ঢাক-ঢোল, একতারা দোতারা আর বাঁশিতে প্রাণের উচ্ছ্বাস

রাজধানীতে নবান্ন উত্সব

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:২০

ঢাক-ঢোল, একতারা-দোতারা ও বাঁশির সমন্বিত সুরে মুখর হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলা। সকালে হালকা শীতের আমেজে ঝলমলে রোদ ছড়িয়ে পড়তে না-পড়তেই ভিড় করেছেন নানা বয়সের উত্সবপ্রিয় মানুষ। তাদের উচ্ছ্বল পদচারণায় প্রাণের উচ্ছ্বাস আর লোকজ আমেজ সব মিলিয়ে উত্সবমুখর ছিল নবান্ন উত্সব।

 
নগরবাসীর উত্সবের কেন্দ্রবিন্দু চারুকলার বকুলতলা প্রাঙ্গণ। গতকাল মঙ্গলবার কংক্রিটের নগরীর পথ বেয়ে এখানে ছুটে আসেন তারা। মুড়ি-মুড়কি-বাতাসা আর নানা মুখরোচক পিঠার পসরা ছিল সেখানে। লোকজ উত্সবের আয়োজন করে জাতীয় নবান্ন উত্সব উদযাপন পর্ষদ। চারুকলার বকুলতলা ও ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চে নবান্ন উত্সব উদযাপনে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সুরের সঙ্গে দিনভর ছিল নানা আয়োজন।    বকুলতলায় ভোরে বংশীবাদক এসএম মোর্তজা কবির মুরাদের রাখালিয়া বাঁশির সুর-মূর্ছনায় শুরু হয় নবান্ন উত্সবের আনুষ্ঠানিকতা। বাঁশিতে ভৈরবী রাগ পরিবেশন করেন তিনি। ছিল নবান্নকথন। নবান্নকথনে স্মৃতি থেকে উঠে আসে আবহমান বাংলার গ্রামীণ চিত্র। কুয়াশাভেজা সকালে মায়েরা আয়োজন করেন শীতের নানা খাবার। খড়কুটোর উনুনের ধারে সন্তানদের আনাগোনা। হেমন্ত আর নবান্নের এই আবহমান চিত্র যেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠল নাচে-গানে-কাব্যে আর কথামালায়।
 
‘এসো মিলি সবে নবান্নের উত্সবে’ স্লোগান নিয়ে উত্সব উদ্বোধন করেন ভাষা সংগ্রামী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। দুই পর্বের উত্সবে নবান্নকথনে অংশ নেন লায়লা হাসান, শুভ রহমান, কাজী মদিনা, হাসিনা মমতাজ এবং পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ল্যাবএইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম। এর আগে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পর্ষদের আহ্বায়ক শাহরিয়ার সালাম।
 
উদ্বোধক আবুল মাল আবদুল মুুহিত নবান্ন উত্সবের ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এর ব্যাপক বিস্তারের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন ‘সর্বজনীন উত্সব চর্চা বাড়াতে হবে। নবান্ন উত্সব আমাদের সর্বজনীন উত্সব। এই উত্সবে সব ধর্ম, শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্রিত হতে পারে।’ দেশের বিভিন্ন স্থানে সামপ্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশে আজ পুরোপুরিভাবে শান্তি নেই। একটি নিকৃষ্ট শ্রেণি দেশে শান্তির প্রতি নানাভাবে আঘাত হানছে। তার বিপরীতে আজকের এই অসামপ্রদায়িক উত্সব বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।’ লায়লা হাসান নবান্ন উত্সবকে জাতীয়ভাবে উদযাপন ও এই উপলক্ষে সরকারি ছুটি দাবি করেন।
 
ডা. এ এম শামীম বলেন, ‘এই আয়োজনের সঙ্গে ল্যাবএইড যুক্ত হতে পেরে গর্বিত।’
 
উত্সব সাজানো হয় নবান্ন বিষয়ক গান ও নাচ দিয়ে। প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজনে ছিল মাটির গান, কৃষকের গান, ফসল তোলার আনন্দের গান। ফরিদা পরভীন পরিবেশন করেন লালন সাঁইয়ের গান। এরপর সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘আবার জমবে হাটখোলা বটতলা নব্বান্ন উত্সবে’, উদীচী ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’, বহ্নিশিখা ‘আয়রে আয়রে ছুটে আয় সবে আয়রে ধান কাটি ধান কাটি’, স্বভূমি ‘সুন্দর সুবর্ণ লাবণ্য’। ‘চাঁদ উঠেছে ওই, ফুল ফুটেছে ওই, নাচো দেখি সোনার মেয়ে চুল খুলে’ গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে এমআর ওয়াসেকের পরিচালনায় নন্দন কলাকেন্দ্র। ‘ঢোল বাজে ঢোল বাজেরে’ গানের সঙ্গে অনিক বসুর পরিচালনায় দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দন। সাইরেনের পরিচালনায় গারোর ওয়ানগালা নৃত্য পরিবেশন করে গারো সাংস্কৃতিব সংগঠন আচিক। শস্য তোলা ও বণ্টনের রকমফের নিয়ে বিভিন্নধর্মী নৃত্য পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন কাদা-মাটি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মানজার চৌধুরী সুইট।
 
প্রথম পর্বের পরিবেশন শেষে সকাল ৯টা ৫ মিনিটে চারুকলার বকুলতলা থেকে বের হয় নবান্ন শোভাযাত্রা। টিএসসি চত্বর ঘুরে পুনরায় চারুকলার বকুলতলায় এসে শেষ হয়। বিকাল তিনটা থেকে আটটা পর্যন্ত একযোগে চারুকলার বকুলতলা ও ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে উত্সবের দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
 
নবান্ন ও লোকজ মেলা : এদিকে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ অ্যান্ড স্টুডেন্টস ফোরাম ফর ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট’-এর আয়োজনে শুরু হয়েছে দুদিনব্যাপী ‘নবান্ন ও লোকজ মেলা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ চত্বরের সড়কদ্বীপে গতকাল সকাল ১১টায় উদ্বোধন হয় এই মেলার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে আমরা পর্যটনের ওপর একটি ডিপার্টমেন্ট চালু করেছি। পর্যটন সমাজে পর্যটকরা আসতে পছন্দ করেন কিন্তু তারা যেন এদেশে এসে কোনোভাবেই বিভ্রান্ত না হয়। আমরা চাই অতিথিপরায়ণ এই দেশে অতিথিরা একবার এলে যেন বারবার আসতে চান এবং অন্যদের এদেশে আসতে উদ্বুদ্ধ করেন। উপাচার্য বলেন, সংবেদনশীল দেশে পর্যটকরা আসতে পছন্দ করেন, কিন্তু সেই পরিবেশ আমাদের তৈরি করে দিতে হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ড. অপরূপ চৌধুরী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, টেলিভিশন-‘৭১’-এর বার্তা পরিচালক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা প্রমুখ। মেলায় হরেক রকম পিঠা-পুলি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকছে। আজ বুধবার সমাপনী দিনে মেলা সকাল ৯টায় শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে। বিকাল ৩টায় থাকছে ‘লোকজ সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প’ শীর্ষক আলোচনা। মুখ্য আলোচক থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খান।
 

ইত্তেফাক/এএন