বিশ্বমানবের চিরকালীন যেই আকুতি

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ২২:২১

নানাদিক হইতে বিশেষ তাত্পর্যবহ এইবারের স্বাধীনতা দিবস। প্রথমত, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে আসিয়া উপনীত হইয়াছি আমরা। ২০২১ সালে স্বাধীনতার অর্ধশতবর্ষ পূর্ণ হইবে। দ্বিতীয়ত, এই স্বাধীনতার যিনি মূল স্থপতি বাঙালির চিরকালের সেই গর্বের ধন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হইবে ২০২০ সালে। দুইটি উপলক্ষই নিঃসন্দেহে সাড়ম্বরে উদযাপনযোগ্য। সেই প্রস্তুতিও শুরু হইয়া গিয়াছে ইতোমধ্যে। আমাদের স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতাপরবর্তী কঠিন বাস্তবতা বিষয়ে যাহারা যিকঞ্চিত্ ধারণা রাখেন, তাহারা জানেন যে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। সর্বোপরি, ইহাও তাহাদের অজানা নহে যে, এই স্বাধীনতা অর্জন এবং তাহাকে সুরক্ষিত রাখিতে কী বিপুল ত্যাগ স্বীকার করিতে হইয়াছে আমাদের। পাড়ি দিতে হইয়াছে কত রক্ত আর অশ্রুর সমুদ্র। একাত্তরের রক্তসমুদ্র শুকাইবার আগেই পঁচাত্তরে সপরিবারে জীবন উত্সর্গ করিতে হইয়াছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বলা বাহুল্য, স্বাধীনতার জন্য এত আত্মত্যাগের নজির পৃথিবীতে খুব বেশি নাই। তদুপরি ইহাও কম গৌরবের বিষয় নয় যে, জন্মলগ্নেই বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ লইয়া যাহারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিয়াছিলেন, তাহাদের মুখে ছাই দিয়া এই স্বাধীনতা দিবসটি আমরা উদযাপন করিতেছি উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সকল মানদণ্ডে সফলভাবে উত্তীর্ণ হইয়াই স্বল্পোন্নত দেশের সারি হইতে আমরা উঠিয়া আসিয়াছি উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। শুধু তাহাই নহে, স্বাধীনতার সোনার কাঠির ছোঁয়ায় বাংলাদেশ এতটাই বদলাইয়া গিয়াছে যে- সমাজ, অর্থনীতি ও জীবনমানসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাহা দৃশ্যমান। অতএব, এই মাটিতে জন্মগ্রহণকারী কোনো বঙ্গসন্তানের নিকট স্বাধীনতার তাত্পর্য নূতন করিয়া ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলিয়া আমরা মনে করি না।

বিশিষ্ট বাঙালি কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৮৭) দেড়শতাধিক বত্সর আগে লিখিয়া গিয়াছেন যে, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়/দাসত্বশৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।’ বস্তুত মানুষের স্বাধীনতার এই আকুতি বিশ্বজনীন। ইহার কোনো দেশকাল নাই। সত্য বটে, পেটে ভাত না থাকিলে ‘পূর্ণিমার চাঁদ’ও ‘ঝলসানো রুটি’ বলিয়া ভ্রম হয়। তাই বলিয়া শুধু ‘ভাত-কাপড়’-এর নিশ্চয়তা যে মানবের স্বাধীনতার চিরায়ত এই বাসনাকে তৃপ্ত করিতে পারে না—তাহার উদাহরণও আমাদের চোখের সম্মুখেই রহিয়াছে। সেই বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে গিয়া তাঁহার বিখ্যাত ‘রাশিয়ার চিঠি’তে রবীন্দ্রনাথও ঠিক সেই কথাই বলিয়াছিলেন। স্বাধীনতা মানে কেবল অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিত্সা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নহে। স্বাধীনতা শব্দটি উচ্চারিত হইলে যে ছবিটি আমাদের মানসপটে ভাসিয়া ওঠে তাহা নিঃসন্দেহে আকাশে উড্ডীন এক মুক্ত বিহঙ্গের। বলা যাইতে পারে যে, মুক্ত বাতাসে মুক্ত মন লইয়া বুক ভরিয়া শ্বাস লইবার নামই স্বাধীনতা। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে ইহা আজও সোনার হরিণ হইয়াই রহিয়াছে। নূতন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলি কখনোই এই সমস্যা হইতে মুক্ত ছিল না। তবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের চোখরাঙানি তাহাতে নূতন মাত্রা যোগ করিয়াছে। নিরাপত্তার নামে সেইসব দেশে এমনসব আইন-কানুন গৃহীত হইতেছে যে, স্বাভাবিকভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়াও কঠিন হইয়া পড়িতেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। পাশাপাশি ইহাও অনস্বীকার্য যে, উন্নত দুনিয়ার দেশগুলির সাম্প্রতিক চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নহে।    

স্বাধীনতাকে অর্থবহ ও টেকসই করিতে হইলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি এইদিকেও আমাদের বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে। বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু যে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়াছেন তাহার মূল কথা হইল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আনন্দের বিষয় হইল, বাংলাদেশের সমগ্র মানচিত্রজুড়িয়া দুঃখী মানুষের মুখে সেই হাসি ক্রমেই দৃশ্যমান হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জও একেবারে কম নহে। দেশের কাণ্ডারিরা এই বিষয়ে পূর্ণ সচেতন বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস।

স্বাধীনতার বেদিমূলে যাহারা জীবন উত্সর্গ করিয়াছেন আমরা সেই বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। সেই সঙ্গে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।