এক সময়ের খরস্রোতা শীতলক্ষ্যা এখন অনেকটা মৃতপ্রায়। ব্রিটিশ আমলে যে শীতলক্ষ্যার সুপেয় পানি ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ডান্ডি এলাকার বাসিন্দারা এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য শেষে দেশে ফেরার সময় বোতলজাত করে নিয়ে যেত, মাত্র অর্ধশত বছরে সেই শীতলক্ষ্যার পানি এখন এতটাই দূষিত যে নদী তীর দিয়ে হাঁটার সময় নাকে রুমাল চেপে চলতে হয়। গার্মেন্টস ও ডাইং কারখানা, সিমেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন মিল-কারখানার বর্জ্যে শীতলক্ষ্যার পানি এখন ব্যবহারের একেবারেই অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পানি নোংরা হতে হতে এতই কালো হয়ে গেছে যে দেখলে মনে হয় তরল আলকাতরা।
জানা যায়, মূলত ষাট দশকের পর থেকেই শীতলক্ষ্যা নদী সরু হতে শুরু করে। স্বাধীনতার পরও শীতলক্ষ্যার পানি অনেকটাই স্বচ্ছ ছিল। নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ লোকই শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করে তৃপ্তি পেত। নৌ-বন্দর টার্মিনালের পাশে নৌকায় গড়ে উঠেছিল বেশ কয়েকটি হোটেল। এইসব হোটেলে দূর-দূরান্ত থেকে এসে লোকজন খানা-পিনা করত। শীতলক্ষ্যার মাছ খেতে ছিল খুবই সুস্বাদু। জেলেদের কোলাহলে মুখরিত ছিল শীতলক্ষ্যা নদী। বিকালে অনেকেই শখের বসে নিয়মিত মাছ ধরতেন। শীতলক্ষ্যার আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল শিশু মাছের খেলাধুলা। নারায়ণগঞ্জবাসীর মাছের চাহিদার অর্ধেকই মিটত এই শীতলক্ষ্যা নদী থেকে। আশির দশকের পর থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষিত হতে শুরু করে। নব্বই দশকে শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে পাটের ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়। ২০০০ সালের পর থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরের শতাধিক পাটের গুদাম ও প্রেস হাউজ বন্ধ হতে শুরু করে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দেওয়াসহ বিজেএমসির মালিকানাধীন বিভিন্ন জায়গা বিক্রি করে দিলে শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন মিল-কারখানা, গার্মেন্টস, ডাইং ও সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। ফলে এই সব মিল-কারখানার বর্জ্যে দিন দিন শীতলক্ষ্যার পানি দূষিত হতে শুরু করে। বর্তমানে শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা কয়েকশ শিল্প-কারখানার বর্জ্যে পুরোপুরি দূষিত হয়ে পড়েছে নদীর পানি। কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানির কারণে এবং সেই সঙ্গে পচা পানির গন্ধে নদীর দুই তীরের লোকজন নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নদীতে এখন মাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে, সামান্য যেটুকু পাওয়া যায় তা নোংরা পানির দুর্গন্ধে ও বিষাক্ত কেমিক্যালের কারণে খাওয়ার অযোগ্য। শীতলক্ষ্যায় শিল্প-কারখানাগুলোর বর্জ্য ফেলা বন্ধ হচ্ছে না, ফলে পানিও আর পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে-মধ্যে অভিযান চালালেও বাস্তবে শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণরোধে তেমন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।
শিল্প-কারখানার বর্জ্যে শীতলক্ষ্যা এখন প্রায় মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান এমপি বলেন, নদীর দুই পাশে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা বিশেষ করে ডাইং কারখানার বর্জ্য যাতে নদীতে ফেলা না হয় এ জন্য বিকেএমইর পক্ষ থেকে ইটিপি নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যারা ইটিপি ব্যবহার করবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে। শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা বৃহত্ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান নীট কনসার্নের বিরুদ্ধে শীতলক্ষ্যায় বর্জ্য ফেলার অভিযোগ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আলহাজ জয়নাল মোল্লা জানান, আমরা সার্বক্ষণিক ইটিপি ব্যবহার করি। আমাদের কারখানার বর্জ্য কোনো অবস্থাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা হয় না। আকিজ ফ্যাক্টরির ম্যানেজার এডমিন শিশির জানান, তারা শীতলক্ষ্যা নদীতে কোনো অবস্থাতেই বর্জ্য যাতে না যায় সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেই কারখানা চালাচ্ছেন। একই ধরনের বক্তব্য শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন গার্মেন্টস ও ডাইং কারখানার মালিকদের। কেউই শীতলক্ষ্যা নদীতে বর্জ্য ফেলার কথা স্বীকার করেননি।
একদিকে নদীতে এই দূষণ প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে এক সময়কার সে াতস্বিনী শীতলক্ষ্যা এখন দখলে দখলে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে আবুল খায়ের গ্রুপ ও প্রাণ আরএফএল গ্রুপের স্থাপনাসহ ২৭টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালক মো. শহীদ উল্লাহ জানান, উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম দিনে ১৬ জানুয়ারি আবুল খায়ের গ্রুপের সিরামিক কারখানাসহ প্রায় ১৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় এবং কয়লা ও পাথরের নিলামসহ ৪ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়।
