দেড়শ’ জনকে আসামি করে দুই মামলা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৬, ২৩:৪৮
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় গত রবিবার রাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আরো ২১ জনকে আটক করা হয়েছে। এ নিয়ে ওই হামলার ঘটনায় ৭৪ জনকে আটক করলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
 
এদিকে, নাসিরনগর উপজেলায় হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেছে। গত রবিবার রাতে এ দুটি মামলা দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছেন নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাফর। তিনি বলেন, দুটি মামলায় অজ্ঞাত দেড়শ’ জনকে আসামি করা হয়েছে।
 
হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় এর আগে কাজল দত্ত ও নির্মল দত্ত বাদী হয়ে দুটি মামলা করেছিলেন। আরেকটি মামলা করা হয়েছিল ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি আপলোডের অভিযোগে হিন্দু যুবক রসরাজ দাশের বিরুদ্ধে। অর্থাত্ নাসিরনগরের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫টি মামলা দায়ের করা হল। 
 
অন্যদিকে, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পুরুষরা আটক আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নারীরাও রয়েছেন আতঙ্কে। নাসিরনগর থানার ওসি আবু জাফর বলেন, ঘটনার সাথে জড়িতদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
 
অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেজন্য উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে র্যাব, পুলিশ, বিজিবিসহ অন্তত ৫শ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
 
৮ জনের  রিমান্ড মঞ্জুর
 
নাসিরনগরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রথম দফায় গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে আটজনের তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান সোহাগ উদ্দিন তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
 
ঘটনাস্থল পরিদর্শন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের
 
সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ’৭১ এর একটি প্রতিনিধি দল গতকাল সোমবার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও মন্দির পরিদর্শন করেছে। ফোরামের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম ও ফোরামের মহাসচিব হারুন হাবীবের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি দুপুরের দিকে গৌর মন্দির, দত্তবাড়ি মন্দিরসহ বিভিন্ন বাড়িঘর পরিদর্শন করে।
 
পরে স্থানীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ বলেন, হামলার ঘটনায় সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রই এ ঘটনার সাথে জড়িত। অন্যদিকে সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) তাজুল ইসলামও গতকাল গৌর মন্দিরসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচার করা হবে। তবে সাধারণ নিরীহ মানুষ যেন  হয়রানির শিকার না হয় সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।
 
ওলামা-মাশায়েখদের ঘটনাস্থল পরিদর্শন
 
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনূসিয়া জামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা আশেকে এলাহী ইব্রাহীমীর নেতৃত্বে ২০ সদস্যের ওলামা-মাশায়েখের একটি প্রতিনিধি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা সাজিদুর রহমান, জেলা হেফাজতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুফতি মোবারক উল্লাহ, মাওলানা আব্দুর রহিম কাসেমি, মাওলানা মুখলেছুর রহমান প্রমুখ।
 
মাওলানা সাজিদুর রহমান বলেন, নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, বাড়িঘরে যারা হামলা চালিয়েছে তারা প্রকত মুসলমান নয়। ইসলাম কখনো এ ধরনের হামলা-ভাঙচুর সমর্থন করে না। তিনি ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তিনি বলেন, আমরা হিন্দু-মুসলমানরা এদেশে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করছি। ইসলাম কখনোই হামলা সমর্থন করে না। ন্যক্কারজনক এই  ঘটনায় আমরা মর্মহত।
 
ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে টিন ও নগদ অর্থ বিতরণ
 
গৃহ নির্মাণের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঢেউটিন ও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। গতকাল ৫১টি পরিবারকে ১১৪ বান্ডিল ঢেউ টিন ও ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা বিতরণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মো. রেজওয়ানুল রহমান। এ সময় উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম মনিরুজ্জামান সরকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদ ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন কুমার দেবসহ । জেলা প্রশাসক মো. রেজওয়ানুর রহমান বলেন, আমরা সব সময় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছি। নাসিরনগরের পরিবেশ আগের মতো শান্ত হয়ে এসেছে। আশা করছি সব সমপ্রদায়ের মানুষের মধ্যে যে সম্প্রীতি ছিল সেটি আবারও ফিরে আসবে।
 
ঝালকাঠিতে মামলা
 
ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান,  সদর উপজেলার পোনাবালিয়া বাজারের সর্বজনীন কালী মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। গত রবিবার রাতে মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অনিল চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে ঝালকাঠি থানায় এ মামলা করেন। ঝালকাঠি সদর থানার ওসি মো. মাহে আলম মামলা দায়েরের ঘটনা নিশ্চিত করেছেন। গতকাল সকালে বরিশালের ডিআইজি (ভারপ্রাপ্ত) মো. আকরাম হোসেন ও ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মকবুল হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
 
হবিগঞ্জে ৭ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর
 
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মাধবপুরে মন্দির ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেফতার ৭ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল দুপুরে অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম হুমায়ুন কবিরের আদালতে আসামিদের জামিন আবেদন করলে শুনানি শেষে বিচারক আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
 
পুলিশ জানায়, ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গত রবিবার বিকালে একদল দুর্বৃত্ত মাধবপুর উপজেলা সদরে কালী মন্দির, ঝোলন মন্দিরসহ ৫টি মন্দিরে হামলা চালায়। এসময় বেশ কিছু প্রতিমাসহ মন্দিরে ভাঙচুর চালানো হয়।
 

ইত্তেফাক/এএন