সংকটে দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প...

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৯, ১৮:৫৩

ই ম রু ল  নূ র

 

এখন ঢাকাই সিনেমার ক্রান্তিকাল। নেই কোনো সিনেমা। আর যেসব সিনেমা চলছে সেগুলো আশানুরূপ দর্শক টানছে না। এমন ক্রান্তিকালে ঢাকাই ছবির ইন্ডাস্ট্রি সিনেমা সংকটে ভুগছে। মানসম্মত সিনেমার অভাবে হলে ফেরানো যাচ্ছে না দর্শকদের। আর এই সময়েই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি ঘোষণা দিয়েছে হল বন্ধের। বিদেশি ছবি প্রবেশের সহজ নীতিমালা ও দেশীয় ছবি নির্মাণ বাড়ানোর দাবি জানায় এ সমিতি। এ বিষয়ে সরকার যদি আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ না নেয় তাহলে আগামী ১২ এপ্রিল থেকে দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকবে এমন ঘোষণা দিয়েছে এই সংগঠন।

সেই দাবির প্রতিবাদে কয়েক বছর আগে কাফনের কাপড় পরে আন্দোলন করেছিল চলচ্চিত্র জগতের মানুষেরা। সেখানে ছিলেন পরিচালক ও শিল্পী-কলাকুশলীরা। নতুন করে আবারও হল বন্রে এমন ঘোষণায় নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে সিনেমাপাড়ায়। এই নিয়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনে পরিচালক ও প্রদর্শকরা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। এক পক্ষ অপর পক্ষের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন।

পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘প্রদর্শক সমিতি তাদের দাবির জন্য হল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরাও তো দাবি করেছিলাম আমাদের পরিচালকদের ন্যায্য টাকা, মুনাফা, ঠিকমতো ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা সেটা দেয়নি আমরা শুধুই অজুহাত শুনেছি। একটি ছবি মুক্তির সময় হল মালিককে মেশিন ভাড়া, ব্যানার তৈরি ও পোস্টার বাবদ টাকা দেওয়া হয়। অনেক সময় সেই টাকার মুনাফা তো দূরের কথা, খরচের টাকাও হল মালিকরা আমাদের দেন না। ফলে লোকসান গুণতে হয় প্রযোজককে। এছাড়া রয়েছে নানা উসিলায় তাদের নানা কারচুপি। এখন তারা হল বন্ধ করে দিলে আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় দর্শককে ছবি দেখাব। এরই মধ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে কথা হয়েছে। দেশের যেখানে তাদের অডিটোরিয়াম রয়েছে, সেখানে আমরা ছবি প্রদর্শন করব।’

সিনেমা হল বন্ধের বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করেছেন চিত্রনায়ক রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু মানুষ অনেক আগে থেকেই চাচ্ছে বাংলাদেশে বিদেশি ছবি চলুক। সেই লক্ষ্যে তারা দীর্ঘ দিন থেকেই কাজও করে যাচ্ছে। তাদের নানা রকমের ষড়যন্ত্র চলছে। আর এখন প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ ভাই হল বন্ধের যেই আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে বলব এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে উনাদের প্রপার লোকজনের সঙ্গে বসা উচিত ছিল। এমনিতেই তো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির খারাপ অবস্থা। এই সময় সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার উদ্দেশ্য কী তারাই ভালো বলতে পারবেন।’

‘সিনেমা হল বন্ধ করলে এবং দেশে হিন্দি ছবি আমদানি করা হলে আবারও আন্দোলনে নামবে চলচ্চিত্র পরিবার,’ এভাবেই বলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান। তিনি আরও বলেন, ‘উনারা আগেও সিনেমা হল বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। যদি দেশীয় সংস্কৃতি বাদ দিয়ে, বঙ্গবন্ধুর আইনকে পাশ কাটিয়ে হিন্দি ছবি এনে দেশকে ধ্বংস করতে চায়; আমরা পুরো চলচ্চিত্র পরিবার ও শিল্পীদের পক্ষ থেকে এর জোর প্রতিবাদ জানাব। আমরা আশা করব সব সিনেমা হল মালিকরা তাদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। দু-একজন লোকের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তাদের অসাধু বুদ্ধিতে এসব হচ্ছে। ১২ এপ্রিল থেকে যদি হল বন্ধ করে দেয় আমরা পদক্ষেপ নেব। প্রয়োজন হলে আবারও আন্দোলন করব, মাঠে নামব। তারপরও বঙ্গবন্ধুর এফডিসিকে আমরা বিদেশি ছবির আগ্রাসনে ধ্বংস হতে দেব না।’

অন্যদিকে প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ও মধুমিতা সিনেমা হলের পরিচালক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, ‘দেশে ভালো ছবি নেই, তাহলে বিদেশি ছবি আমদানি করলে সমস্যা কোথায়? প্রযোজকরা টাকা দিলে পরিচালক ছবি নির্মাণ করেন। আমাদের দেশের অনেক হল মালিকও কিন্তু প্রযোজক। আমাদের ব্যবসার কথাও চিন্তা করতে হয়। আর পরিচালকরা যদি হল ছাড়া সিনেমা দেখাতে পারে দেখাক।’

সমিতির সবার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে গোটা চলচ্চিত্রাঙ্গন উত্তপ্ত। তবে এই পরিস্থিতিতে নিশ্চুপ রয়েছেন সিনেমার প্রযোজকরা। সিনেমায় যারা লগ্নি করেন, সেই প্রযোজকরা এই বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলছেন না। চলচ্চিত্র পরিবারের অংশ হিসেবে বৃহত্তর স্বার্থে উত্তাপ নিরসনে তারা এগিয়ে আসছেন না। অনেকের কাছে এই বিষয়টি খুব একটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বরং বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, এখনকার বেশিরভাগ প্রযোজকরাই প্রদর্শকের ভূমিকায় সিনেমা হলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নিজেদের দুয়েকটা ছবি প্রযোজনার চেয়ে অন্যদের সিনেমা চালিয়ে বেশি মুনাফা আয় করেন তারা।

এদিকে কিছু কিছু পরিচালককে তাদের ছবি সুপারহিট বলে গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য সরব থাকতে দেখা যায়। হিট পরিচালকের তকমা নিয়ে প্রযোজক খুঁজতে থাকেন তারা। অথচ মাস পেরোলেই শোনা যায় কথিত ওই হিট-সুপারহিট ছবিগুলো নাকি ভালো ব্যবসা করেনি। এ কারণে অনেক পরিচালকের ওপর নীরব অভিমানও রয়েছে প্রযোজকদের।

আসলে ঢাকাই চলচ্চিত্র এক ক্রান্তিকালে এসে ঠেকেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে প্রায় ১২০০ সিনেমা হল ছিল। বর্তমানে ১৮০টিতে এসে ঠেকেছে। চলচ্চিত্রে প্রযোজকের লগ্নিকৃত অর্থ যেমন উঠে আসছে না, তেমনি সিনেমা হলের মালিক লাভ তো পরের কথা, অনেক মাসে হলের খরচও তুলতে পারছেন না। অর্থাত্ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও প্রদর্শক উভয়কেই প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

চলচ্চিত্রের এই ক্রান্তিকাল উত্তরণে সরাসরি উপমহাদেশের চলচ্চিত্র আমদানি করে সিনেমা হলে প্রদর্শনের সুযোগ চাচ্ছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি। এদিকে প্রায় ৮ বছর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির নির্বাচিত কমিটি না থাকায় প্রযোজকরা অভিভাবকহীনতায় ভুগছেন। চলচ্চিত্রাঙ্গনে অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কোনোটিরই দ্রুত সমাধান হচ্ছে না। অথচ চলচ্চিত্র উন্নয়নে যারা বেশি লাভবান হবেন সেই প্রযোজকরাই আজ নিশ্চুপ রয়েছেন।