স্বাধীনতা হোক সার্বজনীন

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ২২:২৮

সৃষ্টি থেকেই মানুষ স্বাধীনচেতা। স্বাধীনতার নেশা মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বনের পশু থেকে আশরাফুল মাখলুকাত সবাই স্বাধীনতাকামী। পরাধীনতার গ্লানি বুকে নিয়ে কোনো জাতি বাঁচতে চায় না, বাঁচতে পারে না। তাই তো প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী বলেছেন, ‘আলোক ব্যতীত যেমন পৃথিবী জাগে না, স্রোত ব্যতীত যেমন নদী টিকে না, স্বাধীনতা ব্যতীত তেমনি জাতি কখনো বাঁচতে পারে না।’ অন্যান্য জাতির ন্যায় বাঙালি জাতিও পরাধীনতার শৃঙ্খলে নিজেকে সঁপে দিয়ে আধমরা জীবনযাপনের পক্ষপাতী নয়। মুক্ত বিহঙ্গের মতো শুভ্র ডানা আকাশে মেলে দিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাওয়া জাতি আমরা। স্বাধীন হওয়ার নেশা মানুষকে পাগল করে দেয়—তার প্রমাণ আমাদের রক্তঝরা একাত্তর। আমাদের স্বাধীনতা গোটা কয়েকদিনের ফসল নয়। বরং দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রক্তে রঞ্জিত ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত আমাদের স্বাধীনতা।

পাকিস্তান আমলের পুরো সময়টা (১৯৪৭-১৯৭১) বাঙালি অধিকার আন্দোলনের সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঘুমন্ত বাঙালির উপর নেমে এসেছিল কালরাত্রি। ২৫শে মার্চ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। শুরু হয় পৈশাচিক ‘অপারেশন সার্চলাইট’। বিশ্বের ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড চালায় তারা। আর্তচিত্কারে ভারী হয়ে এসেছিল বাংলার আকাশ-বাতাস। কাপুরুষের মতো অতি লজ্জাজনক পন্থায় ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির উপর তারা এ হত্যাযজ্ঞ চালায়। ২৫শে মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ২৫শে মার্চ মাঝরাতে অর্থাত্ ২৬শে মার্চের শুরুতে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ঘোষণাটি ছিল—

"This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight might go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved."

তারপরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের তাজা রক্ত ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের স্বাধীনতার টকটকে লাল সূর্য। আমরা পেয়েছি সবুজের বুকে লাল বৃত্ত আঁকা পবিত্র পতাকা; পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ ‘বাংলাদেশ’। স্বাধীনতার গৌরবে যখন লাল সবুজের পতাকা আকাশে উড়ে, তখন মনে পড়ে যায় শহীদদের বুক চিরে বেয়ে পড়া টকটকে রক্তের স্রোতের কথা। বুকের বাম পাশে তখন চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভূত হয়ে মনে বারবার প্রশ্ন খেলে যায়, ‘বীর শহীদদের রক্তাক্ত বুক বেয়ে আসা স্বাধীনতা আমরা কি আদৌ পেয়েছি? স্বাধীনতা কি কেবলই রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা?’

আমার কাছে স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা না। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির স্বাদ যেদিন ছড়িয়ে পড়বে প্রত্যেকটি প্রাণের স্পন্দনে; যেদিন প্রতিটি নাগরিকের নিশ্বাস জুড়ে স্বাধীনতার আস্বাদ অনুভূত হবে; যেদিন প্রত্যেকটি মানুষের ইচ্ছা-বাসনা-আকাঙ্ক্ষারা আকাশে ডানা মেলে চিত্কার করে গলা ফাটিয়ে বিশ্বকে জানান দেবে, ‘আমি স্বাধীন আমি স্বাধীন’, সেদিনই স্বাধীনতা শব্দটি সত্যিকার অর্থে তার মাহাত্ম্য খুঁজে পাবে।

কথায় আছে, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।’ বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা ইতোমধ্যে অর্জন করে ফেলেছি। এবার তবে স্বাধীনতা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হোক অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করা ও স্বাধীনতার সুবাতাস প্রাণ থেকে প্রাণে ছড়িয়ে দেওয়া। ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদেরকে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। ‘স্বাধীনতা’ নামক ফুলের সুঘ্রাণে মুখরিত হোক আমাদের জন্মভূমি। 

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়