গাঁও-গ্যারামে জোছনা ধরা দেয় খুব বলে-কয়ে।
বাদলা দিনের মতন জোছনা রাতও অচেনা ঘোড়সওয়ার নয় কারও কাছে; বরং উঠোনের কচি পেয়ারা গাছটা ফলের ভারে নুয়ে পড়লে যেরকম করে সবার চোখে চেনা সুখ উপচে পড়ে, পূর্ণ জোছনার ধবধবে আলোর ফোঁটা মাটিতে পড়তে না পড়তেই সবার মন ঝুম আনন্দে ভরে যায়; কোনো কারণ নেই, তবু ।
কোনো কারণ নেই, তবু এ জোছনা পথপ্রদর্শকের মতন পথ চিনিয়ে দেয় অন্ধকারের পথিককে। আলো-আঁধারে ঘেরা সেই কুহকী রাস্তা চাঁদের মায়াবী আবেশে লগ্ন হয়ে থাকে; সেই আবেশ নিয়ে পথ চলতে মোটেই কষ্ট হয় না পথচারীর। ঠিকই এগিয়ে যায় গন্তব্যের দিকে।
সেই রাতে আকাশের পূর্ণ চাঁদ নতুন পাতার মখমলি পেলবতার ভেতর লুকিয়ে থেকে শিশুর মতন মিষ্টি-মিষ্টি হাসে। ধুলাওড়া পথে সামান্য ঘাসের প্রাণেও প্রাণহরা হাসির পরাগ ছড়িয়ে যায়। বিশাল প্রান্তরে সবুজ ধানের উঁচিয়ে থাকা ডগাও তখন ঝিলিক দিয়ে ওঠে। ফাগুন-শিশির আর চাঁদনি মায়ায় মাখানো অবারিত সবুজ রাতভর হাওয়ার সাথে তাল দিয়ে হেলে-দুলে নাচে। এ মায়া বেগুনিরঙা কচি আমপাতার শরীরেও জড়িয়ে থাকে; অধোবদনে এমন তিরতির করে কাঁপে যে মনে হয়, বাসররাতের নতুন বউয়ের মতো কিছু বলতে গিয়েও থমকে যাচ্ছে। পথচারী এর ভেতরই পথ চলেন, কষ্ট হয় না; বরং প্রাণময় ভালোবাসার গন্ধ নিতে নিতে ভয়-ডরহীন নির্ভীক এই পথচলায় কোনো জড়তা থাকে না। এমনকি, সুরবালা নামের যে নদীটা এদ্দিন কুঁকড়ে-মুকড়ে পড়েছিল শীতের চাবুক খেয়ে, তাকেও ফাগুনরাতে চপলা কিশোরীর মতন ছলকে উঠতে দেখা যায়। প্রতিটি মাতোয়ারা ঢেউ হেসে-খেলে এলিয়ে পড়ে একে অন্যের শরীরে। নদীপাড়ের বালিরাশি সেই উচ্ছলতায় সুর মেলায়। দমকা হাওয়ায় উড়ে-ঘুরে ওরা সেই আনন্দকেই যেন প্রকাশ করতে চায়।
আসলে, চাঁদটাই ওখানে রানি; সবাইকে নিজের রূপের মোহে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বুঁদ করে রেখেছে। সবাই মশগুল সেই স্নিগ্ধ ভালোবাসার আঁজলাভরা মদিরা পানে। তাই, পূর্ণচাঁদ আকাশে মুখ তুললেই সবার ভেতরটা আপনা-আপনি ছলকে ওঠে, ঠিক সুরবালার মতন।
আর ঢাকা শহরে? এখানকার চাঁদ খেটে খাওয়া শ্রমিকের মতন; কোনো জৌলুস নেই। কেউ তাকিয়েও দেখে না মাথার ওপর কে জাগল আর কে নিভে গেল; এ নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। এত আলোময়তার ভেতর চাঁদ অপাঙেক্তয় এক অতিথির মতো অনাহুত-অনভিপ্রেত অস্তিত্ব। কখন ওঠে আর কখন উধাও হয়—কেউ মনেও রাখে না।
ঢাকার মানুষ সিনেমা-নাটকে যতটুকু চাঁদনি রাত উপভোগ করেন, রাতের বেলায় মশা-মাছিময় এক ফালি ব্যালকনির গায় হেলান দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ইট-কংক্রিটের ফাঁকে একফালি চাঁদ দেখাকে সময়ের অপচয় বলেই মনে করেন। এঁরা আলো-আঁধারির ভেতর দৃঢ় পা ফেলে পথ চলতে জানেন না। ভয় আর অবিশ্বাস এদের নিত্যসঙ্গী; হাজার নিরাপত্তার ভেতরও ওঁরা বার বার করে শিউরে ওঠেন; ঘরের ছিটকিনিটা ঠিকঠাক লাগল কি-না—রাতদুপুরেও ঘুম ভেঙে যায় সেই কারণে। ওদের জীবনে চাঁদ নেই। কবে হারিয়ে গেছে, তাও এখন আর মনে করতে পারে না। যেখানে ভালোবাসা নেই, চাঁদও সম্ভবত সেখানে আর মায়াবী আলো ছড়ায় না। এরা প্রতি পলে সুখ উদ্যাপন করলেও আনন্দময় চাঁদ কবেই উবে গেছে জীবন থেকে। জীবনভূমিতে এখন আর নতুন ঘাস জন্মায় না। সব এখন রসকষহীন খড়। এই খড়ের গাদায় শুয়ে রয়েছে পুরো শহর। বুঝতেই পারে না!
এখানকার নদীগুলোও নিষ্প্রাণ, চালচলনে শয্যাশায়ী অশীতিপর বৃদ্ধের বুড়ামি; কাছে ভিড়লে বেড-সোরের মাংস-পচা বিকট দুর্গন্ধ; ছোটো-ছোটো খালগুলোও আলকাতরা রঙ; নিষ্পাপ চাঁদের মুখ বুকে ফুটিয়ে তোলার তাগদ নেই তাদের। জরাগ্রস্ত শরীরে চাঁদের মায়া বেহায়ার মতো একপলক ঘুরে বেড়িয়েই উধাও। গাছগুলোও নিঃসাড়; ধুলাবালি মেখে ওদের অবয়ব উঁই-খাওয়া মাটির ঢিবির মতন; ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া দেবার কোনো জাদু এসব শহুরে বৃক্ষরাজির নেই, যা দিয়ে ওরা চাঁদকে বুকে টেনে নেবে।
তবু নিয়ম করে ঠিকই চাঁদ ওঠে এ শহরে। সেই ম্রিয়মাণ আলোয় শিপ্রা এখান থেকে ওখানে উড়ে বেড়াচ্ছে। রাত এখন একটা-দেড়টার কম নয়। নিশুতি রাত। ফাগুনের ঠাণ্ডা-গরম হাওয়া ধুলাবালির সঙ্গে মিলেমিশে শহরময় এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি করছে। ওদের গায়ে চাঁদ লাগে না—তোয়াক্কাও করে না এসবের। শিপ্রাকে দলে ভিড়াতে চাইছে এরা। কিন্তু সে কেন ওদের সাথে যাবে? ওর বন্ধুরা সারাদিনের অমানুষিক ধকলের পর সবে এইমাত্র চোখ বুঁজেছে। ওদের কচিমুখগুলোয় কোনো চাঁদ নেই। এর বদলে ইলেকট্রিক পোস্টের হলুদ আলোয় ওদের বড় ক্লান্ত আর অসহায় লাগছে। পাশেই পুলিশের একটা দল। মাঝেমাঝে চোখ ঘুরিয়ে ওদের দিকে তাকাচ্ছে। এই ছেলে-মেয়েগুলোর কারণেই বাড়তি ডিউটি পড়েছে ওদের মতিগতির ওপর নজর রাখার—সেজন্যে কিছুটা বিষণ্ন ও ক্ষুব্ধ হয়তোবা।
শিপ্রার তিন বন্ধু অদিতি, মুহসীনা আর জেসি একটা সুতির চাদরে নিজেদের শরীর ঢেকে চোখ বুঁজে রয়েছে। হাওয়ার টানে শীত-শীত একটা ভাব। লিকলিকে শরীর-স্বাস্থ্য ওদের—একটা চাদরেই তিন জনের হয়ে যাচ্ছে। ওরা সেভাবেই তন্দ্রায় ঢুলছে। পিঠের নিচে পিচের রাস্তায় চাদর বিছানো। পাশেই ছেলেরা; ওরাও ঝিমুচ্ছে। যারা ঝিমোচ্ছে না, তারা হলেন এই অবসন্ন ছেলেমেয়েদের মা-বাবা। থুক ধরে ওঁরা রাস্তার ফুটপাতে বসে আছেন। যেভাবে অবহেলা-অনাদরে হাসপাতালের করিডোরে রোগীর আত্মীয়-স্বজন রাত কাটায়, সেরকম। মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা আর তন্দ্রাচ্ছন্ন খোলা চোখে সদা সতর্কতা। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি-টেম্পোর সামান্য শব্দেও ওঁদের প্রাণ আঁতকে উঠছে, আবার নতুন করে কিছু ঘটল না তো?
শিপ্রাদের বনশ্রীর ভাড়া বাড়িতেও একই অবস্থা। একমাত্র ছোটো ভাইটা একটু পরপরই হেঁচকি দিয়ে কেঁদে উঠছে। মনে হচ্ছে , শিপ্রার হাতটা বারবার করে শুভ আঁকড়ে ধরতে চাইছে; না পেরে বার বার এরকম করে কঁকিয়ে উঠছে। আহারে ভাই আমার, শিপ্রার জন্যে ওর যে এত ভালোবাসা, বুঝতেই পারেনি আগে!
‘দাদা, কী হলো? এত কাঁদিস ক্যান? মা-বাবার দিকে খেয়াল রাখ। দাদা, আমার লক্ষ্মী দাদা।’ হাত বুলিয়ে দেয় ভাইয়ের শরীরে।
বোনের আদর পেয়ে হেঁচকি তোলা কান্নাটা কি একটু কমল শুভর? পরক্ষণেই সে ছুটে যায় রাতজাগা বন্ধুদের কাছে। ওর কারণেই দুপুর রাতে ওরা সবাই এখন রাস্তায়।
মাঝে মাঝে শব্দের ঢেউ তুলে দুই-চারটা ট্রাক, বাস, টেম্পো, প্রাইভেট গাড়ি চলে যাচ্ছে হাইওয়ে দিয়ে। ওদের ইঞ্জিনের দানবীয় শব্দ শিপ্রার বন্ধুদের হতচকিত করে তুলছে। ওরা একঝলক রাস্তার দিকে সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়েই আবার ঢলে পড়ছে ঘুমে। তুলতুলে আদুরে শরীর ওদের। কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না এত ধকল। তবু ওরা কামড় খেয়ে রাস্তায় পড়ে রয়েছে। একটা শুভ সকাল আর চাঁদময় ঝকঝকে রাতের স্বপ্ন ওদের ঘুমচোখে। সব ফেলে ওরা যেন সেই স্বপ্নটার মৌতাতে পাগলপারা।
শিপ্রা অবশ্য সন্ধ্যার দিকে ওদের কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল, ‘তোরা চলে যা। এসব করে কিছু হবে না রে, বন্ধুরা।’
জেসান ওদের ক্লাসের সবচাইতে মেধাবী ছাত্র। সবাই ধরে রেখেছে ওর ফার্স্টক্লাস কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। সে-ই প্রতিবাদ করে উঠল সবার আগে, ‘এর একটা সামাধান চাই। প্রিয় শহরটাকে আমরা এভাবে চলতে দিতে পারি না।’
অদিতি আর মুহসীনা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আমরাও না। এর একটা সমাধান চাই-ই চাই।’
শিপ্রা পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনতে পাচ্ছিল। ওর কেন যেন মনে হলো, এসব দিয়ে কিছু হবে না। শুধু শুধু কষ্ট। ওর মাকেও সে একথাটাই বলতে চেয়েছে। কিন্তু কেউ কিছু শুনতে চাইছে না। সবাই ক্ষিপ্ত। হাউমাউ করে কান্নাকাটির পর এখন মনে হচ্ছে—ওরা সবাই মিলে কিছু একটা করবে। কী করতে পারবে ওরা?
শেষমেশ ওরা এসে রাস্তা দখল করে বসল। অনশনের ভাষায় ওরা ক’জন কচিমুখ প্রতিবাদ জানাতে চাইছে। কাকে যেন বলতে চাইছে, এভাবে হবে না। এভাবে চলবে না।
হাওয়া এসে শিপ্রাকে তাড়া দেয়, ‘এখানে কী করছ, শিপ্রা? চলো, আমরা উড়ে বেড়াই। তুমি তো এখন হাওয়ার মতো, ধুলোর মতো। এ পোড়া শহরে চাঁদও তোমাকে ছুঁয়ে দেখবে না। এসো। ওদের দিকে তাকিয়ে কষ্ট বাড়িয়ে কি লাভ?’
তবু শিপ্রা ওদের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকে। আজ সকালে গাড়িচাপায় ওর মৃত্যু হয়েছে। রাস্তা পার হবার সময় বুঝতে না বুঝতেই একটা বাস উঠে পড়ল ওর শরীরে। রাস্তার ওপরই ও শেষ; নিমিষে শরীরটা হাওয়ার মতন হালকা হতে হতে নাই হয়ে গেল। তবু সূক্ষ্ম বোধের সামান্যতম লেশ যেন কোথায় রয়ে গেল। সব শেষ হয়ে হইল না শেষের মতন, শিপ্রা এখনো হাতড়ে বেড়াচ্ছে কিছু একটা।
এরই ভেতর কারা যেন বাসটি পুড়িয়ে দিয়েছে প্রচণ্ড ক্রোধে; কিশোর বয়সের এক চালক চালাচ্ছিল বাসটি। দুর্ঘটনার পর সে হতভম্ব; মুখে বারবার করে একই কথা, ‘আমার দোষ কী, আমার দোষ কী?’
পাশেই একটা ফলের দোকানে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছিল। সহসা ছুটে এসে হাতে ধরা ছাতার বাটটি গুম গুম করে ওর পিঠে বসিয়ে বলতে লাগল, ‘ক, আর মানুষ খুন করবেনি? ক, আর মানুষ খুন করবেনি?’
বুড়োর সঙ্গে সবাই যোগ দেয়। প্রচণ্ড গণধোলাইর পর পুলিশের হাতে জ্ঞান হারানো চালককে তুলে দেয় অচেনা-অজানা কিছু মানুষ।
এদিকে শিপ্রার নামে একটি ফুটওভার ব্রিজ উদ্বোধন করার অঙ্গীকার করেছে ওদের কলেজের ঠিক পাশেই। হয়তো কারও না কারও তাতে উপকার হবে, এই ভরসায়।
কারা যেন ওর মা-বাবা আর একমাত্র ছোটো ভাই শুভকে চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে তুলে নিয়ে এসে আর্দ্র গলায় প্রতিজ্ঞা করেছে, ‘আপনাদেরও ঠকাবো না। কথা দিচ্ছি। অবশ্যই কিছু টাকা দেবো, যাতে একমাত্র মেয়েটার প্রবল শোক দ্রুত ভুলে যেতে পারেন আপনারা!’
শিপ্রার মায়া এখনো কাটেনি। তাই সে বারবার ওর বাসায় আর অনশনরত বন্ধুদের কাছে ঘুরঘুর করতে থাকে। এদের ফেলে নাম না জানা হাওয়া আর ধুলার সাথে কীভাবে মিশে যাবে সে?
ওর মরদেহ এখনো মেডিক্যাল কলেজের লাশঘরে সাদা কাপড়ে ঢাকা। খুব ইচ্ছে হচ্ছে, ওর চোখদুটো কাউকে দান করবার। কিন্তু কেউ ওর কথা শুনতে পাচ্ছে না। সবাই বাতাসের শিস ভেবে পাত্তাই দিচ্ছে না ওকে।
হাওয়া আর ধূলিকণা বারবার করে তাগাদা দিচ্ছে, ‘চলে এসো ভাই। তুমি নেই। তুমি স্মৃতি এখন। মিশে যাও আমাদের সাথে। ’
তবু কেন যেন শিপ্রাকে আজ রাতের চাঁদটা বড় টানছে। জীবদ্দশায় একবারের জন্যেও নাগরিক এই চাঁদটার দিকে তাকিয়ে দেখেনি সে। সবার মতো সে-ও কেবল হেলাফেলাই করে গেছে। এত আলোর ভেতর এত লম্বা-চওড়া বাড়িরঘরের মাঝে সেঁধিয়ে থাকা এরকম টিমটিম করা চাঁদ কাকেই বা কাছে টানে?
কিন্তু মৃত্যুর পর ভীষণ একা হয়ে যাওয়া শিপ্রার আজ রাতেই সে প্রথমবার চাঁদটার দিকে তাকাল অপাঙ্গে। আহা! খুব ইচ্ছে হচ্ছে বন্ধুদের সাথে নিয়ে এ ভালোবাসার চাঁদটাকে বুকের গহিনে টেনে নিতে।
হাওয়া এসে বলল, ‘সময় নেই। চলো।’
তবু শেষবারের মতন অন্তিমের সাথে মিশে যেতে যেতে শিপ্রা তৃষ্ণার্তের মতো তাকিয়েই থাকে পূর্ণ চাঁদটার দিকে।
