হেমন্তের এই ঘনঘোর অমাবশ্যা তিথিতে শনিবার দীপাবলির আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে চারদিক। হিন্দু বিশ্বাস মতে, এই মাহেন্দ্র লগনে আবির্ভাব ঘটবে মঙ্গলময় জননী কালী দেবীর। আগামীকাল মহা দীপাবলি উৎসব ও শ্যামাপূজা। ভূ-ভারত হয়ে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পালন করবে কালী পুজা বা দীপাবলী উৎসব। ন্যায়ের জয় আর পারলৌকিক আঁধার সরিয়ে ফেলার কামনায় নৈবেদ্য দিবে কালীমাতার পাদপদ্মে। মঙ্গল শিখায় হিন্দু গৃহগুলো আলোকিত করে রাখা হবে। নিশি উপবাসের পর অন্নকুট মহোৎসব আর সন্ধ্যা আরতি দেয়া হবে। বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে কাল সন্ধ্যায় দীপাবলী ও মঙ্গল শিখা প্রজ্বলন এবং দিবাগত রাতে শ্যামা পূজা। প্রসাদ বিতরণ, কাল ভাইফোঁটা ও অতিথি আপ্যায়ন, আরতি। দু’দিন বাদে কালী বিসর্জন। কেবল হিন্দু নয়,শিখ ও জৈনধর্মাবলম্বীরা কাল সন্ধ্যায় সহস্র প্রদীপ জ্বালিয়ে শুভ দীপাবলি উৎসব উদযাপন করবেন।
হিন্দুমতে, দীপান্বিতা অমাবস্যার প্রধান আরাধ্য দেবী হলেন দক্ষিণা কালী। কালী করলাবন্দনা, মুক্তকেশী, মহামেঘের মতো তার বর্ণ। মুখে বিকশিত দন্তপঙক্তি। দুই অধরপ্রাপ্ত বেয়ে পড়ছে রক্তধারা। গলায় মুক্তমালা, কর্ণে শিশুশবের কর্ণ ভূষণ। মা কালীর চার হাত। বাঁদিকে উপরের হাতে রক্তমাখা খোপানসী খড়গ, নিচের হাতের সদচ্ছন্দ মুন্ড। ডানদিকের হাতে দুটিতে অভয় ও বর। মহাদেবের বুকে পা রেখে দেবী যেন নৃত্য করছেন। আপাতদৃষ্টিতে কালী ভীষণ ভয়ঙ্করী। প্রলংকারী, চন্ডি।
বাংলায় ‘দীপাবলি’,হিন্দিতে ‘দিওয়ালি’-যার সংস্কৃত অর্থ প্রদীপের সারি। যে প্রদীপের আলোয় দূর হয় সকল অশুভ শক্তি, ঘটে শুভ শক্তির আর্বিভাব। তাই এটা প্রদীপ জ্বালানোর সেই উৎসব। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র মতে, কালী হচ্ছে অগ্নির সপ্তম জিহ্বা আর অগ্নি হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বর; যা কালী বা শ্যামা নামে ভক্তদের কাছে উপস্থিত হয়। মাতৃ আরাধনার আরেক রূপ হচ্ছে শ্যমা পূজা। দীপাবলি হচ্ছে এই পূজার অন্যতম আর্কষণ। ঘন অন্ধকার বিনাশের প্রত্যাশায় সনাতনধর্মাবলম্বীরা এই দিন ঘরে ও মন্দিরে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন। তাদের বিশ্বাস, এ প্রদীপের আলোকরেখা যদ্দুর অব্দি যায়, ততদূর কোন অশুভ শক্তি আসতে পারে না।
দীপাবলি বা দিওয়ালি উৎসব নিয়ে পুরাণ কাহিনী ও ইতিহাস থেকে হরেক রকম তথ্য মেলে । পুরাণ কাহিনী মতে, ক্ষীর সাগর মন্থনের পর কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে অমৃতভাণ্ড হাতে সমুদ্র থেকে ধন্বন্তরি উঠে এসেছিলেন। সেই জন্য তিথির নাম ধন্বন্তরি ত্রয়োদশী (ধনতেরাস)। ওই দিন একই সাথে স্বর্গচ্যুত দেবী লক্ষ্মীও সমুদ্র ফুড়ে উঠে আসেন। অত:পর অমৃতের ভাগ নিয়ে দেবাসুরের লড়াইয়ের পরে, লক্ষীদেবী পুনরায় স্বর্গাালোকে প্রত্যাবর্তন করেন এ কার্তিকী অমাবস্যার নিশিতেই। সেই ঘটনার স্মরণেই ওই অমাবস্যার রাত সাজানো হয় প্রদীপ জ্বালিয়ে।
আবার মহাভারতে বলা হচ্ছে, নবকাসুরকে বধ করে কৃষ্ণ অসুরের বন্দিনী ষাট হাজার গোপিনীকে উদ্ধার করেন এই অমাবস্যার রাতেই। পরে তাদের সবাইকে কৃষ্ণ বিবাহও করেন। কৃষ্ণের ভক্ত-অনুগামীদের কাছে ওই গোপিনীদের মুক্তির স্মরণ উৎসবই দীপাবলি।
অপরদিকে অন্য পুরাণ মতে, দেবতাদের পরাজিত করে বলি রাজা লক্ষ্মীকে পাতালে লুকিয়ে রাখেন। এই কার্তিকী অমাবস্যার রাতেই নারায়ণ বলিরাজাকে পরাজিত করে পাতাল থেকে লক্ষীকে উদ্ধার করে আনেন। রামায়ণ কথন অনুসারে-রাবণ বধের পর সীতাকে উদ্ধার করে রাম যেদিন অযোধ্যায় ফিরেছিলেন, সেই দিনটি ছিল কার্তিকী-অমাবস্যা। পুরো অযোধ্যা সেদিন রাম-সীতাকে বরণ করার জন্য আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছিল।
হিন্দু পুরাণ মতে দেবী কালী- দুর্গারই একটি রূপ। সংস্কৃত ভাষার ‘কাল’ শব্দ থেকে কালী নামের উৎপত্তি। কালীপূজা হচ্ছে শক্তির পূজা। জগতের সব অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভশক্তির বিজয়ের মধ্যেই রয়েছে কালীপূজার মাহাত্ম্য। কালীদেবী তাঁর ভক্তদের কাছে শ্যামা, আদ্য মা, তারা মা, চামুণ্ডি, ভদ্রকালী, দেবী মহামায়াসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত।
প্রথা অনুসারে দীপাবলির সন্ধ্যায় তেল দিয়ে সহস্র মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়।এখনো অনেক স্থানে এই প্রথা চালু আছে। তবে বর্তমানে শহরাঞ্চলে অনেকে তেলের প্রদীপের পরিবর্তে মোমবাতি ব্যবহার করেন।
শ্যামা পূজা উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ দেশের পূজা মণ্ডপগুলোতে প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে কাল বিকালে সহস্র প্রদীপ জ্বালানো হবে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন মন্দির ও শ্মশানে মধ্যরাতে শ্যামাপূজা বা কালীপূজা করা হবে। বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরে রাত ১২টা এক মিনিটে কালীপূজা শুরু হবে। পূজার হোম, যজ্ঞ ও অঞ্জলি দেওয়া শেষে প্রসাদ বিতরণ করা হবে। এদিকে কলকাতার বাইরে বিশাল ভারতে হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় পার্বন এই ‘দিওয়ালী’। ’ধনতেরাস’ ঘিরে সেখানে চলছে উৎসবের বহুমাত্রিক মহাযজ্ঞ। ভারতীয় স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলোতে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়েছে।
কাল ভাইফোঁটা
কালীপূজার পরেই পরশু ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। শুভদিনের পরম পবিত্র লগ্নে ভাই-বোনের মধুর সম্পর্কের পুনঃ নবীকরণ করে নেওয়া হয় প্রতি বছর। হিন্দুদের ভাই-বোনের স্নেহ ভালবাসার সম্পর্কের প্রকাশ ভাইফোঁটার আচার অনুষ্ঠানটি । কার্তিক মাসের শুক্লা পক্ষে দ্বিতীয় তিথিতে বোন তার ভাইকে পরম যত্ন সহকারে একটি সুন্দর আসনে বসান। শিশির ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে হাতের তিন আঙ্গুলের সাহায্যে বোন তার ভাইয়ের কপালে ধুয়ে দেয়। এই কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে একইভাবে চন্দন তিলক এঁকে দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে-ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা/যমের দুয়ারে পড়লো কাটা/যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা/আমি দিই ভাই ফোঁটা..।
হেমন্তের শিশির দিয়ে বোন তার ভাইয়ের সব অশুভ অমঙ্গল ও অকল্যাণকর শক্তিকে ধুয়ে দেয়। সুগন্ধি চন্দন তিলক ললাটে এঁকে দেয়।ভাই বোনকে আর্শীবাদ বা তার মঙ্গল কামনা করে। হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন গ্রন্থে ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। ভবিষ্যৎ পুরানে বলা হয়েছে, যমী (যমুনা) তার ভাই যমকে কার্ত্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে নিজ গৃহে এনে পূজা করে ভোজনে আপ্যায়িত করেছিলেন। সেই থেকেই ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার উৎসব পালন হয়ে আসছে। অন্যদিকে ১৩৩৬ সালে আচার্য্য সবানন্দ সুরীর পুঁথির শেষ শ্লোকে বলা হয় মহাবীরের জীবনবাসন হলে রাজা নন্দী বর্ধন বোনের শোক নিবারণের জন্য বোনকে বুঝিয়ে আদর যতœ করে আপ্যায়ন করেছিলেন। দীপাবলির উৎসবের মধ্যে কালীর আরাধনায় মৃত্যুর অধিপতী যমের বিতাড়ণ ও অশুভ শক্তিকে প্রতিরোধ অন্যদিকে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া যমের দুয়ারে কাঁটা দিয়ে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু ও সৌভাগ্য কামনা করা হয়।
