চট্টগ্রামে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু তাদের পরিচর্যা ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন অভিভাবকরা। বহু পরিবার লজ্জায় কিংবা অসচেতনতার কারণে পরিবারে অটিস্টিক শিশু থাকার কথা জানাতে চান না বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের রাখঢাকের কারণে চট্টগ্রামে কত পরিবারে কতজন অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তি রয়েছেন তারও সঠিক পরিসংখ্যান নেই। চট্টগ্রামে অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা ও পরিচর্যায় নিয়োজিত অন্যতম বেসরকারি সংগঠন ‘নিষ্পাপ’। অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা ও পরিচর্যায় তারা একটি স্কুল চালাচ্ছে নগরীর প্রবর্ত্তক মোড় এলাকায়। ২০১০ সালে ইঞ্জিনিয়ার ঝুলন কুমার দাশের উদ্যোগে নিষ্পাপ অটিজম ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের ৮৫ জন শিশু শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং পরিচর্যা নিচ্ছে। দুই শিফটেই চলে স্কুল। বয়সভেদে এবং সমস্যার স্তরভেদে এখানে অটিস্টিক শিশুদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা কারিকুলাম। ২৪ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এদের শিক্ষা প্রদানসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন। জানা গেল এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি শিশু মূলধারার স্কুলে গিয়ে ভর্তি হতে পেরেছে।
ইঞ্জিনিয়ার ঝুলন কুমার দাশ ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে অটিস্টিক শিশু যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় এসব শিশুর শিক্ষা ও মূলধারায় নিয়ে আসার কার্যক্রমের জন্য যে কয়টি স্কুল ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলো সংখ্যার দিক থেকে এমনকি উপকরণ ও সক্ষমতার দিক থেকে যথেষ্ট নয়। আবার নানা কারণে বিভিন্ন স্কুল থেকে শিশুরা ঝরেও পড়ছে। অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের এই পেশায় মেধাবী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা খুব প্রয়োজন। এ জন্য তাদের প্রশিক্ষণ, সমর্থন ও তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকেও বিশেষ ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বলা যাবে না যে, চট্টগ্রামে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা কত। কারণ এবিষয়ে জরিপ পরিচালনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, অটিস্টিক শিশু রয়েছে এমন অনেক পরিবারের অভিভাবকরা সেকথা স্বীকার করতে চাইছেন না। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে সামাজিকভাবে হেয় হতে হবে এজন্য অনেক পরিবার তাদের অটিস্টিক শিশুদের কথা গোপন করছে।
তারপরও চট্টগ্রামে অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে যেসব স্কুল/প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে সেগুলোর কয়েকটির নাম জানালেন নিষ্পাপ অটিজম স্কুলের জয়েন্ট সেক্রেটারি সুজিত কুমার দত্ত। সেগুলো হচ্ছে—ফাউন্ডেশন ফর অটিজম রিসার্চ এন্ড এডুকেশন (ফেয়ার), চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুল প্রয়াস, বন্দরটিলায় নৌবাহিনী পরিবার কল্যাণ সংস্থা পরিচালিত আশার আলো, পাঁচলাইশ মোড়ের ড্রিম স্টারস অটিজম একাডেমি, মাতৃস্নেহ অটিজম একাডেমি, হালিশহরের প্রেরণা এবং পাহাড়তলীর সুইড বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আফজাল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, একথা সঠিক যে চট্টগ্রামসহ সর্বত্র অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই রোগটি কেন হয় তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো অজানা। তবে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা কিছু কারণকে এই ধরনের শিশু জন্ম নেওয়ার জন্য দায়ী মনে করেন। তবে এখনো পর্যন্ত তা ধারণা পর্যায়েই রয়ে গেছে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হওয়া, দেরিতে বিয়ে করা বিশেষ করে মেয়েদের বেলায় ৩৫ বছরের বেশি বয়সে বিয়ে করা, ত্রুটিপূর্ণ জিনগত সংকেত ইত্যাদি। তিনি বলেন, অটিস্টিক শিশুরা হলো নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার বা মস্তিষ্কে ত্রুটিজনিত সমস্যার শিকার। তারা যে কোনো মানবিক যোগাযোগে অক্ষম, তাদের আই কন্টাক্ট ক্ষমতা নেই, তারা সব সময় একই রকম আচরণ করতে থাকে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগ ক্ষমতা থাকে না। এদের মধ্যে আবার নানা স্তর রয়েছে। অনেককে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের মূল ধারায় নিয়ে আসা যায়।
