মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদরা যোগ্য মর্যাদা পাবেন কী

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:২৮

দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অঞ্চলের সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন, সেটা ছিল নারায়ণগঞ্জ। ২৫ শে মার্চ রাতে পাকবাহিনী বাঙালিদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলে গণহত্যা। ঢাকা গণহত্যার শহরে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর তত্কালীন ইপিআর প্রথম পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২৬ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী ঢাকার পাশের শহর নারায়ণগঞ্জে প্রবেশের চেষ্টা করে। এর আগেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের পাগলা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত পথে পথে ট্রেনের বগি ফেলে ও বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পাকবাহিনী ফতুল্লার মাসদাইর পর্যন্ত বিভিন্নভাবে ব্যারিকেড সরিয়ে আসতে পারলেও মাসদাইরে বর্তমান পুলিশ লাইনের কাছে এসে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তত্কালীন এমএলএ একেএম সামছুজ্জোহা ও আফজাল হোসেনের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এখানে পাকবাহিনীকে ২৬ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রাখা হয়। এরপর পাকবাহিনী ৩৩ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর ২৭ মার্চ দুপুরে শহরে প্রবেশ করে। মূলত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এটাই ছিল দেশের প্রথম পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নিহতরা এখনও শহীদের মর্যাদা পায়নি বলে শহীদ পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ হোসেন অভিযোগ করেন। তবে গত বছর নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযুদ্ধা সংসদের নবনির্মিত ভবন উদ্বোধনকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এই প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছিলেন, শহীদদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রদানসহ তাদের নাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হবে। কিন্তু আজও তারা সেই মর্যাদা পাননি।

সম্প্রতি এ সকল শহীদের মর্যাদা প্রদান ও নাম তালিকাভুক্ত করার জন্য এবং শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ মাসদাইর শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে ৩৩ জন নিহতের স্মৃতিস্তম্ভ করার দাবি জানিয়ে নাসিক মেয়রের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। সেই প্রতিরোধকালীন সময়ের শেষে পাক হানাদার বাহিনী যে ৩৩ জনকে বিভিন্ন স্থানে হত্যা করে, বর্তমানে কেরানীগঞ্জের পানগাওয়ে বসবাসকারী মোহাম্মদ হোসেন এই হত্যাকাণ্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। মোহাম্মদ হোসেন সেদিনের ঘটনা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্য হয়েও আমরা কোনো সম্মানী তো দূরের কথা আমাদের স্বীকৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তার চাচাসহ পাঁচজনকে হত্যার সময় মোহাম্মদ হোসেন নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়। পাকবাহিনী মোহাম্মদ হোসেন মারা গেছে ভেবে চলে যান। ৩ দিন অজ্ঞান থাকার পর জ্ঞান ফিরে দেখেন সে লাশের পাশে পড়ে আছে। এরপর কেরানীগঞ্জ চলে যান। এ ব্যাপারে মোহাম্মদ হোসেন জানান, পঙ্গু অবস্থায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করলেও সেদিন পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার অপরাধে উত্তর মাসদাইরের ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার গাড়ির চালক নুর ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, পূর্ব মাসদাইরের সাবেক মন্ত্রী মরহুম আব্দুস সাত্তারের পুত্র তৌফিক সাত্তার ও তার বন্ধু জালাল, পশ্চিম মাসদাইরের ভাষা সৈনিক খাজা জহিরুল হকের বোন হাসিনা হক, ভগ্নিপতি জসিমুল হকসহ দারোয়ান ও বাড়ির দুইজন কাজের লোককে গুলি করে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে একই এলাকার সাচ্চু, জিন্নাহ ও আকবর মসজিদে আশ্রয় নিলে নরপিচাশরা মসজিদে ঢুকে তাদেরও গুলি করে হত্যা করে। এ ছাড়া গুলবদন নামে এক মহিলাকে পুড়িয়ে মারে। ব্যাংকার আব্দুস সাত্তার, জনৈক আনিছুল ইসলামের দুই মেয়েসহ ৩৩ জনকে নির্মমভাবে ২৭ শে মার্চ হত্যা করা হয় বলে সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী মোঃ হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান। বাংলাদেশের ইতিহাসে  বেসরকারিভাবে এরাই দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রথম শহীদ বলা চলে। পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা মোঃ হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের কোনো সুফল ভোগ করিনি। মুক্তিযোদ্ধার সম্মানটুকু অদ্যাবধি পাইনি। সরকারি সুযোগ-সুবিধা তো দূরের কথা কেউ এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সেই অবদানকে স্মরণ করে আমাদের স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে একাত্তরের ২৯ নভেম্বর দিনটি ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য বেদনাবিধুর দিন। ওই দিন ফতুল্লা থানার দুর্গম চরাঞ্চল বুড়িগঙ্গা নদী বেষ্টিত বক্তাবলীতে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাক হানাদার বাহিনী। স্বাধীনতা যুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একসঙ্গে এত মৃত্যুর ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই। ২৯ নভেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর্যুপরি আক্রমণের মুখে পাক হানাদাররা পিছু হটতে শুরু করে। এ সময় তারা রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর পরামর্শে তারা ১৩৯ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে ধরে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। পিছু হটার সময় হানাদার বাহিনী পেট্রোল ও গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী পার সংলগ্ন বক্তাবলী পরগনার, রাজাপুর ডিগ্রীর চর, মুক্তারকান্দি, গঙ্গানগর, রাম নগর, গোপাল নগর, রাধানগরসহ ২২টি গ্রাম। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ওই স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় যেটি বর্তমানে রয়েছে চরম অবহেলায়। স্তম্ভের বিভিন্ন স্থানে বাতি লাগানো হলেও সেগুলো জ্বলে ওঠেনি কখনও। কবে সেগুলো আবার জ্বলবে, কবে মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জবাসী, সেই সঙ্গে দেশবাসীও।