গুলিবিদ্ধ এক সাঁওতাল নিহত ৩৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৬, ২৩:৪৫
গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জস্থ রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে বীজ আখ কাটতে গিয়ে পুলিশ ও চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীর সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ শ্যামল হেমভ্রম (৩৫) রবিবার রাতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন।
 
গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ দাবি করেছে, তাদের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। তবে দিনাজপুরের কোতোয়ালী থানার ওসি রেদোয়ানুর রহিম শ্যামল হেমভ্রমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ মর্গে রাখা হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তার লাশ নিতে কেউ আসেননি। নিহত শ্যামল হেমভ্রম চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমেস্বরপুরের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাহেবগঞ্জ এলাকায় বসবাস করছিলেন।
 
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় রবিবার রাতে গোবিন্দগঞ্জ থানার এসআই কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৩৮ জনের নাম উল্লেখসহ ৩৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পর গ্রেফতারের ভয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।
 
এরআগে রবিবার সন্ধ্যায় পুলিশ ও র্যাব ৩ ঘন্টাব্যাপী যৌথ অভিযান চালিয়ে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে সাঁওতাল ও কতিপয় বাঙালিদের উচ্ছেদ করে। তারপর থেকে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
 
গতকাল সরেজমিনে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। উচ্ছেদ অভিযানের শুরুতেই বাসিন্দারা পালিয়ে গেছে। ওই এলাকায় বাড়ি-ঘরের কোনো চিহ্ন নেই। কোথাও কোথাও অস্থায়ী টিনের সেড ঘর নির্মাণের চিহ্নসহ পোড়া ছাই দেখা গেছে।
 
তবে ওই এলাকায় বসবাসকারী সাঁওতালরা অভিযোগ করেছেন, উচ্ছেদ অভিযানের পর স্থানীয় লোকজন তাদের অস্থায়ী ঘরগুলোর টিন, বাঁশ এমনকি গরু-ছাগল লুটপাট করে নিয়ে গেছে। সকাল থেকেই লুটপাটসহ সংঘর্ষ এড়াতে স্থানীয় সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে স্থানীয় লোকজন ওই এলাকা পাহাড়া দিচ্ছে। সেইসাথে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে।
 
রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের ১ হাজার ৮শ ৪২ একর জমির মালিকানা নিয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সঙ্গে চিনিকল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। রবিবার সকালে ইক্ষু খামারের শ্রমিক-কর্মচারী পুলিশ পাহাড়ায় বাগদা-কাটা সংলগ্ন এলাকার ওই জমিতে তাদের রোপণ করা আখ কাটতে যায়। কিন্তু খামারের ১০০ একর জমি দখল করে থাকা সাঁওতাল ও কতিপয় বাঙালি এতে বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ও সংর্ঘষ বাঁধে। সাঁওতালদের ছোঁড়া তীরে ৯ পুলিশ সদস্য তীরবিদ্ধ হন। পরে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। চারজন সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হয়। এছাড়া উভয় পক্ষের আহত হন ১৭ জন।
 
এ ব্যাপারে আদিবাসি পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্র সরেন ও সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে দাবি করেন, পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে তাদের চারজন গুলিবিদ্ধ হয়। তাদের মধ্যে দীজেন টুটু (দিনাজপুর), চরণ সরেন (বদরগগঞ্জ), বিমল কিশকু (ঘোড়াঘাট), শ্যামল হেমভ্রমকে (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) পার্শ্ববর্তী ঘোড়াঘাট এলাকা দিয়ে দিনাজপুর মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে রবিবার রাতে শ্যামল হেমভ্রম মারা যান। তারা আরো জানান, শ্যামলের বুকে গুলি লেগেছিল। গুলিবিদ্ধ অন্যরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন। গতকাল দুপুরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদ সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার পরিদর্শন করেছেন।
 
রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল বলেন, চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় এক হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। তখন থেকে এসব জমিতে উত্পাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ করা হচ্ছিল। কিন্তু দুইবছর আগে এসব জমি বাপ-দাদার দাবি করে আন্দোলনে নামে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তারা গত ১ জুলাই এই খামারের প্রায় ১০০ একর আবাদী জমিতে ছোট ছোট কুড়ে ঘর নির্মাণ করে। ইতিমধ্যে তারা সেখানে ধান ও মাসকালাই চাষ শুরু করে। ওইদিন থেকে তারা তীর-ধনুক নিয়ে জমি পাহাড়া দিচ্ছে। রবিবার চিনিকলের রোপণ করা আখ বীজ হিসেবে সংগ্রহের জন্য কাটতে গেলে সাঁওতালরা বাধা দিলে এই ঘটনা ঘটে।
 
ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বলেন, ১৯৬২ সালে জমি অধিগ্রহণের সময় চুক্তিনামায় বলা হয়, কখনো চিনিকল বা খামার বন্ধ হলে সেক্ষেত্রে ওইসব জমি সরকারের কাছে চলে যাবে। অথচ এলাকার কতিপয় সুবিধাবাদি ব্যক্তির উস্কানিতে সাঁওতালরা অবৈধভাবে চিনিকলের জমি দখল করে।
 
এ প্রসঙ্গে ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, কারও উস্কানিতে আন্দোলন করা হচ্ছে না। চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণের সময় জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে। সেখানে উল্লেখ ছিল কখনো ওইসব জমিতে আখ ছাড়া অন্য ফসলের চাষ হলে প্রকৃত মালিকদের জমি ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু কিছুদিন ধরে ওইসব জমিতে ধান ও তামাক চাষ হচ্ছে। অথচ জমি ফেরত দেওয়া হয়নি।
 

ইত্তেফাক/এএন