দেশে বর্তমানে ২ লক্ষ ৬৭ হাজার ২৭৬ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে শিশু ১১ হাজার ৩৫২জন। দ্রুত নগরায়ন, কর্মজীবী মানুষের স্থানান্তর, যক্ষ্মা শনাক্তকরণ যন্ত্রের অপ্রতুলতা, জনসাধারণের অসচেতনতা ও কুসংস্কারসহ বিভিন্ন কারণে এখনও ২৬ শতাংশ যক্ষ্মা রোগী শনাক্তই করা যাইতেছে না। উদ্বেগের বিষয় হইল, এই ধরনের রোগীরা নিজেদের অজান্তেই অন্যদের মধ্যে জীবাণু ছড়াইতে থাকে। দেশে যক্ষ্মা চিকিত্সার ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য আশাব্যঞ্জক হইলেও ঔষধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বা মাল্টি ড্রাগ রেজিসটেন্ট টিউবারকিউলোসিস (এমডিআর) যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল টিবি রিপোর্ট ২০১৮ অনুযায়ী, যক্ষ্মার কারণে বাংলাদেশে প্রতি বত্সর প্রতি লক্ষে মৃত্যুবরণ করে ৩৬ জন এবং প্রতি বত্সর লক্ষপ্রতি নূতন করিয়া যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয় ২২১ জন। তবে, ঔষধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা চিকিত্সার সাফল্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক অগ্রগামী। বিশ্বে যেখানে যক্ষ্মা প্রতিরোধে সাফল্যের হার ৫৪ শতাংশ, বাংলাদেশে সেখানে ৭৭ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী যক্ষ্মা এখনও প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। সারাবিশ্বে মৃত্যুর প্রধান ১০টি কারণের মধ্যে যক্ষ্মা একটি। প্রতিবত্সর এই রোগে বিশ্বে প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। যক্ষ্মা বায়ুবাহিত রোগ, মানুষের হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ইহা ছড়ায়। শরীরের যেকোনো স্থানেই যক্ষ্মা রোগ হইতে পারে। তবে শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে যক্ষ্মার সংক্রমণ ঘটে ফুসফুসে। আমাদের দেশে যক্ষ্মা চিকিত্সায় সফলতার হার শতকরা ৯৫ ভাগ, যাহা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে, সামগ্রিকভাবে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য আসিলেও এখনও শনাক্ত না হওয়া যক্ষ্মা রোগী, সেবার আওতায় না আসা, হাসপাতালগুলিতে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব, তৃণমূল পর্যায়ে সর্বাধুনিক ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থার সুযোগ না থাকা, এই রোগ নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি চিকিত্সকদের কম সম্পৃক্ততা, যক্ষ্মা শনাক্তকরণ বাধ্যতামূলক না হওয়া প্রভৃতি এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হইয়া রহিয়াছে।
সরকার ২০৩৫ সাল নাগাদ যক্ষ্মায় মৃত্যুর হার ৯৫ শতাংশ ও প্রকোপের হার ৯০ শতাংশ কমাইয়া আনিতে চায়। অথচ যক্ষ্মা রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিত্সায় সমন্বয়হীনতা চলিতেছে। সরকারি ও বেসরকারি মোট ৪৩টি সংস্থা দেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে কাজ করিতেছে অনেকটা সমন্বয়হীনভাবেই। উপরন্তু, সকল রোগী চিকিত্সার আওতায়ও আসেনি। তাই লক্ষ্য অর্জন করিতে হইলে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি এই কাজে সম্পৃক্ত বেসরকারি সংস্থা ও সামাজিক শক্তিকেও একসঙ্গে কাজ করিতে হইবে। যক্ষ্মারোগ নিয়ন্ত্রণে সঠিকভাবে রোগ শনাক্তকরণের পাশাপাশি রোগীদের নিয়মিত ঔষধ খাওয়া জরুরি। ফলে, সকলকেই সচেতন হইতে হইবে। স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়া যক্ষ্মা রোগ নির্মূলে সাফল্য অর্জন করিতে হইলে অধিকতর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার আবশ্যক। কিন্তু বিগত পাঁচ বত্সরে যক্ষ্মা রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ শতাংশ। এই বরাদ্দ অন্তত ২০ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারে। যেমন, যক্ষ্মা শরীরের সর্বত্রই হইতে পারে—এরূপ তথ্য সকলের নিকট পৌঁছাইয়া দেওয়া প্রয়োজন। শিশুর যক্ষ্মা বিষয়েও আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে, আধুনিক প্রযুক্তিগুলির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করিতে হইবে।
