বিক্ষোভ-হামলা প্রতিমা ভাঙচুর

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৫৩
ফেসবুকের মাধ্যমে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে নাসিরনগরে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর-মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রবিবার দুপুরে এই ঘটনা ঘটে। এসময় কমপক্ষে ২৫টি বাড়ি ও ৬টি মন্দিরে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় ৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলায় পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।
 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাস (৩০) নামের এক যুবক ইসলাম ধর্মের অবমাননা করে শনিবার সকালে ফেসবুকে আপত্তিকর একটি ছবি পোষ্ট করেন। এটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে  এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিকালে এলাকাবাসী ওই যুবককে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে ।
 
এ ঘটনার প্রতিবাদে ও অভিযুক্ত যুবকের ফাঁসির দাবিতে গতকাল সকালে উপজেলা সদরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও হেফাজত ইসলাম পৃথক বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল দুটি উপজেলা সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে একদল লোক বের হয়ে প্রায় ২৫টি হিন্দু বাড়ি-ঘর এবং দত্তবাড়ি মন্দির, জগন্নাথ বাড়ি মন্দিরসহ ৬টি মন্দিরে হামলা চালায়। এসময় বেশ কিছু প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা ব্যাপক লুটপাটও করে। তাদের হামলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েক জন আহত হন।
 
খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। জেলা প্রশাসক মো. রেজওয়ানুর রহমান ও পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে পুলিশ, র্যাবের পাশাপাশি উপজেলা সদরে তিন প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারি পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আব্দুল করিম জানান, আলেম-ওলামাদের নিয়ে পুলিশ সুপার বৈঠক করেছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।     এ ব্যাপারে নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল কাদের বলেন, আটক রসরাজের বিরুদ্ধে থানার এসআই কাউছার বাদী হয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করেছেন। ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় ৬জনকে আটক করা হয়েছে।
 
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিক্ষোভকারীরা প্রায় ২৫টি বাড়ি এবং ৬টি মন্দিরে হামলা চালায়। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ঘটনাস্থলে থাকা ১২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল শাহ আলীও জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীরা একাধিক মন্দির ও বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে।
 
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, অভিযুক্ত রসরাজ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে তাদেরকেও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।
 
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত যুবক রসরাজের পরিবারের সঙ্গে এলাকার কয়েকজনের জমি-জমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তাকে বিপদে ফেলতে তার নামে ফেসবুকে ভুয়া একাউন্ট খুলে এই ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়ানো হতে পারে।
 
নিন্দা-প্রতিবাদ :নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। গতকাল এক বিবৃতিতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, হামলাকারীরা অসংখ্য বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালিয়েছে। কমপক্ষে ১০টি প্রতিমা ভাঙচুর করেছে। এটা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এতে সংখ্যালঘু জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেফতার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
 
এদিকে অভিযুক্ত যুবকের শাস্তির দাবিতে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করেছে জামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। সমাবেশে বক্তারা অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসির দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার হুমকি দেন।
 
মাধবপুরে মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর : মাধবপুর (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নাসিরনগরের ঘটনার জের ধরে গতকাল মাধবপুর বাজারে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে আহলে সুন্নাতওয়াল জামাত। সমাবেশ চলাকালে দুটি মন্দিরে হামলা ভাঙচুর করে উচ্ছৃংখল কিছু যুবক। এ সময় কয়েকটি বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ করে দেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। পরে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
 
উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সুনীল দাস জানান, মন্দিরে হামলার ঘটনায় আমরা মর্মাহত। এ ব্যাপারে ৫৫ বিজিবির অধিনায়ক লে.কর্নেল সাজ্জাদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উপজেলায় ২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ  বলেন, যারা মন্দিরে হামলা ভাঙচুর করেছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
মহম্মদপুরেও হামলা: মহম্মদপুর (মাগুরা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের ছোট নাওভাঙ্গা গ্রামের একটি হিন্দু পরিবার ও তাদের মন্দিরে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এসময় তারা বৃদ্ধ নারী-পুরুষ ও শিশুদের মারধর করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরের দিকে এ ঘটনা ঘটে।
 
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য অসীম বিশ্বাস জানান, তাদের বাড়ির পাশের বাগানে জুয়ার আসর বসাতে বাধা দেওয়ায়  ৭-৮ জন এসে তাদের বাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রতিমার গায়ে থাকা প্রায় ৪০ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
 
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মাগুরার সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (সার্কেল) সুদর্শন কুমার রায় জানান, পুলিশ হামলাকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
 
ইত্তেফাক/এএন