সারাদিনের কাজের ধকল সামলে অফিস থেকে বের হতেই প্রবল ঝড়, সাথে বৃষ্টির কবলে পড়ে আনজুমান আরা রিটা। আজকের দিনটাই শুরু হয়েছে এভাবে। সময়ও কেটেছে এভাবেই। থেমে থেমে ঝড়, থেমে থেমে বৃষ্টি। কখনো আবার দুটোই একসাথে চলেছে সমানতালে সুহূদ বন্ধুর মতো হাতে হাত রেখে। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোল্ডেড ছাতাটা বের করে দ্রুত সে মেলে ধরে মাথার ওপর। বাতাসের তোড়ে হালকা-পাতলা গড়নের ছাতাখানি ঘুড়ি হয়ে মাঝে মাঝে আকাশে উড়াল দিতে চাইছে। বলতে চায় যেন, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। কিন্তু মা তো বেজায় নারাজ ছাড়তে। রিটা বরং শক্ত করে ধরে রাখে ছাতাকে দুষ্টু ছেলেকে মা যেভাবে চোখ রাঙিয়ে নিজের দিকে টানে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে ও রিকশা খোঁজে, কিংবা লোকাল টমটমে একটা খালি সিট, অথবা রিজার্ভ যাবে এমন একটা টমটম বা সিএনজি। হতাশাই সার হয়। দশ-পনের মিনিট অধীর আগ্রহে চেয়ে থেকেও লাভের খাতা শূন্য পড়ে থাকে যেন ধূধূ বালুচর। কোনো গতি হয়নি, বেড়েছে বরং দুর্গতি। অন্যদিন হলে এতক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো না। আর মনে মনে তড়পাতেও হতো না। আজ বৃষ্টির কারণে একেবারে বেহাল দশা।
এমনিতেই পথ-ঘাটের দুর্দশা। দুঃখের শেষ নেই, অবস্থার ব্যবস্থা নেই। বর্ষণের অল্প-স্বল্প গল্পেও ছিরি যে কী বিচ্ছিরি আকার ধারণ করে তা বলাই বাহুল্য। দেখভালকারীদের মনের প্রতিচ্ছবি এবং সুতোর মতন সরু পৌরপথের এমন কোনো গৌর রূপ নেই যা নিয়ে গৌরব করা যায়। পরিকল্পিত কিংবা অপরিকল্পিত কোনো ফুটপাত নেই দুই পাশে। এখানে ওখানে প্রচুর খানাখন্দ যেখানে সুর ও ছন্দরা পেখম মেলে না আপন খেয়ালে। সয়লাব হয়ে আছে ময়লা পানিতে। সাথে কাদা-মাটি। মাঝে মাঝে গাড়ির চাকা যখন দুরন্ত কিশোরের পুকুরের পানিতে উড়ন্ত ঝাঁপের মতো ওখানে গিয়ে পড়ে তখন পাশের পথচারীর নীল-হলুদ-সাদা কাপড়ে কাদা লেগে যায়। তখন শুরু হয় শ্রুতিকটু ও হজমকটুু বুলি বর্ষণ, তারপর হয়তো উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, ক্ষেত্রবিশেষে মারামারি ধরাধরি। কখনো আবার মাননীয় জনপ্রতিনিধিদের মা-বোন তুলে বেধড়ক গালাগালি। এখানে ওখানে রাস্তার বুকের সাথে বুক মিলিয়ে একাত্ম হয়ে আছে পলিথিন, কাগজের টুকরো, সিগ্রেটের প্যাকেট, নারকেলের ছোবড়াসহ আরও কত কী। গোবরের অবশিষ্টাংশও দেখা যাচ্ছে দুই-এক জায়গায়। বাকিটুকু ধুয়ে-মুছে গেছে বৃষ্টির পানিতে। আর ডাস্টবিনের কথা না বলাই ভালো। পৌরসভার পরিচ্ছন্নকর্মীদের সদাশয় চরণসমূহ আবর্জনার ডিপোগুলোকে স্মরণ করছে না আজ কয়েকদিন। ফলে ভাঙাচোরা খোলা ডাস্টবিনে গার্বেজ জমে যেন ছোটখাটো একটা টিলার মতো হয়ে আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়েও আছে চারদিকে। চেপে ধরতে হচ্ছে নাক। না হলে দুর্গন্ধের কড়া প্রতিক্রিয়ায় পেট গুলে বমি আসার উপক্রম হচ্ছে, রতি ও রতিপতির রতিক্রিয়ার পর যেমনটি হয় আর কি। এসব বিড়ম্বনা সইতে সইতে তখন যে প্রশ্নটি বারবার উদয় হয়ে ধীমতি রিটার মনকে বেসামাল করে দেয় তা হলো, আমরা কি সত্যিই কোনো সভ্য দেশের নাগরিক? আমরা বেঁচে আছি বেঁচে থাকি মূলত জন্তু-জানোয়ারের মতো, তা-ই নয় কি? আমাদের দুঃখে তো শিয়াল-কুকুরও কাঁদে না দেখি। আমাদের অবস্থা হলো প্রবচনের সেই অভাগীর মতো যার আছে দুই পুত, একটা কানা আরেকটা ভূত। এরা কাজে আসে না কোনো। উল্টো কারণ হয় বিরামহীন দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশার।
এসব থেকে বাঁচতে রিটা হাঁটা ধরে বিপরীত দিকে। এমনিতে পথ-ঘাটে চলাফেরা করার সময় সতর্ক থাকে সে, পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ রাখে। আজ যেন একটু আনমনা। ফলে পথ চলতে চলতে রাস্তায় পড়ে বৃষ্টির পানিতে ভিজে জবজবে হয়ে থাকা একটা কলার খোসার ওপর পা পড়তে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস, শেষ মুহূর্তে চোখে পড়েছিল। নইলে যে কী হতো! আছাড় খেয়ে পড়া, চিত্পটাং হওয়া, কোথাও না কোথাও ব্যথা পাওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় কথা, পথচারীরদের হাসির পাত্র হওয়া। কী বাঁচাটাই না বাঁচা গেল, ভাবে রিটা। পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরবাইক পেরিয়ে, কোথাও থোক থোক আবার কোথাও গাদা গাদা কাদামাটি এড়িয়ে সে কমপক্ষে দুশো গজ দূরে গিয়ে দাঁড়ায়—যেটাকে নিরাপদ দূরত্ব বলে মনে হচ্ছে উত্কট গন্ধ থেকে বাঁচার। এক্ষণে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এতক্ষণ মনে হচ্ছিল দুনিয়ার তাবত্ দুর্গন্ধ বুঝি এখানে এসে জড়ো হয়ে নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে, দুষ্টু ছেলেদের মতো তাকে টিজ করে মজা লুটছে। এ যে ভারি অনাসৃষ্টি অনাচার।
একসময় বাতাসের বেগ কমে আসে অনেকটাই। কিন্তু বৃষ্টির গতি থাকে পূর্ববত্। পায়ের দিকে বেশ কিছুটা ভিজে গেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে রাস্তার পাশ থেকে সরে রিটা গিয়ে দাঁড়ায় একটা মার্কেটের সামনে যেখানে অনেকটা গাদাগাদি করে আশ্রয় নিয়েছে অনেক মানুষ এবং বৃষ্টির ঝাপটা এসে কাউকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না। অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে সকলের চোখে-মুখে—যার যার গন্তব্যে যেতে না পেরে এক জায়গায় আটকে থাকার সুবাদে। আর সবার মতো ছাতা বন্ধ করে সে অপেক্ষা করে বর্ষণ থামার। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে ভাবে নানান ভাবনার এপাশ ওপাশ। হাত উল্টে সময় দেখে। সেলফোনটা তার সুরে বেজে ওঠে হাতব্যাগের গোপন আস্তানায়। বাজুক। ধরবে না সে। বিরক্তিতে ভরপুর হয়ে আছে তার মন। প্রচুর লোকের সমাগমে দুই-একজন লোক আদিমতাকে প্রশ্রয় দিয়ে সুযোগ বুঝে তার গায়ে গা ঠেকিয়ে দেয় এবং সুখের ওম নিতে চায় একটুখানি। সরিয়ে নেয় পরক্ষণেই। ভাবখানা এমন, অনিচ্ছায় হয়ে গেছে, সরি। কিন্তু যদি সুযোগ দেয়া হয়, মনে হয়, প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত লোকের সম্মুখে মদন রসের হাঁড়িতে সর্বাঙ্গ ভাসিয়ে দিতে কসুর করবে না হায়া-শরমের মায়া ত্যাগ করে, ভাদ্দর মাসে সারমেয় প্রাণীর দল যেমনটি মেতে ওঠে অশিষ্ট আচারে যখন-তখন যথা-তথা।
রিটা বোঝে সবই। কিন্তু কীই বা করতে পারে সে এত পুরুষের মাঝে। এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাইলে বরং ফল হবে উল্টো। বারোটা বাজবে মানের, বলাত্কার হবে সম্মানের। ধারণার চাইতেও অস্বস্তিকর কিছু ঘটবে হয়তো—যার ফলে তার কোমল মন বল হারিয়ে নেতিয়ে পড়তে পারে মরা পাতার মতো। এবং তারপর বিমারিস্তানের শরণ নেয়া ছাড়া গতি থাকবে না কোনো। অতএব চুপ থাকাই শ্রেয়। কিন্তু মনে মনে আঁতকে ওঠে সে। খাট্টা হয়ে যায় মন। লজ্জায় অপমানে ঘৃণায় কুঞ্চিত হয় হূদয়-মন-দেহ। নাসিকার কুঞ্চন তো আছেই। এমন অনুভূতি হয় যেন কেউ শিরিষ কাগজ দিয়ে তার গা ঘষে দিচ্ছে—যেমন করে মসৃণ করা হয় কাষ্ঠদ্রব্যাদি। কিংবা পোকায় খাওয়া ফল খেয়ে পরে বুঝতে পারার মতন যখন করার আর কিছু থাকে না বমনক্রিয়া ছাড়া। খুকখুক করে কাশতে থাকে রিটা। কারণ মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে তার নাকে-মুখে এসে ঝাপটা মারছে সিগারেটের কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া—যার উত্সমূল এক শিক্ষিত ভদ্রলোক—যিনি এক হাতে ধরে আছেন তাঁরই সাত বছর বয়সী বাচ্চাকে এবং অন্য হাতে দিচ্ছেন সুখটান বড় উদাসী ভঙ্গিতে। অবশ্য এ কাজে তিনি নিঃসঙ্গ নন। আরও দুজন খেটে খাওয়া লোকও বিভোর হয়ে ফুঁক দিচ্ছে অগ্নিদণ্ডে।
অফিসে আজ সারাদিন মন খারাপ ছিল রিটার। এখন এই অবস্থার মুখোমুখি হয়ে একেবারে পেরেশান ও।
রিটার নতুন বস একটা কুমড়াকাটা বটঠাকুর। সহকর্মী কাউকে সহায়তা করবেন দূরের কথা, নিজের কাজটুকুই করেন না ঠিকমতো। নিজেরটুকু ঠেলে দেন আরেকজনের দিকে। বিশেষ করে রিটাকে তাঁর বিশেষ পছন্দ। প্রথম দিন থেকেই তাঁর চোখ পড়েছে রিটার ওপর, যার গায়ের রঙটাই একটু কালো বটে, বাকি সবকিছুই তাঁর মতে ঠিক আছে। ওকে দেখলেই তাঁকে পেয়ে বসে উড়ুউড়ু ভাব, মন-বীণার তন্ত্রীতে বেজে ওঠে পাগল-করা সুর, ভালোলাগার সুড়সুড়ি জেগে ওঠে দেহের বাঁকে বাঁকে। তাই ওকে দিয়ে কাজ করিয়েই তাঁর সুখ হয় বেশি, পঞ্চইন্দ্রিয়ের তালের মাত্রাটা বেড়ে যায় বহুগুণ, মধুর সংগীতের অনুরণন বেজে ওঠে দেহের প্রতিটি কোষে, সব জায়গায় সবখানে। কম্পিউটারে তাঁর কাজটা কীভাবে করতে হবে রিটা জানুক বা না-ই জানুক, দিকনির্দেশনা দেয়ার অজুহাতে তিনি ওর ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ান, ঝুঁকে পড়েন সামনের দিকে এবং স্ক্রিনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বুঝিয়ে দেন। তখন রিটার এতটাই কাছে তিনি চলে যান যে, ওর এক কুড়ি বর্ষীয় দেহের নিভাঁজ তারুণ্যের উত্তাপটা ঠিক টের পেয়ে যান। তিনি মোহিত হন। পুলকিত হন। শিহরিত হন। তখন যে মনোহারী সুবাস এসে তাঁকে আউলা বাতাসে উদ্ভ্রান্ত করে দেয় তা তন্নতন্ন করেও খুঁজে পান না তাঁর অর্ধাঙ্গিনীর মাঝে। এই খুশবুর প্রভাবে বিচলন বোধ করেন তিনি প্রবলভাবে, তাড়িত হন প্রচণ্ড এবং উপভোগ করেন প্রাণভরে। রিটা যতই সরে বসে তিনি ততই এগিয়ে যান একটু একটু করে। অবশ্য এখন পর্যন্ত তিনি সংযম প্রদর্শন করেছেন, গায়ের সাথে গা ঠেকিয়ে দেননি, কোনো কুপ্রস্তাবও দিয়ে বসেননি। কিন্তু রিটার আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তেই তিনি তা করে বসতে পারেন। ওর সিক্সথ সেন্স বলে, তিনি কামতাড়িত বোম্বাটে পুরুষ। অনেক রূপনদীতে সাঁতার কাটার আসক্তি তাঁর বংশগত ধারা ও ঐতিহ্য। তাঁকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই, যদিও ঘরে তাঁর স্ত্রী আছে, আছে স্কুলপড়ুয়া দু-দুটো সন্তান। তাঁর এক ভাই প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী কেন্দ্রীয় রাজনীতিক—যিনি রগচটা বলে সুবিদিত রাজনৈতিক মহলে এবং যিনি কথায় কথায় বিরোধী পক্ষকে ইয়াম্মি স্বাদের আমসত্ত্ব বানিয়ে রসনাবিলাস করেন প্রতিনিয়ত। আরেক ভাই প্রশাসনের বেশ উচ্চপদে আসীন। সেই বলে তিনি বেজায় বলীয়ান এবং ধরাকে করেন সরাজ্ঞান। এই ধরনের রেকর্ডের তিনি গর্বিত মালিক। ফলে কলঙ্কমুক্ত হয়ে ক্যারিয়ারের এই পর্যায় পর্যন্ত তিনি আসেননি। রিটা তাই সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে—না জানি কখন তিনি পঙ্কিলতার নিগড়ে বেঁধে ফেলেন ওকে। ও থির থাকতে পারছে না কোনোভাবেই, খুব ব্যর্থ ভয়কে জয় করতে।
আজ অফিসের ডাইনিং রুমে বসে লাঞ্চটা সেরে নিচ্ছিল রিটা ও তার এক সহকর্মী। হালকা কথাবার্তাও হচ্ছিল তাদের মধ্যে। এমন সময় বস হাজির সেখানে। দুপুরের খাবার খাবেন তিনি। বসকে দেখে কথা বন্ধ হয়ে যায় তাদের। নীরবে খেতে থাকে। খাওয়া শেষ হলে বিদায় নেয় সহকর্মীটি। অস্বস্তি নিয়ে রিটা খাওয়ার কাজ চালিয়ে যায়। প্রায় শেষের পথে। তখনই ঘটে ঘটনা। বসের মোবাইল গান গেয়ে ওঠে সুরে সুরে। এটা তখন তাঁর ডান পকেটে। আর তিনি বসেছিলেন রিটার বাম পাশে। বাম হাতকে পানি পানের কাজে ব্যস্ত রাখার ভান করলেন তিনি এবং কিছুটা আদেশ কিছুটা অনুরোধের সুরে রিটাকে তার বাম হাত দিয়ে তাঁর পকেট থেকে সেলফোনটা বের করে দিতে বললেন। ভয়ানক চমকে ওঠে রিটা। হাত দিতে হবে বসের ওই চাপা অন্ধকার গুহায়! ওখানে যে ঘুমিয়ে আছে ভয়াল কালকেউটে! নিকট-আঁচেই তুলবে ফণা ভয়ঙ্কর। আর এই ফণা তো যে সে ফণা নয়। একেবারে উলটপালট ঘটে যাবে ত্রিভুবনে। রিটার কুড়ি বসন্তের জীবনে এমন দুঃসময় হানা দেয়নি আর কখনো। একটা অপরিচিত আতঙ্কে কাত হয়ে পড়ে ও এবং কী করবে কী করবে ভাবতে থাকে। ওর ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, ঠিক তখনই আরেকজন কলিগ প্রবেশ করে সেখানে। জুতসই সুযোগ পেয়ে রিটা সদ্ব্যবহার করে পুরোপুরি। ‘সরি স্যার’ বলে হাত অধৌত রেখেই ত্রস্ত পায়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় এবং আপাতত পালিয়ে বাঁচে কোনো রকমে।
নতুন বসের এসব দিগদারিতে রিটার মনের সুখ পালিয়ে বেড়াচ্ছে আজ কয়েকদিন ধরে। বন পুড়লে দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু মন পুড়লে দেখা যায় না। সেই অদৃশ্য ভাবনার আগুনে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে রিটা প্রতিনিয়ত। বস যদি সস খেতে চান সত্যি সত্যি এবং কামনার যাতনায় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে বিহার করার প্রস্তাব করে বসেন কখনো, সে কী করবে না করবে ভেবে পায় না। বোলতার চাকে সে খোঁচা দিতে চায় না। আবার চাকরিটাও তার অবশ্যই দরকার। কিন্তু সতীপনার সাদা কাঁথায় প্যাঁক-কাদা লাগাতেও ভয়। পচা কচুরিপানায় ভরা নর্দমায় খুব করে ডুব দিতে তার সংস্কারে বাঁধে। পিতা-মাতা কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষা, ধর্মীয় দীক্ষা ও প্রবর্তনা এবং আজীবন লালিত মূল্যবোধকে সে মনে করে পবিত্র সম্পদ। এতে কলঙ্ক লেপনে তার ভীষণ অনীহা। কিন্তু প্রভাবশালী বসের নোংরা স্বভাবের আহ্বানকে ভেটো দিয়ে আপন মেজাজ-মর্জির ওপর বটবৃক্ষের ন্যায় সে অটল ও ঋজু দাঁড়িয়ে থাকবে কী করে? সেই জোর কি ওর আছে? তাঁর শিকড়-বাকড় অনেকদূর ও গভীর অবধি বিস্তৃত ও প্রোথিত। বনেদি পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিল জমিদার প্রজাতির মনুষ্য। তাদের মর্জি-মেজাজ, মনন ও বোধন, রমণী-সঙ্গ বিষয়ে ভাব ও ভাবপ্রবণতা, লোলুপতা এখনো ভ্রাতৃত্রয়ের লহুতে প্রবলভাবে প্রবহমান। কোম্পানির হেড অফিসেও তিনি দাপুটে ভাষায় কথা বলেন ও আচরণ করেন এবং আদায় করে নেন সকলের ভীতিমিশ্রিত সমীহ। আর রিটার নিজের কী অবস্থা? ও টোটালি কড়িশূন্য এই মুহূর্তে। সঞ্চিত নেই একটা কপর্দকও। বলার মতো নেই পারিবারিক ও বংশগত কোনো ঐতিহ্য। রাজনীতি প্রশাসন কিংবা ক্ষমতার বলয়ে এমন কোনো আপনজন নেই যে ওর মাথার ওপর প্রয়োজন-মুহূর্তে মেলে ধরতে পারে নিরাপত্তার ছাতা। ওর তুলনায় বস এমনই এক গালিভার যিনি তাঁর কোটের চার পকেটে ধারণ করতে পারেন চার একশো চারশো লিলিপুট অন্তত। তাহলে নিয়তি কী ওর? আধুনিকতার সরণি বেয়ে প্রগতির টাট্টু ঘোড়ায় সওয়ার হওয়া, কলঙ্কিত শুভ্রতায় পথ হারিয়ে পথ খোঁজা, নাকি দৃঢ় মনোবলের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে স্বরূপে ও বহাল থাকতে পারবে স্বপদে, যেহেতু কথায় বলে, ইচ্ছেয় হয় উপায়।
বেশ কিছুক্ষণ পর যখন বৃষ্টি কমে আসে অনেকটাই, লোকজন হাঁটা শুরু করে যে যার গন্তব্যের দিকে। রিটাও নেমে আসে সিঁড়ি বেয়ে মার্কেটের নিচ থেকে। আঁধার ঘনিয়ে আসছে, তবে এখনো ফুটে আছে আলো। ও ইচ্ছে করলে একটু কষ্ট করে কুড়ি মিনিটের মাথায় হেঁটেই বাসায় পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু দেহ চায় না সেটা, মনেরও সায় নেই। যেন বা দায় নেই কারুরই। সরু রাজপথে এত এত টমটম-সিএনজি-রিকশার দাপট, পথঘাট হয়ে আছে এতটাই নোংরা ও বিদঘুটে যে, রাস্তায় উঠে আসা নর্দমার ময়লা পানি প্যাঁককাদা আবর্জনা দাবড়ে যদিওবা বাসায় পৌঁছা যাবে—গোটা দেহ থেকেই দুর্গন্ধ বেরুবে মনে হচ্ছে ফরফর করে। রি রি করতে থাকবে শরীর। তীক্ষ চোখা অনুভূতিতে অধীর হয়ে স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে না ও। তার চেয়ে বরং আরেকটু অপেক্ষা করে টমটম বা রিকশা খালি পাওয়া যায় কি-না দেখা যাক।
অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন পায়ে টনটনে ব্যথা শুরু হলো, বৃষ্টির ফোঁটার ন্যায় ঝপঝপ করে হতাশা নেমে এল মনে, অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল—যেমন করে প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে ভেঙে পড়ে নদীর পাড় ও আশপাশের জনপদ, ঠিক তখনই রিটা সন্ধান পেল ওটার, সোনার হরিণের। একটা টমটম এসে থামল ওর কাছে, ভাড়া মিটিয়ে নেমে গেল একজন যাত্রী এবং ত্বরা করে খালি জায়গাটি দখল করে নিল ও। গাদাগাদি অবস্থা। মুখোমুখি দুটো সিট। প্রত্যেকটাতে বসেছে তিন জন করে। সবাই পুরুষ। একমাত্র ব্যতিক্রম রিটা। বড্ড অস্বস্তিকর অবস্থা। বসার পর থেকেই পাশের জনের দেহের সাথে অবিরাম লেগে আছে ওর গা। ও যে একটু সংকুচিত হয়ে বসে গা বাঁচাবে, কিংবা দুজনের মাঝখানে ভ্যানিটি ব্যাগটা রাখবে তার জো নেই। তবে পুরুষ সহযাত্রীটি একটু চেষ্টা করলে এই সমস্যার খানিক সমাধান করতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে তার আগ্রহ বা উত্সাহ নেই এক রত্তিও। বরং অত্যুত্সাহী নজর সংযোগ আরও দৃঢ় করার দিকে। যেন অকস্মাত্ গুপ্তধন প্রাপ্তি ঘটেছে তার। বুকে আগলে ধরবে না কেন শক্ত করে?
গাড়ি চলছে খুব ধীরে-সুস্থে। একটু এগোয়, থামে। আবার এগোয়, আবার থামে। স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না জ্যামের কারণে। আর এই জ্যাম যেন হর্ন কার্নিভালের দারুণ আয়োজন। এ বিষয়ে শিক্ষিত মূর্খ নেতা আমজনতা সকলের অবিশ্বাস্য সহাবস্থান। আর আছে সামনে পিছনে মাইকের বিষম জ্বালাতন। আর কিছুদিন পরই পৌর নির্বাচন। যারা প্রার্থী তাঁদের পক্ষে বিপুল ব্যয়ে ও বর্ণিল উদ্যমে দিনরাত চলছে প্রচারণা। বলা হচ্ছে, তাঁরা সবাই নিঃস্বার্থ ও জনদরদী নেতা, সত্ ও যোগ্য প্রার্থী, ফুলের মতো পবিত্র চরিত্রবান ও শিক্ষানুরাগী, এলাকার উন্নয়নের ব্যাপারে একশভাগ আপোসহীন, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি আছেন সাবেক সফল মেয়র ও ব্যর্থ হননি এমন কাউন্সিলর। মেয়র প্রার্থীদের রাশ-না-টানা ঘোষণা, নির্বাচিত হলে তাঁরা পৌরসভাকে মিনি লন্ডন ওয়াশিংটন বানিয়ে ছাড়বেন। ভাঁড়ামো ও ফাজলামোর একটা সীমা থাকা উচিত, রিটা ভাবে। ও ব্যাপক কৌতুক বোধ করে তাঁদের রাশপাতলা কথা শুনে হাসি পায়, কিন্তু হাসতে পারে না। ও আছে গা বাঁচাবার ব্যর্থ তালে। ধুঁকে ধুঁকে কিছুদূর যাওয়ার পর টমটম থামে। গরল সুধা পানে ব্যস্ত যাত্রীটিকে ড্রাইভার স্মরণ করিয়ে দেয়, তার গন্তব্য এসে গেছে। কিন্তু যাত্রী তো মহাক্ষ্যাপা। তার আরও অনেকদূর যাওয়ার আছে, ক্ষুব্ধ ও অধীর কণ্ঠে সে জানায়।
রিটা তিতিবিরক্ত। ভুঁড়িওয়ালা ও দশাসই চেহারার মধ্যবয়সী পুরুষ সহযাত্রীটির বদ মতলব বুঝতে পেরে তার উত্কণ্ঠার দিগন্ত প্রসারিত হয়, কান্না পায়। লোকটির কায়মনে প্রার্থনা যেন, প্রভূ, এই পথ যেন শেষ না হয় কভু।
অন্য সহযাত্রীরাও কেউ কিছু বলছে না। কেউ কেউ বরং ক্ষণে ক্ষণে আড়চোখে ওর দিকে চেয়ে সুর তুলে গানের মনে মনে। আবার কেউ বা কাঁঠালের আঠার মতো লেগে থাকা মটকু মদনদেবের সুপ্রসন্ন (?) ভাগ্যকে ঈর্ষা করছে, আর হা-পিত্যেশ করে করে আপন বক্ষের তলদেশে ভূমিধ্বস ঘটাচ্ছে।
খুব নিঃসঙ্গ মনে হয় রিটার নিজেকে, একা, অসহায়। ‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা/জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা/দৃশ্যের বিপরীতে সে পারে না একাত্ম হতে/এই পৃথিবীর সাথে কোনদিন।’ কবির কথায় যেন ফুটে ওঠে রবির আলো, মানছে রিটা।
সবার অজান্তে রিটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে। একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে ওর ভিতর। আশপাশ চারপাশ দেখে-শুনে ও অনুভব করে, মানবতার এখন বড় দুঃসময়। মানবাত্মা দলিত ও বিচলিত। সুর-তাল-লয় এখন প্রলয় নামক অসুরের—যার গীত অধিক মাত্রায় সর্বত্র শ্রুত। এই অসুর বহুরঙা, এই অসুর বহুরূপী। কখনো আসে হেঁড়ে গলায় তেড়ে, কখনো বা নীরবে নিভৃতে। একবার মন্দরূপে, আবার আসে ভালো মানুষের বেশে। তবে রঙ ও রূপ যা-ই হউক কাজ কিন্তু একটাই, খুন্তি হাতে চিত্তস্থৈর্য হনন।
