আমাদের এখানে কয়েকবছর আগেও কম মূল্যের প্লাস্টিকের খেলনার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানি নির্ভর। কিন্ত গত কয়েক বছরে অবস্থা অনেকটা বদলেছে। বর্তমানে এসব খেলনার বিরাট একটি অংশই তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হিসেবে খেলনা তৈরির বিভিন্ন কারখানা গড়ে উঠছে পুরান ঢাকা এবং আশেপাশের কিছু এলাকায়। দেশের সবচেয়ে বড় এবং ব্যস্ততম খেলনার বাজার পুরান ঢাকার চকবাজারে। বেশ কয়েক বছর আগেও প্লাস্টিকের খেলনার প্রায় পুরোটাই আসত চীন ও তাইওয়ান থেকে। কিন্তু সম্প্রতি বাজারে ভালো জায়গা দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশে তৈরি খেলনা সামগ্রী। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে বিভিন্ন ধরনের খেলনার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে এ শিল্পে ব্যবহূত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমান। তবে এখনও বাংলাদেশে খেলনার বাজার অনেকটাই আমদানি নির্ভর। তবে বাংলাদেশে ছোটদের জন্য খেলনা তৈরির মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীন চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন। খেলনা প্রস্তুতকারী দেশীয় বিভিন্ন কারখানা এবং প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করা হলে এই শিল্প দ্রুত বিকশিত হয়ে বিরাট অবদান রাখতে পারে দেশীয় অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে খেলনা শিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণ পত্র বা এলসি খোলা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। এই সব এলসির মধ্যে ইতিমধ্যে নিস্পত্তি হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ মার্কিন ডলারের। খেলনা শিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির এ পরিমাণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ১৫০ ও ১০১ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। আবার ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত খেলনা শিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণ পত্র বা এলসি খোলা হয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার এবং নিস্পত্তি হয়েছে ৫ লাখ মার্কিন ডলারের।
এক সময় দেশে খেলনা সামগ্রী হিসেবে অনেক নিম্নমানের পন্য তৈরি হতো। যা ক্রেতাদের তেমনভাবে আকৃষ্ট করতো না। ফলে বিদেশ থেকে খেলনা আমদানি করা হতো, যার বেশিরভাগই আমদানি হতো চীন থেকে। তবে বর্তমানে চীন থেকে আমদানিকৃত খেলনার সমমানের অনেক খেলনা আমাদের দেশেই তৈরি হচ্ছে। দেশে উন্নত কারিগরি প্রযুক্তির অভাব থাকায় খেলনা শিল্প তেমন এগিয়ে যেতে পারছেনা। বার বার হোঁচট খাচ্ছে। দেশীয় লেদ কারখানা থেকে ম্যানুয়ালি মোল্ড তৈরি করতে হচ্ছে। অথচ বিদেশে কম্পিউটারাইজড মেশিনে এ ধরনের মোল্ড তৈরি করা হয় অত্যন্ত নিখুঁত এবং সুন্দরভাবে। আজকাল অনেক ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা চীন ও তাইওয়ান থেকে মোল্ড বা ডাইস করে নিয়ে আসছেন। ডাইস তৈরির কম্পিউটারাইজড মেশিন দেশে থাকলে বাংলাদেশেই অনেক সুন্দর, উন্নত এবং আধুনিক মানের খেলনা তৈরী সম্ভব। এতে করে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ভালো ভালো খেলনা সামগ্রী তৈরি করে বাজারে ছাড়া সম্ভব হবে। সুলভে ডাইস তৈরি করা গেলে চীনা বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে তৈরি খেলনা আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন ভালো ডাইস ডিজাইনার। দক্ষ, আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন ডিজাইনারেরও অভাব রয়েছে এখানে। শুধুমাত্র ডাইস দিয়ে খেলনা তৈরি করলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না, এর সঙ্গে আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে দেশে খেলনা শিল্পের সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক জড়িত রয়েছে। এই শিল্প যদি দিনে দিনে উন্নতি লাভ করে, তাহলে আরো অনেকেই আগ্রহী হবেন এ ব্যাপারে। এ ব্যবসায় উদ্যোক্তা বাড়তে থাকলে শিল্পটি আপনা আপনি বেশ জমজমাট হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। খেলনা তৈরির কাজটি মূলত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অন্তুর্ভুক্ত। বিভিন্ন ব্যাংক এসএমই ঋণের আওতায় খেলনা তৈরির কাজে নিয়মিত উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে মূলধন যোগান দিতে পারে। কারণ অনেক উদ্যোক্তা পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে দারুন সম্ভাবনাময় এই শিল্পটিকে এগিয়ে নিতে পারছেন না। পুঁজির যোগান পেলে খেলনা শিল্প চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে খুব দ্রুতই। সম্ভাবনাময় খেলনা শিল্পের উন্নয়নে প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতা। খেলনা শিল্পের উদ্যোক্তা, প্রস্তুতকারীদের প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন।
