অন্তর্জগতে সুখী হতে পারাটাই সুখ

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৯, ২১:১৭

জয়া ফারহানা

উর্দু ভাষার শক্তিমান কবি মীরের একটি শায়ের ‘হিয়া সুরত এ আদম বহুত হ্যায়, আদম নেহি হ্যায়’। অনুবাদ করেছেন আবু সয়ীদ আইয়ুব এভাবে—মানুষ চেহারার জানোয়ারে ভরে গেছে পৃথিবী, মানুষ নেই।

কিন্তু কেন এমন দুর্দশা হলো, মানুষরূপী জানোয়ারে ভরে গেল পৃথিবী? বৈদিক যুগে পঞ্চাশে লোকে বাণপ্রস্থ অবলম্বন করত। বনের ফলমূল খেয়ে বনেই অনাড়ম্বর এক জীবন কাটিয়ে দেবে বলে ভাবত। একবিংশ শতাব্দিতে অবশ্য বৈদিক যুগের দর্শনের ছিটেফোঁটাও মিলবে না। সম্ভোগের সমস্ত উপকরণ পাওয়ার জন্য যেকোনো অনৈতিক উপায় গ্রহণ করতে অনেকেরই দ্বিধা নাই। আনাতোল ফ্রাঁসের একটি গল্প আছে। এক অতি রূপসী রমণী তার বন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী আরশিটি এনে দেওয়ার জন্য। বন্ধু তাকে একটি করোটি উপহার দিয়ে বললেন এই তোমার আরশি। এতে তোমার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবে। রমণীটির রূপের সঙ্গে জ্ঞানও ছিল। তিনি বুঝতে পারলেন অসীম এই রূপের শেষ পরিণতি এই খুলির মতোই। তীব্র বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন বিমর্ষ রূপসী ভাবলেন, জীবনের পরিণতি তবে এই? বিশ্ববিজয়ী বীর আলেকজান্ডার হয়ত সেকারণেই বলেছিলেন, শববাহকেরা তার হাত দুটিকে যেন কফিনের বাইরে রাখে। দেখে মানুষ যেন বুঝতে পারে ধনসম্পদ বিত্ত-বৈভব যত অঢেলই হোক শেষ পর্যন্ত কিছুই সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায় না।

২. মানুষের ভেতর অনবরত ভালো এবং মন্দের যে দ্বন্দ্ব চলে—সেই যুদ্ধে কী করে ভালোকে জয়ী করিয়ে আনা যায়? কীভাবে সুপ্রবৃত্তিকে প্রণোদিত করা যায়? বিবেকহীন, কর্তব্য জ্ঞানহীন, কৃতজ্ঞতাবোধহীন, মানুষের প্রতি রূঢ় জীবনের পরিবর্তে, সুস্থ স্বাভাবিক সুন্দর শান্তির সত্ সহজ অনাড়ম্বর জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করা যায়? উপায় নিশ্চয়ই আছে। আত্মিক যুদ্ধই সে উপায়। প্রতি মুহূর্তে নিজের আত্মার সঙ্গে যুদ্ধ করে অন্যায় প্রবৃত্তিকে বশে রাখতে পারলেই মানুষ জয়ী হবে। শুঁয়োপোকাকে দেখে ধারণা করা যায় না, কুণ্ডলি পাকানো এই গুটিপোকাটি একদিন সুস্নিগ্ধ প্রজাপতি হয়ে উঠবে। মানুষের জীবনও এমনই এক অনিশ্চিত যাত্রা। আশ্চর্য নাটকও বলা যায়; যে নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য দেখে শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য সম্পর্কে কিছু আঁচ করা কঠিন। প্রাণী অধিকার রক্ষা নিয়ে কাজ করে পৃথিবীতে যে ক’জন অমর হয়ে আছেন সেই জিম করবেট, সালিম আলী এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের প্রধান প্রবক্তা অ্যান রাইট তারুণ্যে নিয়মিত প্রাণী শিকার করতেন। উইনস্টন চার্চিল স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন অতি জঘন্য ফলাফলের কারণে। মান্না দে বেতারের সংগীত অডিশনে অকৃতকার্য হয়েছিলেন! তাপসী রাবেয়া প্রথম জীবনে ছিলেন হতদরিদ্র পরাধীন এক ক্রীতদাস। পরবর্তী জীবনে তিনিই একমাত্র নারী যিনি আউলিয়ার মর্যাদা পেয়েছিলেন। ইসলাম বলে, মানুষকে বিচার করা হবে তার পাপ দিয়ে নয় পাপের নেপথ্য কারণ কী তার ভিত্তিতে। স্বয়ং স্রষ্টাই যেখানে মানুষের পাপের নেপথ্য কারণ খুঁজবেন সেখানে আমরা মানুষ চট করেই মানুষকে বিচার করে ফেলি। মানুষের মনের প্রকৃতি না বুঝে আমরা অকারণে অন্যকে গালমন্দ করি, অন্যায় অপমানে অবিচারে ছিন্নভিন্ন করি।

৩. যদি চোখের সামনে কঙ্কাল রাখলেই মানুষ ভালো হয়ে যেত তাহলে চিকিত্সকরা প্রত্যেকে মহাপুরুষ হতেন। কারণ মানুষের শরীরের অনিবার্য পরিণতি তাদের মতো করে আর কেউ দেখেন না। কথাটির তাত্পর্য এখানেই যে, মহাপুরুষ হওয়ার জন্য নেতিবাচক দৃশ্য নয়, অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যই ভালো হতে প্রণোদিত করে। একটি কুকুর একটি খরগোশকে খেয়ে ফেলছে এমন দৃশ্য নিষ্ঠুর হতে প্ররোচিত করে। ওই একই দর্শন থেকে জেসিন্ডা আরনর্ড বলেছেন, ক্রাইস্টচার্চে হামলাকারীর নাম আমরা কেউ উচ্চারণ করব না।

প্রকৃতিতে দেখবার মতো কত ভালো ভালো দৃশ্য রয়েছে। একেকটি পাখির ওড়ার ধরন একেক রকম। এমন কী তাদের ডানা ভেঙে বাঁক নেওয়ার ধরনও আলাদা। সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম আকাশে নরম আলোর মাখামাখি। সেই রঙ সারা আকাশে নানা রঙে প্রতিফলিত হয়ে কীভাবে সারা আকাশকে রঙে রঙে ভরিয়ে দিচ্ছে, দিন শেষে সন্ধ্যার সেই জলজ সৌন্দর্যে মোহাচ্ছন্ন হওয়ার মতোই। জলের ওপর সেই আলোর আরেক মাধুর্য। বৃষ্টি ধোয়া সবুজ গাছগুলির দিকে তাকিয়ে দেখুন, অবচেতনে স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে আসে মন। আনন্দিত হতে পারাটা এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা। হয়ত সে কারণেই ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক লুরি স্যান্তোস বলেছেন, সুখী হওয়াটা এমন ব্যাপার নয় যে, এটা এমনি এমনি ঘটে গেল। এজন্য অভ্যেস করে তাতে দক্ষ হয়ে উঠতে হবে। জেনে ভালো লাগল, এই গবেষক বিশ্বের মানুষকে সুখী হওয়ার যে পাঁচটি উপায়ের কথা জানিয়েছেন তার কোনোটিই অর্থ-বিত্ত-বৈভব-যশ-খ্যাতি নয়।

n লেখক : কথাসাহিত্যিক