ভুয়া ভোটারে জেলা পরিষদ নির্বাচন

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ১০:৩৯

২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের নির্বাচনে সহস াধিক জনপ্রতিনিধি ভোট দিতে পারছেন না। উল্টো ভুয়া ভোটার সংযোজন করে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা প্রকৃত ভোটার সেসব প্রতিনিধিকে নির্বাচিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করেছে। কিন্তু ভোটার তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পরও তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটি মৌলিক অধিকার হরণ—বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিবালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, গত ২০ নভেম্বর জেলা পরিষদের ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। এখন নতুন করে কাউকে সংযোজন বা বিয়োজন করার সুযোগ নেই। ভোটার তালিকায় নাম থাকার পরও আইনানুযায়ী ভোটের সময় কোনো জনপ্রতিনিধি যদি পদ হারান তবে তিনি ভোট দিতে পারবেন না। কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই নির্দেশনা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
 
প্রসঙ্গত জেলা পরিষদ আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী, ‘প্রত্যেক জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি করপোরেশন যদি থাকে, এর মেয়র ও কাউন্সিলরগণ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানগণ, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরগণ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সমন্বয়ে উক্ত জেলার পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হবে।’ (৩) উপ-ধারা (১)-এর অধীন নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য নন এরূপ কোনো ব্যক্তি ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য হবেন না। (৪) এই ধারার অন্যান্য বিধান সত্ত্বেও ভোটার তালিকাভুক্ত কোনো ব্যক্তি পরিষদের নির্বাচনে ভোটদানের পূর্বে যদি নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারান তা হলে তিনি উক্ত নির্বাচনে ভোটদান করতে পারবেন না বা উক্ত নির্বাচনের জন্য ভোটার বলে গণ্য হবেন না।
 
স্থানীয় সরকারের চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে সাড়ে ৬৫ হাজার জনপ্রতিনিধির ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভোটার হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৬৭ হাজারের মতো। গত ২০ নভেম্বর জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় চূড়ান্ত করা হয় ভোটার তালিকা। আর আলোচ্য ওই আইন স্পষ্টতই লঙ্ঘন করে ওই ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
 
গত ৩১ অক্টোবর ৩৯৯টি ইউপিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু এসব নিবাচনে নির্বাচিতদের নাম গেজেটে ২০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু কেন তা করা হয়নি— এর কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচনে কমিশনের সংশ্লিষ্টদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের খেসারত ওইসব ইউপির প্রায় পাঁচ শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে দিতে হবে কেন? সে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে তাদের মৌলিক অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়েছে।
 
ইসির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ২০ নভেম্বর জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত করা ভোটার তালিকা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি আসে। বিশেষ করে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ওই পরিষদের পরাজিতদের ভোটার তালিকায় নাম পাওয়া যায়। এই পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকার সংযোজন-বিয়োজন নিয়ে কাজী রকিবউদ্দীন নেতৃত্বাধীন কমিশন একাধিক সভা করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। ফলে তফসিল ঘোষণার সময় করা তালিকা বহাল রাখা হয়।
 
গত ২২ মার্চ প্রথম ধাপে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ১২টি ইউপির ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালট ছিনতাইয়ের কারণে কুশোডাঙ্গা ও কেলারকাতা ইউপির নির্বাচন বন্ধ ছিল। এই দুই ইউপির চেয়ারম্যানসহ সাতটি পদে গত ৩১ অক্টোবর পুনঃভোট অনুষ্ঠিত হয়। অথচ জেলা পরিষদের ভোটার তালিকায় ওই দুই ইউপির ২০১১ সালে নির্বাচিত ২৬ জন জনপ্রতিনিধির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত ২২ মার্চ নির্বাচনের পর ১৯ জনের নামে গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি শপথ অনুষ্ঠিত হলেও তারা ভোটার হতে পারেননি।
 
এ বিষয়ে কুশোডাঙ্গা ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য আলী আহম্মদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি গত পরিষদের সদস্য হিসেবে জেলা পরিষদে ভোটার হয়েছি।’ ৮নং কেলারকাতা ইউপির চেয়ারম্যান মোঃ আবদুল হামিদ ইত্তেফাককে বলেন, গত দেড় মাস আগে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও আমাকে জেলা পরিষদের ভোটার করা হয়নি। এ বিষয়ে নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করা হলেও তারা সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
 
গত ৩১ অক্টোবর ৮২টি ইউপিতে সাধারণ ভোট, ১৯৭টিতে পুনঃভোট, ৬২টিতে সমভোট এবং ৬৭টি ইউপিতে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যাদের অধিকাংশই জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটার হননি। এর মধ্যে তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচিত হওয়ার গেজেট প্রকাশিত না হওয়ায় জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন না মাগুরার ১৮ জনপ্রতিনিধি। ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া জনপ্রতিনিধিরা হলেন-মহম্মদপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ১২ সদস্য, শ্রীপুর উপজেলার শ্রীকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও দুই সদস্য, একই উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য এবং সদরের শত্রুজিত্পুর ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য।
 
এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আহম্মদ আলী বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত তারিখের পর গেজেট প্রকাশিত হওয়ায় ১৮ জন জনপ্রতিনিধি ভোটার হতে পারেননি। গত ২০ নভেম্বরের মধ্যে যেসব জনপ্রতিনিধি দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাগুরার মতো বিভিন্ন জেলায় অসংখ্য জনপ্রতিনিধি জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটার হতে পারছেন না। আবার মামলা জটিলতার কারণেও অনেক জায়গায় ভোটার হতে পারেননি জনপ্রতিনিধিরা। এর মধ্যে বরগুনা জেলা পরিষদ নির্বাচনে আমতলী উপজেলার আমতলী পৌরসভা ও আমতলী সদর ইউপির জনপ্রতিনিধিরা ভোট দিতে পারছেন না। উচ্চ আদালতে মামলার কারণে এ পৌরসভা ও ইউপিতে নির্দিষ্ট সময়ের নির্বাচন বন্ধ থাকায় স্থানীয় সরকারের এ দুটি প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিরা ভোটার হতে পারেননি।
 
উল্লেখ্য, জনপ্রতিনিধিদের পরোক্ষ ভোটে আগামী ২৮ ডিসেম্বর ৬১ জেলায় চেয়ারম্যান, সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য পদে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি জেলায় স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ভোটেই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচিত হবেন। প্রতিটি জেলায় ১৫ জন সাধারণ ও পাঁচজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য থাকবেন। ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশের যে কোনো ভোটার জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারলেও ভোট দিতে পারবেন না। আর জনপ্রতিনিধিরা ভোটার হলেও প্রার্থী হতে পারবেন না। সংসদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন হলেও জেলা পরিষদ আইনে প্রত্যক্ষ ভোটের বিধান নেই।

ইত্তেফাক/এএন