কেরানীগঞ্জের শুভাড্ডায় ডক ইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে আধুনিক জাহাজ

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৫:৫৩
গ্রামের বাড়ি শ্রীনগরে। মুন্সিগঞ্জের এ. কাশেম স্কুলের বারান্দাতেও কোন দিন পা রাখেননি। অক্ষর সম্পর্কে ধারণা নেই তার। কিন্তু তার জ্ঞান আর সাহস তাকে বানিয়েছে বড় এক জাহাজ কারিগর। তার হাতেই নির্মিত হয়েছে বড় বড় জাহাজ। আজ তার এ পেশাকে বেছে নিয়েছেন এ প্রজন্মের অনেকইে। এর মধ্যে রয়েছে ভোলার হেলাল, মুন্সীগঞ্জের জসিম, ফরিদপুরের ফারুকসহ উল্লেখযোগ্য লোকজন। তাদেরও কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। নেই কোন প্রশিক্ষণ। অথচ কেরানীগঞ্জের শুভাড্ডায় তারাই নির্মাণ করছেন আধুনিক মানের বড় বড় জাহাজ। মাদারীপুর ডক ইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে পারাবত- ১৫ নামের একটি জাহাজ। জাহাজটির দৈর্ঘ্য ১৭৫ ফিট, প্রস্থ্য ৩৩ ফিট ও উচ্চতা ৩৪ ফিট। যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৭শ’ জন। খরচ হবে ৪-৫ কোটি টাকা। মাস খানেক সময়ের মধ্যেই এটি নামবে নদীতে। এমন তথ্য জানান মাদারীপুর ডক ইয়ার্ডের ম্যানেজার মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন লোক ৯ মাস কাজ করেছে।
 
সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিকরা নির্মাণ কাজে ব্যস্ত। কথা হয় ফোরম্যান কাশেমের (৫৬) সঙ্গে। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে। কাজ করেন মাদারীপুর ডক ইয়ার্ডে। ৩৬ বছর আগে বড় ভাইয়ের হাত ধরে তিনি আসেন এ পেশায়। তখন তার বয়স ছিল ১৪-১৫ বছর। বেতন পেতেন প্রতিদিন ১০ টাকা। এখন বেতন পান প্রতিদিন ১ হাজার টাকা। প্রথম প্রথম ভালো লাগত না। লোহা পেটানোর শব্দে কান তালা লেগে যেত। এ কাজ ভালো না লাগার কারণে কাশেম একদিন চলে যান গ্রামের বাড়ি মায়ের কাছে। এরপর কয়েকদিন পর আবার চলে আসেন পারাবত ডক ইয়ার্ডে। প্রথম ১ বছর শুধু খাবার খরচ দিত। কাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মালিক আমাদের  জাহাজের নকশা দেয়। ইঞ্জিনিয়ার একটু বুঝিয়ে দেয়। এরপর আমরা তৈরি করে ফেলি পুরো জাহাজ। ২৪০ ফুট লম্বার একটি জাহাজ তৈরিতে সময় লাগে ১ বছর। প্রতিদিন শ্রমিক ৪০/৫০ জন লাগবে।IMG0
  
মো. জসিম (২৮)। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে। ১০ বছর আগে বন্ধুর মাধ্যমে যোগ দেন এ কাজে। বেতন ছাড়াই বেবী সাহেবের ডকে ১ বছর কাজ করেন। পেশায় ফিটার। বেতন পান ৬হাজার টাকা করে। কাজ শুরু করেন দিন হিসেবে ৮০ টাকা। তিনি জানান, জাহাজ তৈরিতে মূলত ব্যবহার হয় লোহার প্লেটশীট আর এঙ্গেল। মেশিন সরাসরি আমদানি করতে হয় চীন থেকে। অতিরিক্ত উপাদান বলতে টি-গার্ডার, বিট-গার্ডার, রং, ইট, বালি, সিমেন্ট, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন, ওয়েল্ডিং রড আর লেদ মেশিনের কিছু খুচরা কাজ। একটি বড় মাপের জাহাজ  তৈরির জন্য প্রথমে রাজমিস্ত্রি বেস লাইন তৈরি করে দেন। পরে ঠিকাদারের নির্দেশনাক্রমে ফিটাররা জাহাজের মলিন তৈরি করেন। ওয়েল্ডার ঝালাইয়ের মাধ্যমে জাহাজটির খাঁচা নির্মাণ করেন। একটি বডি দাঁড় করানোর পর চলে মেশিন স্থাপন আর রংয়ের কাজ। পাশের ইব্রহীম শিপবির্ল্ডাসে গিয়েও দেখা যায় বিশাল একটি কার্গোজাহাজ নির্মাণে ব্যস্ত শ্রমিকরা। সেখানে কথা হয় ফোরম্যান মো. আবুল কালামের সঙ্গে । জাহাজটির চার ভাগের এক ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে মালিকের পক্ষ থেকে তাগিদ এসেছে ৩ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে জাহাজের নির্মাণ কাজ। ফোরম্যান কালামের বাড়ি খুলনার লবণ চোরায়। তিনিও প্রাথমিক শিক্ষার বেড়া ডিঙ্গাতে পারেননি। এ অবস্থায় মামার সঙ্গে চলে আসেন শুভাড্ডায়। তিনি জাহাজের ওয়েল্ডিং কাজ করেন। এ পর্যন্ত তার হাতেই নির্মিত হয়েছে প্রায় ২শ’ জাহাজ। তিনি বলেন, ২শ’ জাহাজ নির্মাণ করেছি। কিন্তু নিজের থাকার একটি ঘর তৈরি করতে পারিনি। মাসিক কোন বেতন নাই। কাজের কোন নিরাপত্তা নেই। নেই কোন বিশ্রামের জায়গা, এরপরও পাওয়া যায়না কাজের কোন নিশ্চয়তা। 
 
মো. নাজমুল হক। বর্তমানে হক শিপবির্ল্ডাসের কর্ণধার। ১৯৬০ সালে আলম ডক ইয়ার্ডে শুরু হয় কাজের গোড়া পত্তন। প্রথম প্রথম জাহাজের কাজে মন বসত না তার। তারপরও লেগে থাকেন জাহাজ নির্মাণ পেশায়। এখন তিনিই হচ্ছেন ঢাকা শিপ বির্ল্ডাসের সভাপতির। 
 
তিনি জানান, ষাটের দশকে শুভাড্ডায় জাহাজ নির্মাণের ধুম লেগেই থাকতো। রাতদিন কাজ করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে আর আগের মতো কাজ নেই। রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। নতুন জাহাজের প্লান বন্ধ ও শ্রমিকের অপ্রতুলতাকেই দায়ী করেন তিনি। তিনি আরো জানান, বড় জাহাজে ৩/৪টি খুপরি বা হেস থাকে। যেখানে ৩/৪শ’ টন পর্যন্ত মাল বহন করা যায়। প্লেটশীট আসে চট্টগ্রাম থেকে। বিদেশি কাটা জাহাজের ৮ থেকে ১২ মিলির শীট ব্যবহার করা হয়। ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে শীট কিনতে হয়। আর লোহার এ্যঙ্গেল ৭৫/৭৬ টাকায় পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। ৮/৯ লাখ টাকায় জাহাজের মেশিন আমদানি করা হয় চীন থেকে আর অন্যান্য মালামাল আসে ঢাকার বংশালে অথবা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে। সর্বসাকুল্যে একটি বড় জাহাজ তৈরিতে ৯/১০ কোটি টাকা খরচ হয়। এরপর মালিকরা সুবিধে মতো লাভ করে তা বিক্রি করেন। একটি জাহাজ ২০/২৫ জন কারিগর মিলে তৈরি করলে সময় লাগে এক থেকে  দেড় বছর।IMG1
 
জানা যায়, ১৭৯৯ সালে ব্রিটেন দ্বিতীয় যুদ্ধজোট গঠনের পর জোট থেকে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে একটি বার্তা আসে, সে বার্তায় মিত্র হিসেবে ভারতবর্ষ থেকে জাহাজ তৈরির জন্য কিছু শ্রমিক প্রেরণ করার কথা বলা হয়। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) থেকে ৩২০ জন শ্রমিক ব্রিটেনে পাঠান। শোনা যায় তারা বর্তমান ঢাকার দোহারের অধিবাসী ছিলেন। সেই থেকে জাহাজ তৈরি দোহারবাসীর আদি ব্যবসা। হালে কাঠের জাহাজের প্রচলন না থাকলেও বাংলাদেশে যারা জাহাজ তৈরি করেন বা জাহাজের ব্যবসা করেন তাদের অধিকাংশের বাড়ি ঢাকার দোহারে। আবার অনেকে ছন্দে-ছন্দে বলেন বাড়ি আমার দোহার, কাজ করি লোহার। অন্যদিকে যারা জাহাজ তৈরির কারিগর তাদের বাড়ি ঢাকার দোহার, বিক্রমপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ির, গোয়ালন্দ, আর ঢাকার নবাবগঞ্জে। 
 
সূত্র আরো জানায়,  দেশে এখন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত তৈরি হয়েছে জাহাজশিল্পকে ঘিরে। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২শ’টির মতো জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান তো বিদেশেও আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ রফতানি করছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে বাজারে দাম বাড়ায় দেশের জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত দক্ষ জনবল খুঁজতে হচ্ছে। ফলে এ খাতে দিন দিন কাজের সুযোগ বাড়ছে। 
 
 
ইত্তেফাক/এমআই