাজ। বয়সের অন্তিমলগ্নে এসে শুরু করেছেন জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। অটোরিকশায় হ্যান্ডেল হাতে সংগ্রাম করছেন প্রতিনিয়ত।
 
মো. ফিরোজ আল আসাদ নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার লোকমানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুট এ্যান্ড ভেজিটেবল কাল্টিভেশন বিষয়ের ট্রেড ইন্সট্রাক্টর। একযুগ আগে তিনি ওই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে চাকরি নিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতা তাকে মর্যাদার পরিবর্তে দিয়েছে তিরস্কার। বেতনহীন চাকরি করছেন ১২ বছর ধরে। অসুস্থ মায়ের ওষুধ আর সংসারের খরচ জোগাতেই তিনি এভাবে এক বছর ধরে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি যাত্রী নিয়ে এসেছিলেন গুরুদাসপুরে। তখন কথা হয় এই সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষকের সঙ্গে।
 
শিক্ষক ফিরোজ আল আসাদ বলেন, স্ত্রী সাবিনা ইয়াছমিনসহ চার সদস্যর সংসার তার। ২০০৫ সালে তিনি শিক্ষক হিসাবে ওই স্কুলে চাকরি নেন। ১২ বছর অপেক্ষার পরও স্কুলটি এমপিও ভুক্ত হয়নি। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটি অটোরকশা কিনেছেন। সকালে স্কুলে ক্লাস করান আর বিকালে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। 
 
সরকারের ভৌতিক নিয়মের বেঁড়াজালে আটকে পড়েছে ফিরোজের মতো অসংখ্য শিক্ষকের ভাগ্য। বিধি অনুযায়ী স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও অনার্স পর্যায়ে নিয়োগ দেয়া হলেও নিয়োগপ্রাপ্ত এসব শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত ও স্তর পরিবর্তন হয়নি। ডিরেক্টর জেনারেলের (ডিজি) হাতে ঝুলে রয়েছে এদের ভাগ্য। যে কারণে ননএমপিও এসব শিক্ষকরা জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতার পাশাপাশি বেঁছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা। এমপিও ভুক্তির দাবিতে রাজপথে সংগ্রাম করতে গিয়ে রক্ত দিয়েছেন অনেক শিক্ষক। পুলিশের লাঠিচার্জ, জল কামান-মরিচের গুড়ায় স্তব্ধ হয়েছে দাবি আদায়ের এসব কন্ঠ। কিন্তু জাতির বিবেক নামক এসব শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ।
 
উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ১৬ প্রতিষ্ঠান ননএমপিও রয়েছে। এখানে কর্মরত আছেন দুই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী।
রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজের শিক্ষক মো. লাভলুর রহমান বলেন, ১৬ বছর আগে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেছেন। চোখের সামনে বিনা বেতনে অনেক শিক্ষককে অবসরে যেতে দেখেছেন। দেখেছেন এমপিওর আশায় থাকা সহকর্মীর অকাল মৃত্যু।
 
উপজেলা কলেজ শাখা শিক্ষক সমিতির সভাপতি উপাধ্যক্ষ মো. আবুল কাশেম বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে করা সরকারি আদেশের (জিও) নিয়ম করায় এমপিওকরণে ও স্তর পরিবর্তনে জটিলতা তৈরি হয়। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে অল্প সংখ্যক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেন। তারপর থেকে এ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিও বা স্তর পরিবর্তন হয়নি। এতে করে ননএমপিও প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত শিক্ষক-কর্মচারীরা বছরের পর বছর মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এসব শিক্ষকদের কথা বিবেচনা করে এমপিও ও স্তর পরিবর্তনে সরকারি হস্তক্ষেপ কমনা করেন তিনি।
 
ইত্তেফাক/এএসএমইউ