নানাবিধ সমস্যায় জাপানের অর্থনীতি

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪১
 
জাপানের অর্থনীতির জন্য গত দুই দশক- এ প্রসঙ্গে যে কোনো জাপানিকে কিছু বলতে বললে শুরুতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অর্থনৈতিক মন্দার দায়ে এ সময়টা তাদের কাছে ‘কালযুগ’ হিসেবে চিহ্নিত। কিঞ্চিৎ হলেও ঐশ্বর্য হারানোয় অর্থনীতিবিদদের কাছে এ দুই দশক হচ্ছে, ‘লস্ট ডিকেডস’। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তা মানতে নারাজ। তাদের কাছে এ দুই দশক  লস্ট ডিকেডসতো নয়ই; উপরন্তু বহু কিছু অর্জনের দশক বা ‘গেইনড ডিকেডস’, বিশেষত সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সামাজিক পরিপক্বতা অর্জনের দৃষ্টিকোণ থেকে। তদুপরি সেখানে মাঝারি আয়ে লিঙ্গগত মজুরি বৈষম্য এখন পর্যন্ত প্রায় ২৭ শতাংশ, যা কিনা অধিকাংশ উন্নত দেশেই অকল্পনীয়। বিয়ের পর জাপানি মেয়েদের ক্যারিয়ার গঠনকে নিরুৎসাহিত করা হয়। সেখানকার শ্রমশক্তিতে বিদেশিদের প্রতিনিধিত্ব দুই শতাংশেরও কম, যেটি ইউরোপীয় দেশগুলোয় গড়ে ১০ শতাংশ আর  যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় ১৬ শতাংশ। নিশ্চল অর্থনীতিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে চাইলে শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দাভাব কেটে যাওয়াই যথেষ্ট নয়, বুড়ো লোকের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াতে ধস নামা জন্মহারকে টেনে তোলাটা একান্ত আবশ্যক। বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমশক্তিতে নারী ও অভিবাসীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাটা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। মারাত্মক মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধির নিশ্চলতা এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ সরকারি ঋণ, এই তিন বিষয় জাপানের অর্থনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে।
 
প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবের মাত্রিক সহজতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের বৈপ্লবিক নীতি উপরোল্লিখিত তিন সমস্যার গায়ে আঁচড়ও কাটতে পারছে না। প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম প্রজনন হার (প্রতি নারীতে ১.৪) এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ গড় আয়ুর (৮৩.৭ বছর) মিশ্রণের অর্থ হচ্ছে, জনসংখ্যাগত কঠিন সমস্যা মোকাবেলা করছে জাপান। অর্থনীতিতে অবদান রাখতে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে ঠিকই সাহায্য-সহযোগিতা যুগিয়ে যেতে হচ্ছে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা বুড়ো লোকদের প্রতি। নানাবিধ কারণে জাপানের শ্রমশক্তিতে আরো নারী যুক্ত হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি।
 
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনোমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-এর তথ্যানুসারে জাপানে সন্তান জন্মদানের পর মাত্র ৩৮ শতাংশ নারী তাদের চাকরিটি চালিয়ে যায়। মেয়েদের ওপর থাকা প্রবল সামাজিক প্রত্যাশার চাপ এবং শিশুসেবা কেন্দ্রের অপ্রতুলতাই এর মূল কারণ। অন্যান্য দেশের লোকদের জাপানে স্থায়ী হওয়ার পেছনে আরো অনেক বিষয়ের মতো এটিও প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। জাপানের চড়া শ্রমের মূল্যের জন্যে শিশুসেবা পাওয়া ও আয়া রাখার বিষয়টি আমজনতা চিন্তাও করতে পারে না। এসব দিক চিন্তা করেই গৃহকর্মী হিসেবে ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর নাগরিকদের অনুমোদন দেয়ার নিয়ম-কানুন শিথিল করা হয়েছে অতিসম্প্রতি। জাপানিদের তুলনায় ফিলিপিনোরা অনেক কম খরচে শিশুযত্ন ও গৃহকর্মী সরবরাহ করতে পারে। ১৯৮০’র দশকের শেষদিক পর্যন্ত নিশ্চিতভাবেই ধরে নেয়া হতো যে, পরিবারের তরুণ সদস্যটি পারিবারিক ব্যবসাতেই যুক্ত হবে। ১৯৯০’র অর্থনৈতিক পতনের পরই পাল্টাতে শুরু করে অনেক কিছু।
 
সর্বশেষ অর্থনৈতিক পতনের পর জাপানের তরুণ-তরুণীদের মধ্য থেকে উত্থিত হয় এক নতুন শ্রেণি, ‘ফ্রীটার্স’ নামে যারা পরিচিত। কলেজ শেষ করার পর নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি থেকে বঞ্চিত হয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ক্যারিয়ার গঠনে সৃজনশীল পন্থা উদ্ভাবনে ব্যস্ত হতে শুরু করে। ‘স্যালারিম্যান’ পরিচয় ও ‘অফিসলেডি’ সংস্কৃতি থেকে অনেক তরুণ-তরুণী বের হতে পেরেছিল বলেই সমৃদ্ধ জাপান সমৃদ্ধতর হতে পেরেছিল।—ফরেন পলিসি অনুসরণে