নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার দেয়া প্রস্তাবনাকে অসাংবিধানিক, অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছে সুশীল সমাজের নেতা-নেত্রীরা। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারা জানায়, সাংবিধানিক কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে সামরিক বিভাগকে ম্যাজিস্ট্রেসি (বিচারিক) ক্ষমতা প্রদান এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে ব্যবহারের জন্য খালেদা দেয়া পরামর্শ অর্থহীন। সামরিক বিভাগকে ম্যাজিস্ট্রেসি (বিচারিক) ক্ষমতা প্রদানকে 'একটি ভয়ানক প্রস্তাব' হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় বহিরাক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য। জুডিশিয়াল ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচন সম্পর্কিত অপরাধের বিচার করা তাদের দায়িত্ব নয়।
খালেদা জিয়ার প্রস্তাবনার সমালোচনা করে বাংলাদেশের অপর একজন বিখ্যাত আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেন, আমিও চাই নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হোক এবং তারা নির্বাচন পরিচালনা করুক, সামরিক আইন নয়।
সুশীল সমাজের আরো বেশ কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়ার প্রস্তাবনায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, জামায়াত ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে কোন আলোচনা করার কথা বলা এখন অনেকটা রাজনৈতিক ভাবে বিভেদ বাড়ানোর মতই।
শুক্রবার বিকেলে গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন গঠনের এক 'স্থায়ী বন্দোবস্ত' করার পরামর্শ দিয়ে বক্তব্য দেন। এ সময় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আহ্বান জানান তিনি। নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতিকে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী ও নিবন্ধিত সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জেলা জজের মর্যাদা সম্পন্ন, নূন্যতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার সম্পন্ন, সিনিয়র আইনজীবী, বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্য থেকে নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হবেন।
খালেদা জিয়া ইসি কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা প্রদানের আহ্বান জানান। এ ছাড়া নির্বাচনের সময় ইসি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করবে বলেও প্রস্তাব দেন তিনি। তিনি এ সময় দুইজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চারজন নির্বাচন কমিশন পদে রাখার প্রস্তাব করেন।
IMG0
তার এই প্রস্তাব সম্পর্কে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে খালেদা জিয়ার প্রস্তাব বেআইনি, অবাস্তব, অগ্রহণযোগ্য ও বিভ্রান্তিকর। খালেদা জিয়া বিতর্ক সৃষ্টির জন্য এমন প্রস্তাবনা তৈরি করেছে।
তিনি আরো বলেন, পূর্ববর্তী বাছাই কমিটিতে সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিরা ছিল। এটাই সঠিক পথ। যারা সাংবিধানিক পদে থাকে তারা আইন মেনে ও নিরপেক্ষ থেকে কাজ করার শপথ করে। কিন্তু তাদের বাদ দিয়ে এখন নিরপেক্ষ মানুষ খোঁজার প্রস্তাব দিচ্ছেন খালেদা জিয়া। এর অর্থ সাংবিধানিক পদগুলোর ওপর তিনি বিশ্বাস রাখেন না। সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব প্রাপ্ত এই কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে কোথায় তিনি নিরপেক্ষ ব্যক্তি খুঁজবেন?
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খালেদার এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন নিয়ে আমি সন্দিহান। যদি এখন বিএনপি ক্ষমতায় থাকত, তাহলে এই প্রক্রিয়ায় একটি কমিশন গঠনে ব্যর্থ হত বিএনপি।
তিনি বর্তমান সরকারকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের আহ্বান জানান। বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে নতুন কিছু নেই। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী এর কাছাকাছি একটি প্রস্তাব সে ক্ষমতায় থাকা কালে দিয়েছিল। কিন্তু তিনি সেটা বাস্তবায়ন করেননি।
বরং বিএনপি চেয়ারপার্সন ক্ষমতায় থাকাকালে নির্বাচন কমিশন পদে বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছিল বলে জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সুতরাং, এ ধরণের বক্তব্য শুধু বিতর্কের জন্ম দেবে।
সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহৃত হয় না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. আব্দুর রব খান বলেন, একটি দেশের জন্য সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা আমি দেখি না। দেশের বিশেষ মুহূর্তে কেবল এই ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু এখন বাংলাদেশ এক স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। এমন অবস্থায় সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদানের কোন যৌক্তিকতা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
তিনি এ সময় সতর্ক করে বলেন, একটি দেশে বারবার প্রতিরক্ষা বিভাগকে ব্যবহার করলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অবশ্য নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে স্বাগত জানান তিনি।
নারীনেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর খালেদা জিয়ার বক্তব্যে নতুন কিছু নেই বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন আরো গুরুত্বারোপ করতে পারতেন।
ইত্তেফাক/আরএ
