কোনভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না জঙ্গিদের অর্থায়ন। বিভিন্ন অভিযানে জঙ্গিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান টাকা উদ্ধার হলেও গডফাদারদের নাম শনাক্ত হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে বলা হচ্ছে, জঙ্গিরা নিজেদের ফ্ল্যাট বিক্রি, চাকরির বেতনের টাকা ও তিলে তিলে সঞ্চয় করা স্ত্রীর গচ্ছিত টাকা দিয়ে এই ‘ফান্ড’ গড়ে তুলেছেন। দল থেকে ইয়ানত হিসাবে সংগ্রহ করা টাকাও জঙ্গিদের ফান্ডে জমা হচ্ছে। আর তা দিয়েই তারা দেশে জঙ্গিদের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।
একেকটি অভিযান শেষ হওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক তছনছ হয়ে গেছে। তারা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।’ অথচ সময় যেতে যেতেই জঙ্গিরা আবারও হামলা চালায়। গত ৮ অক্টোবর আশুলিয়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গি বিরোধী অভিযানের নব্য জেএমবি’র অর্থদাতা আব্দুর রহমান ওরফে সারোয়ার জাহান নিহত হওয়ার বলা হচ্ছে যে, জঙ্গিদের অর্থের উত্সদাতার একটি বড় অংশ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে চলে এসেছে। এখন নব্য জেএমবিতে মাত্র ১৮ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। তিন জন শূরা কমিটির সদস্য রয়েছেন। এরা হলেন, সুলতান মাস্টার ওরফে শফিক মাস্টার, মামুনুর রশিদ ওরফে রিপন ও নূরুল ইসলাম মারজান।
পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক বলেন, জঙ্গি দমনে আমরা সফল হয়েছি। এই সফলতাকে ধরে রাখার জন্য যা যা দরকার তাই করা হবে। অতীতের মতো জঙ্গিরা চুপ হয়ে গেছে বলে পুলিশও চুপ থাকবে তা না। আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাব। জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
২০০৭ সালের ৩০ মার্চ জেএমবি’র শীর্ষ ৬ নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর আইন—শৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশে জেএমবি’র বিরুদ্ধে অভিযান চলতে থাকে। ঐ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, জেএমবি’র কোমর ভেঙ্গে গেছে। তাদের বিষদাঁত উপরানো সম্ভব হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এসব বক্তব্যে মধ্যেই ধীরে ধীরে জঙ্গি কার্যক্রম আবারও ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে।
জঙ্গি কার্যক্রম তদন্তকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্ধর্ষ নব্য জেএমবি’তে বিদেশ থেকে অর্থায়ন ঘটছে। তুরস্ক, সিরিয়া, পাকিস্তান, দুবাই সিঙ্গাপুর ও ইয়েমেন থেকে নাম পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন মাধ্যমে দেশে জঙ্গিদের কাছে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। তাদের ভাষায় ইসলামের জিহাদের জন্য তারা এই অর্থ পাঠাচ্ছেন। এর আগে গোয়েন্দাদের হাতে আতাউল হক সবুজ নামে এক ব্যক্তি ইউরোপ থেকে মোটা অংকের টাকা দেশে পাঠানোর তথ্য ধরা পড়ে। সবুজ সিরিয়ায় নিহত জঙ্গি সাইফুল হক সুজনের ভাই। তাদের বাবা আবুল হাসনাত জঙ্গি অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। তারা গুলশান হামলার আগে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাতেন বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশকে (হুজিবি) সংগঠিত করতে দুবাই থেকে অর্থ পাঠিয়েছে হুজিবি’র পলাতক সাবেক আমির মুফতি শফিকুর রহমান। কয়েক দফায় এ অর্থ পাঠিয়েছেন তিনি। অর্থ পাঠানো সংক্রান্ত কাগজপত্র ঢাকার কোতোয়ালি থানা এলাকার একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির সমন্বয়ক ও কানাডা প্রবাসী তামিম আহমেদ চৌধুরী দেশের বাইরে থেকে টাকা আসার দিকগুলো দেখভাল করতেন। মূলত তামিম, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ও মেজর (চাকরিচ্যূত) সৈয়দ জিয়াউল হক জঙ্গি অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন দেশের দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। নারায়ণগঞ্জে অভিযান চলার সময় তামিমের সঙ্গে আব্দুর রহমানের মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে কথোপকথন হয়েছিল। ওই কথোপথনে আব্দুর রহমান অনেকটা নেতা হিসাবে তামিমকে দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে র্যাবের অভিযানে আব্দুর রহমান নিহত হলেও তাদের মূল অর্থদাতাদের নাম-পরিচয় গোয়েন্দারা এখনও জানতে পারেনি।
সংগঠনকে উজ্জীবিত করা এবং সদস্যদের খরচ মেটানোর জন দেশের বাইরে অবস্থানকারী জঙ্গিরাই অর্থ পাঠিয়ে থাকেন উল্লেখ করে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে জঙ্গি অর্থায়নে চিহ্নিত করে চিঠি দেয়া হয়েছে। এরকম জঙ্গি অর্থায়নে এক কোটি আট লাখ টাকা সংগ্রহ করেন কয়েকজন আইনজীবী। এসব অভিযোগে গত বছরের আগস্ট মাসে তিন আইনজীবীকে গ্রেফতার করা ছাড়া আর কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, জঙ্গিদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। যে সীমিত পরিসরে ওদের কার্যক্রম রয়েছে, তাও আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী জেএমবির নেতৃস্থানীয় তিন রয়েছে। তারা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ না করলে যে কোন পরিণতি ঘটতে পারে।
