১৯৫৫ সালের কথা। আমি তখন চাঁদপুর হাসান আলী হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। ওই সময়ে কচি-কাঁচার আসর থেকে সদস্য সংগ্রহের আহ্বান করা হয়। নির্দিষ্ট ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে পাঠিয়ে দিই ইত্তেফাকের ঠিকানায়। কচি-কাঁচার আসর থেকে বলা হয়, অমুক দিন খ্যাতনামা লেখক-সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে লটারির মাধ্যমে কচি-কাঁচার আসরের সদস্য নির্বাচিত করা হবে। কচি-কাঁচার সদস্যদের তখন ‘সভ্য’ বলা হতো। নির্দিষ্ট দিনে সভ্য নির্বাচন করা হয়। আমার এখনো মনে আছে, লটারিতে প্রথম ওঠা নামটি ছিল মহিউদ্দিন মনসুর। একসময় কচি-কাঁচায় প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছে তাঁর। পরবর্তী সময়ে তিনি সফল প্রকৌশলী হয়েছেন। আমার নাম ওঠে ১২৪ নম্বরে। অর্থাত্ আমার সভ্য নম্বর ১২৪।
সভ্য হওয়ার পর নিয়মিত লেখা পাঠাতে থাকি। সংবাদের খেলাঘর এবং আজাদের মুকুলের মাহফিলে নিয়মিত লেখা প্রকাশ হলেও কচি-কাঁচায় একটি লেখাও প্রকাশিত হয়নি। তখন দাদাভাইয়ের প্রতি মন খারাপ হয়ে যায়। আমি যখন চারুকলায় ভর্তি হই, তখন দাদাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি। দীর্ঘ পথ হেঁটে ৯নং হাটখোলা রোড ইত্তেফাক অফিসে আসি। একটি টিনশেড ঘরে ছোট ছোট ডেস্কে সাজানো অফিস। আমি দাদাভাইয়ের ডেস্কে গিয়ে বসি। খুব যত্নের সঙ্গে দাদাভাই আমাকে একটি চেয়ারে বসালেন। বললেন, তুমি কি চা খাও? আমি বললাম, অল্পস্বল্প অভ্যেস আছে। দাদাভাই পিয়নকে ডেকে বললেন, ওকে চা-নাস্তা দাও। বলেই দাদাভাই আবার আমার দিকে ঘুরে বললেন, তুমি বসো। হাতের কাজ শেষ করে তোমার সঙ্গে কথা বলব।
তখন আমি দারুণ ক্ষুধার্ত ছিলাম। পিয়ন আমার সামনে চা আর দুটো রসগোল্লা রাখলেন। তোমরা বিশ্বাস করবে না, ওই রসগোল্লার স্বাদ এখনো আমার মুখে লেগে আছে। আমার জীবনের সেরা রসগোল্লা খেয়েছি সেদিন। একটু পর দাদাভাই বললেন, তুমি কি আরো রসগোল্লা খাবে? আমি বললাম, না। দাদাভাই বললেন, তোমার নাম কী? আমি বললাম, হাশেম খান। এবার দাদাভাই আমার লেখা ও আঁকা নিয়ে বলতে শুরু করলেন—তুমি হাশেম খান? তোমার লেখা এবং আঁকা তো আমি পেয়েছি। কিন্তু আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল, কাঁচা হাতের কেউ এরকম লেখতে বা আঁকতে পারে না।
সন্দেহের কারণ হলো, আমার আঁকা ছবির মাপ কেমন হবে ব্লক ও কলামসহ তা আমি ছবির সঙ্গে লিখে দিয়েছিলাম। দাদাভাই বললেন, এত নিখুঁত হিসাব অভিজ্ঞ ছাড়া কারো জানার কথা নয়। আমরা মনে করেছি, কোনো জানাশোনা লোক ছদ্মনামে লিখছে। তাই লেখা ছাপিনি। আমি আর্টের ছাত্র শোনার পর দাদাভাই যেন আমাকে আলাদা চোখে দেখতে শুরু করেন। নিয়মিত বিরতিতে আমার লেখা-আঁকা ছাপতে থাকেন।
একদিন দাদাভাই ঈদসংখ্যার দুটো গল্পের ছবি আঁকার দায়িত্ব দেন আমাকে। তখন পর্যন্ত এ প্যাটার্নের ছবি আমি আঁকিনি। বলা ভালো, আঁকা শিখিনি। তখন আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ ধরনের ছবি শেখানো হয় তৃতীয় বর্ষে। দাদাভাইকে বললাম, আমি কি পারব? দাদাভাই বললেন, চেষ্টা করো। কয়েক রাত খেটেখুটে ছবি এঁকে দাদাভাইকে দেখাই। যখন ঈদসংখ্যা বেরুল, আমি দেখলাম, ইত্তেফাকের শেষ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, কচি-কাঁচার আসরের কিছু ছবি এঁকেছে তরুণ প্রচ্ছদশিল্পী হাশেম খান। তখনকার অনুভূতি কীভাবে বোঝাই, যদি বলি মনের আকাশে আনন্দের বর্ষণ শুরু হলো কিংবা মনসমুদ্রে খুশির ঢেউ খেলে গেল; তবুও তো সেই আনন্দের একটুখানি ঝিলিকও তোমাদের সামনে ফুটিয়ে তুলতে পারব না।
একজন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রকে তরুণ শিল্পী স্বীকৃতি দিয়ে যে উত্সাহের জোয়ার এনে দিয়েছিল ইত্তেফাক, তারই ধারাবাহিকতা আজকের হাশেম খান। আগামী ২ এপ্রিল কচি-কাঁচার আসরের জন্মদিন। শিশু-কিশোরদের জন্য এমন একটি পাতা সৃজনের জন্যে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। বাংলা সাহিত্যে তাঁদের অবদান এক আসরে বা একদিনে বলে শেষ করা যাবে না। আসরের বন্ধুদের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল। আবার দেখা হবে। আড্ডা হবে। আজকের মতো এখানেই বিদায় নিচ্ছি।
শ্রুতিলিখন : আল ফাতাহ মামুন
