জামদানি :তাঁতে কবিতার শৈল্পিক বিন্যাস

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ০১:০০

জামদানি বাংলার এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এর নক্শার ছন্দে, রঙের বিন্যাসে ফুটে ওঠে তাঁতে শৈল্পিক বিন্যাস। জামদানি পৃথিবীর বয়নশিল্পের ধারাবাহিকতায় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। ইউনেস্কো জামদানিকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটজ অব হিউম্যানিটি’ ঘোষণা করেছে। এই কারুশিল্পের সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও কারুশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করতে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ‘ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন’ এর পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। সেই গবেষণার অংশ হিসাবেই গতকাল রবিবার জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়েছিল ‘জামদানি নক্শা সংরক্ষণ’ সেমিনার।

 
সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতির ধারক জামদানিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। এর ডিজাইন, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা যেমন জরুরি তার জন্য বেশি জরুরি তাঁতিদের পৃষ্ঠপোষকতা। কারণ ভাল জামদানি তৈরিতে যে সময় লাগে সে তুলনায় টাকা খুব কম পান তাঁতিরা। তাই তাঁতিদের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনার দিকে বেশি নজর দেয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি তাঁতিদের ভর্তুকি মূল্যে ভালমানের সুতা সরবরাহের দাবিও জানান বক্তারা। সেইসঙ্গে গ্রামীণ নারীরা এই জামদানি বোনার দিকে যাতে এগিয়ে আসে সে জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান উদ্যোক্তারা। এছাড়া জামদানি জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন প্রটেকশন ‘ল’ কার্যকর করা, তাঁতিদের অধিকার রক্ষা, চার শতাধিক তাঁতির সাক্ষাত্কার নিয়ে জামদানির ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা ও তা বই আকারে লিপিবদ্ধ করার প্রযোজনীয়তার কথাও উঠে আসে সেমিনারে।
 
প্রতিটি জামদানি অনন্য, কেননা এই কাজ প্রিন্ট বা কপি করা যায় না। জ্যামিতিক নকশার এই কাজ ফুটিয়ে তোলা খুব পরিশ্রমের এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য মসলিনের মতই জামদানিও খুব স্পর্শকাতর। এমনকি শীতলক্ষা নদীর তীরে বিশেষ পরিবেশ ও পানির লবণাক্ততার পরিমাণও জামদানির সুতা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো উপাদান কমবেশি হলে জামদানি সুতার মান ঠিক থাকে না। জামদানির নকশাও খুব চমকপ্রদ। এসবের ডিজাইনও শত শত বছর ধরে টিকে রয়েছে বাংলার ঘরে ঘরে। এসবের নামগুলোও খুব আকর্ষণীয়। বটপাতা বুটি, ইয়ারিং বুটি, আঙুললতা পাড়, বাঘের পাড় বুটি, গোলাপছড় পাড়, ইঞ্চি পাড়-করাত তেছরি। গবেষণায়, জামদানির প্রায় ৩৫৯টি ডিজাইন মিলেছে। এর মধ্যে পাড়ের ডিজাইন ৪৫টি, বুটি ৩৩টি, তেছরি ২১টি, জাল ৭টি, ছিটা ৫টি, আঁচল ৭টি, হাইসা ৪টি।
 
বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের আয়োজনে ও জাতীয় জাদুঘরের সহযোগিতায় আয়োজিত এ সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব আকতারী মমতাজ, জাতীয় জাদুঘরের মহাসচিব ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, সম্মানিত অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট। মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন চন্দ্রশেখর সাহা। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন শিল্পী নিসার হোসেন ও ডিজাইনার রুবী গজনভী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রকল্প সমন্বয়ক শাহিদ হোসেন শামীম। দুজন তাঁতিও তাদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। এরা হলেন আবুল কাসেম ও আব্দুল জব্বার।
 
রাষ্ট্রদূত স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক তাঁতশিল্প পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত। এখানকার মসলিন ও জামদানির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, তাঁতশিল্পীরা তাদের স্মৃতির মধ্যে জামদানি নকশাকে বংশপরম্পরায় বহন করে চলেছেন। এই হাতে বোনা তাঁতশিল্প এখন সংকটের মুখে। সবার মিলিত উদ্যোগে একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
 
চন্দ্রশেখর সাহা বলেন, জামদানি গৌরবের স্মারক। একে টিকিয়ে রাখতে বাজার সম্প্রসারণ, তাঁতিদের সঠিক দাম নিশ্চিত করা, ডিজাইন সংরক্ষণসহ সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
 
শিল্পী নিসার হোসেন বলেন, তাঁতিদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে না পারলে জামদানি হারিয়ে যাবে। শিল্পীদের আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকলে শুধু ভাল কাজ করার সুনাম পাওয়ার আশায় এই বয়নশিল্পে কোনো তাঁতি দীর্ঘদিন টিকে থাকবে না। তাই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পের এই নিদর্শনকে টিকিয়ে রাখতে বাস্তবসম্মত প্রণোদনা প্রয়োজন।
 
রুবী গজনভী বলেন, জামদানির ডিজাইনের মৌলিকত্বকে রক্ষা করতে হবে। ফিউশন  আসবে কিন্তু মূল পরম্পরাকে হারিয়ে ফেললে চলবে না। এ জন্য তাঁতিদের চাইতে যারা অর্ডার দেন তাদের ঐতিহ্যের প্রতি নিবেদিত হতে হবে।
 
দুজন তাঁতি তাদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে জামদানি তাঁতিদের পুনর্বাসন করে তাদের নিরবচ্ছিন্নভাবে জামদানি বয়নের কাজে নিয়োজিত করার দাবি জানান।
 
মিলনায়তনের সামনের উন্মুক্ত অংশে বসেছিল জামদানির ডিজাইনের মেলা। নানা ধরনের সংগ্রহীত ডিজাইন দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে।

ইত্তেফাক/এএন