গম্ভীরা উত্সবে মানুষের আনন্দ-বেদনার সুর

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ০৮:৫৬
 
মঞ্চে মাহবুব মানী ও তার সঙ্গী তালে তালে পরিবেশন করছিলেন গম্ভীরা গান। নানার পোশাক হলো লুঙ্গি;। তার মুখে পাকাদাঁড়ি, মাথায় মাথাল, হাতে লাঠি আর নাতির পোশাক ছেঁড়া গেঞ্জি, কোমরে গামছা। ‘হে নানা’ বলে ধুয়া তুলে সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে গান গাওয়া হয়। এভাবে নানা-নাতির নাচ-গান, কৌতুক, অভিনয়, ব্যঙ্গ প্রভৃতির মাধ্যমে গম্ভীরা গানে সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরছিলেন তারা। তাদের বাকচাতুরী, উপস্থিত বুদ্ধি এবং অঙ্গভঙ্গি মুগ্ধতা ছড়াল শ্রোতা-দর্শকের হূদয়ে।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলার বকুলতলায় প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে জাতীয় গম্ভীরা উত্সব। সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন ‘দিয়াড়’ আয়োজন করেছে এ উত্সবের।
 
গম্ভীরা মানুষের কথা বলে। মানুষের সুখ-দুঃখ বর্ণনা করা হয় গানে গানে। শিক্ষামূলক বার্তাও প্রচার করা হয় গম্ভীরার গানে। গম্ভীরার প্রধান দুই চরিত্র নানা আর নাতি। তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষের জীবন, প্রেম, দুঃখ অপমান, দেশপ্রেম সবকিছু ফুটিয়ে তোলেন। মানুষকে আনন্দে ভাসান। গতকাল বাংলাদেশের এই এতিহ্যবাহী গানে মেতে উঠলো চারুকলার বকুলতলা। মূলত হিন্দু দেবতা শিবকে সন্তুষ্ট করার মধ্য দিয়ে গম্ভীরার উত্পত্তি। শিবের অপর নাম ‘গম্ভীর’। গানে গানে তাকে সন্তুষ্ট করার মধ্য দিয়ে দেশ যেন সুজলা-সুফলা হয় সেই প্রার্থনা জানানো হতো। এখন সেই গম্ভীরায় বর্ণিত হয় সাধারণ মানুষের আনন্দ বেদনার কাব্য। বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের অন্যতম ধারা গম্ভীরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও ভারতের মালদাহ অঞ্চলে গম্ভীরার উত্স এবং প্রসার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের গম্ভীরার মুখ্য চরিত্রে নানা-নাতি জনপ্রিয়। মুক্তিযুদ্ধের পরে রকীব-কুতুব জুটি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়।
 
এখন গম্ভীরা গানে সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয় এবং তার সমাধানও বলে দেওয়া হয়। পূর্বে গম্ভীরা গানের আসরে শিবের অস্তিত্ব কল্পনা করা হতো। বর্তমানে শিবের পরিবর্তে ‘নানা-নাতি’র ভূমিকায় দুইজন অভিনয় করেন। তাদের সংলাপ ও গানের মধ্য দিয়ে দ্বৈতভাবে গম্ভীরা গান পরিবেশিত হয়। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত সংলাপ ও গানের মাধ্যমে বিষয় তুলে ধরা হয়। গতকাল শুক্রবার বিকালে দু’দিনব্যাপী উত্সবের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।  বিশেষ অতিথি ছিলেন বর্ষীয়ান নাট্যশিল্পী মমতাজউদ্দিন আহমদ, শিল্পী রফিকুন নবী, শিল্পী হাশেম খান, গোলাম মোস্তফা এমপি প্রমুখ। শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন জনপ্রিয় গম্ভীরা শিল্পী প্রয়াত কুতুব-উল আলমের ছেলে সুজাতুল আলম কল্লোল। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উত্সবের আয়োজক ‘দিয়াড়’-এর সদস্যসচিব আনোয়ার হক। জাতীয়ভাবে লোকসংস্কৃতির আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ নানা-নাতির গম্ভীরা উত্সবে শামিল হন এ গানের অনুরাগীরা। উত্সব শেষ হবে আজ শনিবার। আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আঞ্চলিক সংস্কৃতির উদ্ধার, বিকাশ ও দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া জরুরি। বিশেষ করে সংরক্ষণ খুব প্রয়োজন, তা না হলে এগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতির চর্চা চালিয়ে যেতে হবে।
 
মমতাজ উদ্দীন আহমদ বলেন, পঞ্চাশ বছর আগে গম্ভীরা গানের উত্সব দেখেছি। তখন এত মানুষ শুনতো এ গান। গম্ভীরা হলো সরস আঙ্গিকের গান। সরল গান। তামাশা রসময়তা ছড়িয়ে রয়েছে এ গানের পরতে পরতে। মূলত মানুষেল কল্যাণ কামনায় এ গান গাওয়া হয়ে থাকে।
 
রফিকুন নবী বলেন, চাঁপাইয়ের গম্ভীরা, কালাইয়ের রুটি এসব কিছুই আমাকে নস্টালজিক করে তোলে। দেশের মানুষ যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে তা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের।
 
‘দিয়াড়’ এর সদস্য-সচিব আনোয়ার হক গম্ভীরাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে নেয়ার উদ্যোগ নেয়ার কথা ব্যক্ত করেন।
 
মোট ১০টি গম্ভীরা দলের অংশগ্রহণে হচ্ছে এ উত্সব। প্রথমদিনের আয়োজন মাতান পাঁচটি গম্ভীরা দল। দলগুলো হলো মাহবুব-মানী’র চাঁপাই গম্ভীরা দল, রাজ্জাক-হিরকের নবাব গম্ভীরা দল, শিশুশিল্পী অয়ন-মীম’র মহানন্দা শিশু গম্ভীরা দল, খাবির-সাইদুরের লোক গম্ভীরা দল এবং সিরাজুল-হাসেম’র সূর্যদিগন্ত গম্ভীরা দল। আজ উত্সবের দ্বিতীয় দিনে উত্সবের প্রধান অতিথি থাকছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে উত্সবটি। সমাপনী দিনে গম্ভীরা পরিবেশনা করবে আরো পাঁচটি দল। দলগুলো হলো কল্লোল-সুমনের আদি গম্ভীরা দল, শাহ্জামাল-মনিরের রসকস গম্ভীরা দল, শিশ মোহাম্মদ-সিতেশের চাঁপাই নকশী গম্ভীরা দল, ইসমত-সাবিনা’র প্রভাতী গম্ভীরা দল এবং জাহাঙ্গীর-আজিমের পরিবেশনায় প্রয়াস ফোক থিয়েটার।
 
বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের উদ্যোগে শনিবার থেকে ঢাকায় শুরু হচ্ছে ১৪তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উত্সব। রাজধানীর জাতীয় গ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তনে শনিবার সন্ধ্যায় উত্সব উদ্বোধন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকার কথা রয়েছে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও চীনা চলচ্চিত্রকার বেইজিং ফিল্ম একাডেমির অধ্যাপক ড. শি ফির। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এবার হীরালাল সেন স্মারক সম্মাননা প্রদান করা হবে চিত্রগ্রাহক আফজাল এইচ চৌধুরীকে।
 
আয়োজকরা জানিয়েছেন, এবারের উত্সবের ভেন্যু ৬টি। জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তন ছাড়াও  জাতীয়  জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তন ও সুফিয়া কামালের মিলনায়তন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তন, এবং বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে প্রদর্শিত হবে উত্সবের চলচ্চিত্রগুলো। এছাড়া উত্সব চলাকালীন সময়ে ৩-৬ ডিসেম্বর রাজশাহীর লালন মঞ্চ ও বড়কুঠি মঞ্চে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে। এবারের আসরে ১০৯টি দেশ থেকে ২৫৬৭টি চলচ্চিত্র জমা পড়েছে। উত্সবে প্রদর্শনের জন্য ৫০০টি চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে।  এছাড়াও উত্সবে অস্কার, কান, সানড্যান্স, টিফ, ওবারহাওজেন, বার্লিন, লোকারনো, বুসানের মতো আলোচিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবের বেশকটি নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে। উত্সবের সমাপনী হবে ১০ ডিসেম্বর।
 
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে শিবলীর ‘অসময়ের গল্প’
 
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার লা গ্যালারিতে শুরু হলো তরুণ শিল্পী মনজুরুল শিবলী’র প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী ‘অসময়ের গল্প’। শুক্রবার প্রধান অতিথি হিসেবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের। আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দো ঢাকার ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বি ইউ পির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। প্রযুক্তি আমাদের নানান সুবিধা দিচ্ছে কিন্তু আমাদের অনুভূতিগুলো যেন প্রতিনিয়তই ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির প্রভাবে  মানুষের বিক্ষিপ্ত এবং বিভ্রান্ত অবস্থার গল্প নিয়েই শিবলীর প্রদর্শনী “অসময়ের গল্প”। প্রদর্শনীতে প্রায় ৩৫টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। চলবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সবার জন্য উন্মুক্ত।