আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণ

ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ৯১ অভিযোগ

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৬, ২১:২৬
মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীকে ওকালতনামা দিয়েছিলেন বাদী মো. মোসাদ্দেক চৌধুরী। দায়িত্ব ছিল আদালতে বাদীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করার। পেশাগত সেই দায়িত্ব পালন না করে নিজ এবং তাদের স্ত্রীদের নামে বাদীর নালিশি সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন বায়নানামা তৈরি করেন তারা। পরস্পরের যোগসাজশে করা এই অপকর্ম ধরা পড়ে বাদীর হাতে। পরে বাদী লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন বার কাউন্সিলে। অভিযোগ খতিয়ে দেখে কাউন্সিল এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই আইনজীবীকে আজীবন আইন পেশা হতে বহিষ্কার করেছে। শুধু সম্পত্তির বায়নানামা নিজের নামেই নয়, জামিনের দরখাস্ত আদালতে দাখিল না করেই ভুয়া, বানোয়াট ও সাজানো জামিননামা তৈরি করে ফেঁসে গেছেন আরেক আইনজীবী। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর বার কাউন্সিল তাকেও স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে। এ ধরনের নানা পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ বর্তমানে বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালগুলোতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সকল অভিযোগই আইন পেশায় নিয়োজিত কিছু সংখ্যক আইনজীবীর বিরুদ্ধে। 
 
বার কাউন্সিল সূত্র জানায়, আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ করেন মক্কেলরা। আর ওইসব অভিযোগের বিচার করে কাউন্সিলের ৫টি ট্রাইব্যুনাল। এসব ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৯১টি অভিযোগ। এর মধ্যে ১ নম্বর ট্রাইব্যুনালে ৩১টি, ২ নম্বরে ১১টি, ৩ নম্বরে ৩৩টি, ৪ নম্বরে ৮টি এবং ৫ নম্বর ট্রাইব্যুনালে ৮টি অভিযোগ রয়েছে বিচারাধীন। ভুয়া জামিননামা তৈরি, মামলার উভয় পক্ষের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণসহ নানা অভিযোগ করেছেন মক্কেলরা। পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বর্তমান কমিটি গত তিন মাসে সাতজন আইনজীবীকে পেশা হতে অপসারণ করেছে। 
 
এ প্রসঙ্গে বার কাউন্সিলের ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শম রেজাউল করিম ইত্তেফাককে বলেন, সকল আইনজীবীই পেশাগত সততা ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন না। ক্ষুদ্র হলেও একটি অংশ নানাভাবে পেশার নিয়মের পরিপন্থী তথা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ দীর্ঘদিন পরে থাকায় বিচারপ্রার্থীদের ধারণা হয়েছিল যে আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠানের ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোন বিচার পাওয়া যায় না। এই ভুল ধারণা দূর করতেই এবং পেশাগত বিধিবদ্ধ আচরণ সকল আইনজীবীকে অনুসরণ করানোর লক্ষ্যেই দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি হচ্ছে ট্রাইব্যুনালগুলোতে। 
 
তিনি বলেন, বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালসূহ আইন অনুসারে বিচারিক দায়িত্বপ্রাপ্ত। আইনজীবী হলেই যে সে আইনের উর্ধ্বে থেকে অপরাধ করবেন তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে বার কাউন্সিল সবসময় পেশাগত অসদাচরণের বিরুদ্ধে সবসময় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।
 
যে প্রক্রিয়ায় অভিযোগ নিষ্পত্তি
 
বার কাউন্সিলের নির্ধারিত ফরমে মক্কেলকে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে হয়। হলফনামাসহ অভিযোগ সংবলিত পত্রের ছয়টি কপি দাখিল করতে হয়। এরপর ডিডি বা পে অর্ডারের মাধ্যমে এক হাজার টাকার অভিযোগ ফি জমা দিতে হয়। অভিযোগটি বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। পাঁচ সদস্যের কমিটি অভিযোগটি যাচাই-বাছাই করে বার কাউন্সিলের নির্বাচিত ১৫ সদস্যের প্যানেলে প্রেরণ করা হয়। এদের অনুমোদন পেলে অভিযোগটি বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়ে থাকে। অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালে বিচার করার মত মেরিট না থাকলে ওখানেই আবেদনটি খারিজ করে দেয়া হয়। আর অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইনজীবীকে ভর্ৎসনা, অস্থায়ীভাবে সনদ স্থগিত এবং স্থায়ীভাবে সনদ বাতিল করে থাকে ট্রাইব্যুনাল। 
 
 
তিন মাসে পেশা থেকে অপসারণ ৭ আইনজীবী 
 
পেশাগত অসদাচরণের দায়ে গত তিন মাসে সাত আইনজীবীকে পেশা থেকে বহিষ্কার করেছে বার কাউন্সিল। যাদেরকে অপসারণ করা হয়েছে তারা হলেন- ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য মিনারা খাতুন লাকি, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য মো. শফিউল আজম চৌধুরী ও মো. তসলিম উদ্দিন, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য আইনজীবী মো. শাহজালাল চৌধুরী ও মো. তবারক হোছাইনের সনদ তিন বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সনদ বাতিল করা হয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসনাত ভূইয়া। সনদ বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছেন অনেকে। হাইকোর্ট বার কাউন্সিলের আদেশ স্থগিত করে দিয়েছে।  
 
 
 
 
ইত্তেফাক/এমআই