মোস্তাফিজুর রহমান
বর্তমান সময়ে তরুণরা চাকরির পাশাপাশি একজন ভালো উদ্যোক্তা হতেও আগ্রহী। কীভাবে একজন ভালো উদ্যোক্তা হওয়া যায় তা হয়তো অনেকেই জানেন না। আবার অনেকে না জেনে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসা সম্পর্কে বিস্তর ধরনা নিয়ে যদি বিনিয়োগ করা হয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে খুব কম। যারা এমন ভাবছেন যে, কীভাবে একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়া যায় বা কোথায় থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার মন্ত্র শেখা যাবে। তাদের জন্য সমাধান নিয়ে দেশেই কাজ করছেন ইকবাল বাহার নামের একজন উদ্যোক্তা তৈরির কারিগর।
দেশের ৬৮টি জেলাসহ বিশ্বের ১৭টি দেশের তরুণদের একসঙ্গে অনলাইনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির মন্ত্র শেখান ইকবাল বাহার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ আমি নিজে স্বপ্ন দেখি ও তরুণদের স্বপ্ন দেখাই এটা আমার সামাজিক দায়বদ্ধতা যা আমি কোনো প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়া করি এবং প্রতিদিন ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করি এই কাজে। প্রায় অসম্ভব একটি স্বপ্ন আজ সারাদেশের ৬৪ জেলা ও ১৭টি দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিসহ ৫০ হাজার তরুণ-তরুণীদের মাঝে এই কার্যক্রম চলছে।’
তিনি লাগাতার ৯০দিন করে ব্যাচ হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। যে পদ্ধতিতে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন সে প্রসঙ্গে ইকবাল বাহার বলেন,‘গত এক বছর ধরে ৪টি ব্যাচের মাধ্যমে চলেছে আমাদের এই অনলাইন কর্মশালা। একদিনের জন্যও আমাদের এই কর্মশালা বন্ধ ছিল না, শুক্রবার, শনিবার, সরকারী ছুটি এমনকি ঈদের দিনও কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এটা সারাবিশ্বে একটি ইতিহাস যে, টানা ৯০ দিনের কোনো কর্মশালা পৃথিবীতে কেউ কোনদিন করেনি।’
প্রতিটি ব্যাচে যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে কাজ করছেন ইকবাল বাহার। এ বিষয়ে তিনি বলেন,‘৯০ দিন ধরে আমি শুধু উদ্যোক্তা হবার সকল কলা-কৌশল শিখাইনি, শিখিয়েছি কীভাবে একজন ভালো মানুষ হয়ে বুক ফুলিয়ে বাঁচে থাকতে হয়, কিভাবে সমাজের জন্য ও দেশের জন্য কাজ করতে হয় এবং সফল হতে হলে দরকার মা-বাবার দোয়া।’ু
ইকবাল বাহারে প্রত্যাশা, আগামী ২ বছরে দেশে ৩ হাজার উদ্যোক্তা তৈরির মধ্যদিয়ে ১ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করা। ‘চাকরি করবো না, চাকরি দেবো’ স্লোগানকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি।
উদ্যোক্তা তৈরি কার্যক্রমের প্রথম দিকের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ইকবাল বাহার বলেন, ‘ ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আমাদের অনলাইন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। ৬৪ জেলা থাকে ১৬৪ জন তরুণ ও তরুণীকে নিয়ে উদ্যোক্তা তৈরির টানা ৯০ দিনের প্রথম ব্যাচ নিয়ে কাজ করেছি। দ্বিতীয় ব্যাচ ছিলো বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ও ১১ টি দেশের ৬ হাজার তরুণ ও তরুণীকে নিয়ে , ৬৪ জেলা ও ১৫ টি দেশের ১৫,০০০ জন তরুণ ও তরুণীকে নিয়ে ছিলতৃতীয় ব্যাচ এবং চতুর্থ ব্যাচ হলো ৬৪ জেলা ও ১৭টি দেশের ৩০ হাজার তরুণ ও তরুণীকে নিয়ে ৯০ দিননের কর্মশালা। এরই ধারাবহিকতায় বর্তমানে চলছে ৫ম ব্যাচ। ’
অনলাইন কর্মশালা থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রশিক্ষণ নিয়েছে, বর্তমানে তাদের অবস্থান সম্পর্কে ইকবাল বাহার বলেন, ‘প্রায় ৬ শ’ জন উদ্যোক্তা হবার জন্য ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যারা বিজনেস বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাঁরা আবার শুরু করেছেন, যারা আগে শুরু করা বিজনেসে ভাল করছিলেন না তাঁরা এখন আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছেন । অনেকে ভেবেছিলেন জীবনে চাকরি করা ছাড়া তাঁকে দিয়ে আর কিছু সম্ভব নয়। তারাও এখন চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হবার কথা ভাবছেন। আবার কেউ কেউ শুরুও করে দিয়েছেন।’
তিনি তরুণ-তরুণীদের উদ্যেশ্যে বলেন, ‘যারা স্বপ্ন দেখেন নিজে কিছু একটা করতে চান, পরিশ্রম করতে চান, যাদের কোন তাড়াহুড়া নেই ও নিজের জীবনটাকে বদলে চান। আমরা শুধুমাত্র তাদেরকে নিয়ে কাজ করছি । আমাদের সাথে কাজ শেখার জন্য সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো - আপনি একজন ভালোমানুষ। ’
সারাদেশ থেকে হাজার হাজার তরুণ তরুণী উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন মুজাহিদুর রহমান অপু। তিনি খুলনা থেকে অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনে হ্যান্ড প্রিন্টিং কাপড়ের ব্যবসা করছেন। তিনি যে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন সেটির নাম ‘রঙবেরঙ’। অনলানে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করেছেন ইতোমধে। অনলাইন প্রশিক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মুজাহিদুর রহমান অপু বলেন,‘আমি খুলনা থেকে অনলাইন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছি। আমি ছিলাম দ্বিতীয় ব্যাচে। ব্যবসা করতে হলে একজন উদ্যোক্তাকে কোন বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন তা আমি ওখান থেকে শিখতে পেরেছি। আমি যে বিষয়গুলোকে আগে ভয় পেতাম তা বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে ভয় পাই না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এই ধরনের কার্যক্রম চলমান থাকলে দেশের বেকার সমস্যা দূর হয়ে যাবে অল্প দিনেই।’
এমন আর একজন উদ্যোক্তা হলেন এম হোসেন। তিনি বরিশাল থেকে অনলাইন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে ছিলেন। বর্তমানে তিনি ই-কমার্স ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন,‘ আমি মাস্টার্স শেষ করে বেকার হয়ে হতাশার জীবন কাটাতে ছিলাম। দীর্ঘ দিন আমি চাকরির পিছনে ছুঁটেছি। অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ আমি একটি ই-কমার্স মার্কেট প্লেস পরিচালনা করছি। এক জন উদ্যোক্তা হতে হলে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হয়, ইকবাল বাহার স্যার তা আমাদের শিখিয়ে দেন। শুধু তা-ই নয়, উদ্যোক্তা হতে হলে যে চ্যালেঞ্জগুলো মোবাবিলা করতে হয় তা সে বিষয়েও আমাদের ধারনা দেন তিনি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমি ইকবাল বাহার স্যারের কাছে শিখেছি, ব্যবসা পরিচালনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ’
এম হোসেন প্রথমে তার ই-কমার্স সাইটে ভারতীয় একটি পণ্য বিক্রি করেছে। সম্প্রতি তিনি দেশীয় থ্রি-পিস ও জামদানী কাপড়ের মেলা বসাতে চায় তার মার্কেট প্লেসে। ইতোমধ্যে তিনি তার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।
এমন আর একজন উদ্যোক্তা হলেন হাবিব রহমান। তিনি বর্তমানে অনলাইনে ডিজাইন ও প্রিন্টিং ব্যবসা করছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম হলো- গ্রাফিক কমার্স। চতুর্থ ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন,‘ বর্তমানে আমি অনলাইনে ডিজাইন ও প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা করছি। যদিও সম্প্রতি আমি আমার ব্যবসাটা শুরু করেছি তবুও সব কিছু ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে আমার কাছে। অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রিয়েল লাইফ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। অনেক বড় একটি নেটওয়ার্কের তৈরি হয়েছে এখান থেকে। বর্তমানে এই প্লাটফর্মে অন্তত ৫০ হাজার তরুণ-তরুণী রয়েছেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আরো অনেক দূর পথ চলা যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
