সোনালী ব্যাংকের ৩৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক জিএম ও ডিজিএমসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমান ও ইকবাল হোসেনের তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই বাছাই করে কমিশন ওই ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন করে।
শিগগিরই বিচারিক আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে বলে দুদকের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন। ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
অনুমোদিত চার্জশিটে এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে যাদের নাম রয়েছে- তারা হলেন, মেসার্স ফেয়ার কেমিক্যালস (প্রাঃ) লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফখরুল ইসলাম, তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ফাতেমা ইসলাম, লালবাগের বাকের হোসেন, জামির হোসেন, মোসাঃ জরিনা আক্তার ও ওমর ফারুক। আর তদন্তে চার্জশিটে যাদের নাম এসেছে- তারা হলেন, সোনালী ব্যাংক লি: এর মতিঝিলের লোকাল অফিসের সাবেক জিএম ও শাখা ব্যবস্থাপক শওকত আলী, একই শাখার সাবেক ডিজিএম আব্দুল কাদির খান, ওই শাখার সাবেক গোডাউন কিপার কাম ক্লার্ক, বর্তমানে অফিসার কৃষি ভিত্তিক প্রকল্প অর্থায়ন বিভাগের অফিসার আব্দুল মতিন, মেসার্স ফেয়ার কেমিক্যালস (প্রাঃ) লিঃ এর সাবেক গোডাউন চৌকিদার বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার সাপোর্টিং স্টাফ মোঃ সরওয়ার্দি, মোঃ কালিয়াকৈর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সানোয়ার হোসেন ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানা এলাকার আঃ ওহাব।
দুদকের তদন্ত সূত্র বলছে, ফখরুল ইসলাম গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার কৌচাকুড়ি মৌজায় ফেয়ার কেমিক্যাল নামে একটি নারকেল তেল উত্পাদন কারখানা স্থাপন করেন। ওই প্রতিষ্ঠানে তিনি নিজে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তার স্ত্রী ফাতেমা ইসলাম পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ধাপে ধাপে সোনালী ব্যাংকের মতিঝিলের স্থানীয় কার্যালয় (লোকাল অফিস) থেকে ২২ কোটি ৩০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ঋণ মঞ্জুর করে উত্তোলন করে। ২০০৪ সাল নাগাদ ওই ঋণ সুদাসলে ৩৭ কোটি ২২ লাখ ৩ হাজার ৯৬৮ টাকায় দাঁড়ায়।
অপরদিকে ঋণের বিপরীতে বিভিন্ন সময়ে কালিয়াকৈর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ৫টি বন্ধকীয় দলিলের মাধ্যমে ৮৩ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি, ওই জমির ওপর স্থাপিত/স্থাপিতব্য দালান, কারখানা, যন্ত্রপাতিসহ সব কিছু সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ের অনুকূলে বন্ধক রাখা হয়। অথচ স্থাবর অস্থাবরসহ বন্ধকি এই জমি ফখরুল ইসলাম কালিয়াকৈর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-কবলা দলিলমূলে মো. বাকের হোসেন, বাকের হোসেনের স্ত্রী জরিনা আক্তার, ছেলে জমির হোসেন ও ভাগনে ওমর ফারুকের কাছে দেড় কোটি টাকায় ওই জমি বিক্রি করেন। জমি বিক্রি করার সময় ওই জমিতে ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা পাঁচ কোটি টাকারও বেশি যন্ত্রপাতি ছিল। যা অন্যত্র বিক্রয় করে আত্মসাত্ করা হয়।
এদিকে ওই সব মালামাল তদারকির কাজে ব্যাংকের নিয়োজিত আবদুল মতিন ও মো. সরওয়ার্দি ব্যাংকের স্বার্থ অক্ষুণ্ন না রেখে ফখরুল ইসলামকে ওই সব পণ্য বিক্রি করে আত্মসাতে সহযোগিতা করেন। একই সঙ্গে বন্ধক মালামাল তদারকির জন্য শাখা ব্যবস্থাপক ও উপ-মহাব্যবস্থাপককে প্রতি তিন মাস পর পর সরেজমিনে পরিদর্শন করার নির্দেশনা থাকলেও তারা তা করেননি। দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা ব্যবস্থাপক ও জিএম শওকত আলী এবং আইসিডি শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-মহাব্যবস্থাপক আবদুল কাদির খান বন্ধককৃত জমি, স্থাপনা ও প্লেজ মালামাল কখনো পরিদর্শন করেননি। কাউকেও পরিদর্শনের নির্দেশ দেননি এবং আসামিরা ওই সম্পদ বিক্রি করে আত্মসাত্ করার পরও কোনো আইনি ব্যবস্থাও নেননি। তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে ফখরুল ইসলাম ও ফাতেমা ইসলামকে ওই সম্পদ বিক্রি করে আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন।
অপরদিকে ব্যাংকে বন্ধক রয়েছে জেনেও বাকের হোসেন, জামির হোসেন, জরিনা আক্তার ও ওমর ফারুক ওই জমি কিনে ফখরুল ইসলাম ও ফাতেমা ইসলামকে ওই জমি আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকের কাছে বন্ধককৃত জমি বিক্রি করে আত্মসাতের সঙ্গে দলিল লেখক সানোয়ার হোসেনও জড়িত। তিনি জমির মালিকানাসংক্রান্ত ২৫ বছরের ধারাবাহিকতা তল্লাশি করে জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধকের বিষয়টি জেনেও ‘ওই জমি কোথাও দায়বদ্ধ নয়’ মর্মে মুসাবিদা লেখেন এবং নিজে স্বাক্ষর করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বন্ধককৃত জমি বিক্রি করে আত্মসাতের বিষয়ে ফখরুল ইসলামকে সহযোগিতা করেছেন। দলিলে জমির শনাক্তকারী আবদুল ওহাব জমিটি ব্যাংকের কাছে বন্ধক আছে জেনেও তা গোপন করে ফখরুল ইসলামকে জমি বিক্রি করে আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন।
