চট্টগ্রাম অফিস
চট্টগ্রামে থামানো যাচ্ছে না ইয়াবা ব্যবসা। প্রায় প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ইয়াবার চালানসহ মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ছে। নিত্য নতুন কায়দা -কৌশল অবলম্বন করে ইয়াবা পাচার অব্যাহত রয়েছে। স্বল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় পেশাদার মাদক ব্যবসায়ীর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বেকার যুবক, পুলিশ, পরিবহন ব্যবসায়ী এমনকি মসজিদের ইমামরাও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কক্সবাজারে পিকনিক করতে গিয়ে ফেরার সময় ইয়াবা নিয়ে ফিরছেন অনেকে। সম্প্রতি দুটি পিকনিক বাস থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সৈকত শহরে সিনেমার শুটিং করতে গিয়েও অনেকে এই মাদক বহন করছে। অভিনেত্রী, মডেল গার্লদের শরীর তল্লাশী করে ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে। আশঙ্কার বিষয় হলো— মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ এই নিষিদ্ধ ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আশ্রয় শিবির থেকে বের হয়ে সীমান্তের ওপার থেকে ইয়াবা এনে এপারে সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিচ্ছে তারা। জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে সারা দেশের ইয়াবা ব্যবসার নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা হলেও চট্টগ্রামকে ব্যবহার করা হয় ল্যান্ডিং স্টেশন হিসেবে। ইয়াবার বড় বড় চালানগুলো চট্টগ্রামে আনার পর তা বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। গা ঢাকা দিয়ে থাকা দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা আড়ালে থেকেই ইয়াবা ব্যবসার কলকাঠি নাড়াচ্ছে। কক্সবাজারে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও চট্টগ্রামে এখনো এ ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যের যোগসাজশ পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। লোভে পড়ে পুলিশ বিভাগের কিছু সদস্য ইয়াবা ইয়াবা নির্মূলের বদলে এই মারণ ব্যবসা প্রসারে ভূমিকা পালন করছে। গত বছর চট্টগ্রামে সাত পুলিশ সদস্যকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। কিছু পুলিশ সামাজিক মানমর্যাদা ও শাস্তির তোয়াক্কা না করেই ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দাবি- সাঁড়াশি অভিযানের কারণে চট্টগ্রামে ইয়াবা ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বর্তমানে কক্সবাজারভিত্তিক সিন্ডিকেট অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামেও। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, কিছুদিন আগেও চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্পটে উন্মুক্ত কাউন্টারের মাধ্যমে প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রি হত। বরিশাল কলোনি, ছোটপুল, বহদ্দারহাটসহ নগরীর ছোট-বড় সেসব পয়েন্ট এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বিক্রি হচ্ছে সঙ্গোপনে। ফারুক, ডাইল বাবু, কানা মঞ্জুসহ চট্টগ্রামের শীর্ষ ইয়াবা কারবারীরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। ফারুকের সহযোগী বরিশাল কলোনির ইউসুফ, ছোটপুলের ডাইল করিম, জামতলা বস্তির ফয়সালসহ আরো বেশ কয়েকজন গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। আবার অনেকেই মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় বর্তমানে মাদক মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। আবার মাদক ব্যবসায়ীরা বাইরে থাকার চেয়ে জেলখানাকেই প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য বেশি নিরাপদ মনে করছে। কেউ কেউ জেল থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। দেশ ছাড়তে গিয়ে বিমানবন্দরে অনেকে গ্রেফতার হচ্ছে। কিছুদিন আগে বিমানে করে মালয়েশিয়া পালানোর সময় রেজওয়ান ওরফে রেদোয়ান ওরফে জুবায়ের নামে চট্টগ্রামের এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত বছর নগরীর হালিশহর এলাকার একটি বাসা থেকে ১৩ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার মামলার আসামি এই জুবায়ের।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে মাদক ব্যবসায়ীরা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে একের পর এক ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের চালান ধরা পড়ছে। তবে এই মাদক চক্র সহজে ধরা দিচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে ধরা পড়ার আগে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থল থেকে মাদকের পাশাপাশি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবের এক পদস্থ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, আত্মরক্ষার জন্য ইয়াবা কারবারীদের অস্ত্রের ব্যবহার আগের তুলনায় বেড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মাদক পাচারের সময় তারা মারাত্মক অস্ত্র বহন করে। নগরীর মুরাদপুর এলাকায় র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে অসীম রায় ওরফে ডাইল বাবু নামে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার পাশাপাশি চারজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। তার আগে খুলশী এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিনজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছিলেন।
