স্বাধীনতা উত্সবে লাল সবুজের উচ্ছ্বাস

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৯, ২২:৪০

স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও তাদের দোসরদের অনেকটা নিস্ক্রিয় করতে পারায় সারাদেশেই নতুন প্রজন্মের অভূতপূর্ব গণজাগরণ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবারের স্বাধীনতা দিবসে। লাখো মানুষের হূদয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও হাতে ছিল ভালোবাসার ফুল। কোথাও হয়েছে পদযাত্রা। বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তিরসে ভরা সুর, কথা ও সংগীত।

গতকাল মঙ্গলবার মহান স্বাধীনতা দিবসে অপশক্তি, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদ রুখে দিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে শ্রদ্ধায় অবনত জাতি স্মরণ করেছে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ সূর্যসন্তানদের। পাড়া-মহল্লা-গ্রাম থেকে শুরু করে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত মেতে ওঠেছিল লাল-সবুজের উত্সবে। যেন এত আনন্দ অতীতে কখনো দেখেনি কেউ। রাজধানী থেকে শুরু করে শহর-বন্দর-গ্রামে স্বাধীনতা দিবসের প্রতিটি কর্মসূচিতে নতুন প্রজন্মের ঢল, তাদের চোখে-মুখে ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখার দীপ্ত শপথ আর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা-ধিক্কার।

সমৃদ্ধির পথে উত্তরণে নবআনন্দে জেগে ওঠার উচ্ছ্বাস, আনন্দ, বেদনা ও বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ এবং সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক আধুনিক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে উদযাপিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। শ্রদ্ধাবনত জাতি ফুলে ফুলে ভরিয়ে দেয় সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর সমাধির বেদিমূল।

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা: প্রত্যুষে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে সূচনা হয় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানমালার। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল এ সময় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে রাষ্ট্রপতি স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন। প্রায় ২৫ মিনিট প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে অবস্থান করেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, মুক্তিযোদ্ধাগণ, বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে  প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া একাত্তরের বীর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা বেগম রওশন এরশাদ এবং মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাও শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানান। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম পৃথকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির সূর্যসন্তান বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে ঢল নামে সর্বস্তরের মানুষের।

এদিকে সকাল ৭টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোরদের সমাবেশে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। বিকাল ৪টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাক টিকিট অবমুক্ত করেন। বিকাল পৌনে ৫টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বাধীনতার আনন্দ-উত্সবে: স্বাধীনতার ৪৮ বছর পূর্তি উদযাপন করছে লাল-সবুজের অদম্য বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ সুসজ্জিত করা হয় জাতীয় পতাকায়। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনেও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সড়কে অলঙ্করণ, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে উত্সবমুখর পরিবেশে। রাজধানীর সব রাস্তায় বের হওয়া মানুষের অনেকের হাতে বা কপালে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই’ লেখা সংবলিত ফেস্টুন বাঁধা ছিল। শিশু-কিশোরদের হাতে, কারও গালে বা কপালে আঁকা ছিল রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা কিংবা প্রিয় মাতৃভূমির মানচিত্র। তরুণ প্রজন্মের ছেলেদের গায়ে জাতীয় পতাকাসদৃশ শর্ট পাঞ্জাবি বা গেঞ্জি এবং মেয়েরা লাল-সবুজের মিশ্রণে জাতীয় পতাকার আদলে শাড়ি পরে অংশ নিয়েছিল এবারের স্বাধীনতার আনন্দ-উত্সবে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল ছিল সরকারি ছুটির দিন।

সাভার স্মৃতিসৌধে সর্বস্তরের মানুষের ঢল:বাবার কোলে চড়ে ছোট্ট শিশুটি থেকে শুরু করে বয়স্করা, যাঁরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না- তাঁরাও হুইল চেয়ারে করে উপস্থিত হয়েছিলেন সাভার স্মৃতিসৌধে একাত্তরের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। হাজির হয়েছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা, সাত বীরশ্রেষ্ঠর পরিবারের সদস্যরা। স্বাধীনতা দিবসের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে স্মৃতিসৌধ ঘিরে গোটা সাভার পরিণত হয়েছিল উত্সবের নগরীতে। একই সাথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, দেশাত্মবোধক গানে ও মুহুর্মুহু শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠছিল গোটা এলাকা। গতকাল ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে। শরীরজুড়ে লাল- সবুজ রঙের উদ্দীপনা জাগানো পোশাক, হাতে হাতে ছিল রঙ-বেরঙের ফুল ও লাল-সবুজের পতাকা। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ধীর পায়ে সবার গন্তব্য ছিল স্মৃতিসৌধ বেদি। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতিসৌধের বেদিমূল। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্যগণ এবং কূটনীতিকরা স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করার পর স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এসময় তার সাথে ছিলেন বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খানসহ বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের লোকজন সুশৃঙ্খল ও সারিবদ্ধ ভাবে স্মৃতিসৌধ বেদিতে পর্যায়ক্রমে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।

এদিকে স্বাধীনতা দিবসে প্রখর রোদও দমিয়ে রাখতে পারেনি বাঙালিদের। তীব্র গরমের মধ্যেই শাহবাগ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির সামনে একদল সংগীত শিল্পীকে ট্রাকে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান গাইতে দেখা যায়। ঢোল, তবলা, বাঁশি, হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিল্পীরা একের পর এক দেশাত্মবোধক গান গেয়ে শুনিয়েছেন। সেই গান শুনতে দর্শক-শ্রোতাদের ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়।