ফাতেমা ফেরদৌস
সত্যি বলতে কী, গত এক দশকে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। গ্লোবাল জেন্ডার রিপোর্ট অনুযায়ী নারী উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার সবার উপরে। নারী শিক্ষার উচ্চহার, নিম্ন মাতৃমৃত্যুর হার, রাজনীতি-চাকরি-বাণিজ্যে নারীর ব্যাপক প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুধু যে ভারত-পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকেই পেছনে ফেলেছে তা নয়, উপরন্তু ২০১৫ সালের আগেই পৌঁছে গেছে সহস্রাব্দের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যে-দেশের সরকারপ্রধান, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার, শিক্ষামন্ত্রী— সকলেই নারী। শ্রমশিক্ষা অধ্যয়ন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি ১৩ লাখ। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ৩ লাখ, সরকারের ব্যাপক উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের ভর্তির হার (এনরোলমেন্ট) শতকরা ৯৯ ভাগে পৌঁছেছে। অর্থাত্ ছেলেদের পাশাপাশি কন্যাশিশুরাও সমান হারে স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা লাভের সুযোগ, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকতায় নারীদের ব্যাপক হারে নিয়োগ দান, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সেবায় নারীদের সরব উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণের কারণে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ অর্জনে বাংলাদেশ ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চলেছে।
গত দশ বছরে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল লক্ষণীয়। আশা করা হচ্ছে, অচিরেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭.৮৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়াবে। জিডিপির এই উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের নারীদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় একট অংশ আসে গার্মেন্টস থেকে। গর্বের বিষয়, তৈরি পোশাক শিল্পের শতকরা ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। উল্লেখ্য, সবুজ ফ্যাক্টরি নির্মাণে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার পথে। এটা সম্ভব হয়েছে এই খাতে সফল নারী উদ্যোক্তা এবং অসংখ্য নারী পোশাককর্মীর অক্লান্ত শ্রমের কারণে। পরিবার থেকে শুরু করে কর্মস্থল পর্যন্ত (বিশেষত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে) পুরুষের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নারীকে বাধ্য করা হয়। শুধু দরিদ্র, অনুন্নত বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতেই নয়, উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও আজ অবধি চলছে নারীর প্রতি সহিংস আচরণ এবং শারীরিক, মানসিক উত্পীড়ন। অ্যাকশন এইডের এক গবেষণায় দেখা যায়, বীজ বপন থেকে ধান কাটা পর্যন্ত মোট ২২টি ধাপের কাজের মধ্যে ১৯টি ধাপে নারীরা পুরুষের সমান শ্রম দেন; কিন্তু বাজারজাতকরণ, বিপণন, অর্থ উপার্জন— এই তিনটি ধাপের কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের হাতে। কর্মজীবী নারীর উপার্জিত অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার হাতে থাকে না। পরিবারের পিতা, স্বামী, শ্বশুর বা শাশুড়ি এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে, নারী শিকার হয় মানসিক যন্ত্রণার। নিমজ্জিত হয় হতাশায়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারীরা বিনা পারিশ্রমিকে গৃহস্থালি কাজে সময় দেন গড়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা। পক্ষান্তরে, পুরুষেরা বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজে সহায়তা করেন মাত্র আধঘণ্টা। নারীর ঘরের কাজের এই অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশ হতে উন্নত দেশে পরিণত হবার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। আসুন, সবাই মিলে নারীর প্রতি সকল অন্যায়, অবিচার, হিংস্রতা, অত্যাচার, নির্যাতন, সহিংসতা প্রতিরোধ করি এবং রূপকল্প ২০২১ ও রূপকল্প ২০৪১ সফল করি।
n লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজ, ঢাকা
