শিশু শ্রমকে 'না' বলি

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৩:২৮
একটি শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তার সুষ্ঠু বিকাশের দিকে যেমন নজর দিতে হবে তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ করে দিতে হলে অবশ্যই শিশুশ্রম থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে।
 
বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯২৪ সালে জেনেভায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে 'শিশু অধিকার' ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৯ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষর করে। বর্তমান আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে।
 
শিশু অধিকার সনদে ৫৪টি ধারা এবং ১৩৭টি উপ-ধারা আছে। এই উপ-ধারাগুলোতে বলা হয়েছে, শিশুদের ক্ষেত্রে কোন ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। সমাজকল্যাণমূলক কাজ এবং আইনের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ। রাষ্ট্রসমূহ শিশুদের পরিচর্যা ও সরকার শিশুদের সেবা এবং সুবিধাদি প্রদান করবে। শিশুদের মৌলিক অধিকার যেমন : শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি অধিকারগুলো নিশ্চিত করবে।
 
শিশুর পরিচয় ও জাতীয়তা অর্জন এবং প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার থাকবে। শিশুকে অপহরণ করা, অবৈধভাবে দেশত্যাগ করানো অথবা পাচার করা যাবে না। শিশুর বিকাশের জন্য উন্নত পরিবেশ এবং অধিকার দিতে হবে। পিতা-মাতার পরিচয়বিহীন শিশুকে রাষ্ট্র লালন করবে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন ও অত্যাচার করা যাবে না। যৌনাচারে ব্যবহার করা যাবে না। পঙ্গু শিশুকে পরিপূর্ণ সামাজিক সুন্দর পরিবেশে জীবন যাপনের মর্যাদা দিতে হবে। শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। শিশুদের আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। শিশুদের অপরাধ জগতে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করতে হবে।
 
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাড়ে চার লাখ শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। যারা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। বরং তারা বেড়ে ওঠে নিরানন্দ পরিবেশ, বৈষম্য, সহিংসতা, বঞ্চনা ও নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে। সমাজে অনেক পরিবার মেয়েশিশুদের বোঝা মনে করে। তাই শিশু বয়সেই তাদের অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠায় অথবা বিয়ে দিয়ে দেয়। এদের অনেকেই প্রতিনিয়ত শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষণ-নিপীড়নের শিকার হয়। তাই এই সব সম্ভাবনাময় শিশু ভবিষ্যতে অশিক্ষিত, দুর্বল ও পুষ্টিহীন হয়ে পড়ে। একটি শিশুর বিকাশের সময় সে অন্যের বাড়িতে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে থাকে। সঠিক কর্মঘণ্টা নির্ধারিত না থাকায় দেখা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাকে একটার পর একটা কাজ করতে হয়। ফলে, তার শিক্ষা, বিনোদন, সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশ্রাম, এমনকি কিশোর বয়সে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনজনিত তথ্য সহায়তা ইত্যাদি থেকেও সে বঞ্চিত হয়।
 
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের ৬ নম্বর ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্র শিশুর জীবন রক্ষা ও পূর্ণ বিকাশে সকল প্রকার দায়িত্ব পালন করবে।' এছাড়া সব শিশুর মৌলিক ও মানবিক প্রয়োজন পূরণ আমাদের সংবিধানের অঙ্গিকার।
 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা-২০১৩ থেকে জানা যায় যে, দেশে মোট সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু কর্মরত আছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশু রয়েছে যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং যথেষ্ট বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন করা সম্ভব হবে। আর ২০২৫ সালের মধ্যে নিরসন হবে সব ধরনের শিশুশ্রম। -বাসস।
 
ইত্তেফাক/এসএস