সকাল থেকেই ঢাংমারী গ্রামে সাজ সাজ রব। ট্রাক্টর দিয়ে বানানো গাড়িতে করে ছেলেমেয়েরা এদিক-ওদিক যাচ্ছে। যাওয়া মানে গ্রামের এই মাথা থেকে ওই মাথা। গ্রামের পাশ ঘেঁষে আছে বেড়িবাঁধ এই বাঁধই তাদের সম্বল। সড়কের দুই পাশে কিছুক্ষণ পরপর অসংখ্য অস্থায়ী মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই গ্রামের মানুষ পূজার তৈয়ারি শুরু করেছে। প্রতি বাড়িতে চলছে পায়েস রান্নার কাজ। এছাড়া প্রতিটা মণ্ডপেই চাল, চিনি, দুধ নিয়ে হাজির হচ্ছে ভক্তকুল।
প্রতিমা বানায় অনেকে। যেমন খুলনা চারুকলার সমীর দেওয়ান চৌধুরী বাড়িতে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন এখনো। চলছে বনবিবির ঠোঁটে লাল রঙ মাখার কাজ। একটু পরেই আনা হবে মণ্ডপে। মণ্ডপগুলো সাজানো হচ্ছে গোলপাতা আর কেওরা পাতা দিয়ে। প্রতিটা মণ্ডপের পাশে আলীরঘর নামে একটা ছোট বেদি তৈরি করা হচ্ছে। গিয়ে বসলাম গ্রামের শেষ মাথার মণ্ডপে। একসময় একে একে প্রতিমা এনে স্থাপন করা হলো মণ্ডপে।
বেলা শুরু হলেই স্থাপিত মণ্ডপে শুরু হয় পুঁথিপাঠ। এরপর পূজার সাথে সাথে দেয়া হয় অঞ্জলি। মন্ত্রপাঠ, প্রসাদ বিতরণ ও মণ্ডপে মণ্ডপে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মনোবাসনা পূর্ণ করতে প্রার্থনা করেন। এছাড়াও দিনভর এ বনবিবি পূজা উপলক্ষে মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, মিষ্টি, ধূপ, ধুনো, খেলনা, চা বিস্কুট, শাখার দোকানসহ নানা ধরনের দোকান সাজিয়ে গ্রামীণ মেলা বসে সর্বত্র। হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখরিত গ্রামের মূলসড়ক বা বেড়িবাঁধ। পূজা উপলক্ষে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ও নদীতে নৌভ্রমণে বের হন।
সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোর মানুষ প্রতি বছর মা বনবিবি’র পূজা করেন। তাঁরা মনে করেন, এ পূজা করলে সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর বাঘ, কুমির, সাপসহ বিভিন্ন বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেন মা বনবিবি। বনের পাশের মানুষদের রক্ষা করেন বনবিবি।
শ্লোক পড়া শুরু হলো। পড়ছেন পুরোহিত শশী ভূষণ মণ্ডল।
শুরু করলেন মণ্ডল—
বিসমিল্লাহ বলিয়া মুখে ধরিনু কথন
পয়দা করিনু যিনি তামাম আলম,
বড় মেহেরবান তিনি বান্দারো উপরে
তার ছানি কেবা আছে দুনিয়ার পরে
জীবজন্তু পয়দা কৈল রকম রকম
গবার প্রধান সেই করিল আদম,
কেহ দিবা নিশি পরে আতলস পরিয়া
ছায়ের করিয়া ফেরে চৌদলে চড়িয়া
... ... ...
এক দেল হইয়া নামু লইয়া আল্লার
শোন কেচ্ছা বন বিবি জহুরা নামার,
বনবিবি সা জংগলি ভাই ও বহিন
যেরূপে হইল পয়দা শোনহ মোমিন
এবরাহিম নামে এক আছিল ফকির
এক্কার বাসিন্দা করে আল্লার জিকির,
জওয়ানি উম্মরে করে ছিল সাদি কাম
কবিলা তাহার ছিল ফুল বিবি নাম
গৃহবাস করে সুখে খোসাল অন্তরে,
বেটা বেটি পয়দা না হইল তার ঘরে
... ... ...
বলে মেহাম্মদ মুনশী জনাবে সবার
ভুরসুট কানপুরে বসতি আমার,
ছেজদা শোকর মেরা দরগায়ে খোদার
খায়ের করিল আল্লাহ এ বাতে আমার
আমি কিছু নাহি জানি সায়েরি করিতে
এলেম না আছে মোর আলেফ বে পড়িতে,
ঐদিও লিখিনু কেচ্ছা খায়েস দোস্তের
দিন দুনিয়াতে আল্লা করেন খায়ের
আল্লা পাক আমায় যদি তরান হাসরে,
আমি অতি গোনাগার খোদার দরবারে
হামেসা দরগার এয়ছা করি মোনাজাত
হাসরেতে পাই যেন নবীর সাক্ষাত্,
দখল না আছে মেরা এই এলমেতে
এারিয়া লইবে আপনার বুজুর্গিতে
-সমাপ্ত-
এই হলো
বনবিবি জহুরানামা বা ধেনামৌলে ও দুঃখের পালা। পুরো পালা পড়তে শশী ভূষণের চার ঘণ্টা লাগে। এই সময়ে তাঁর আশপাশে চলে নানা কর্মযজ্ঞ। এক পাশে গাছের তিনটা লাঠি বিশেষভাবে পুঁতে তৈরি হয় চুলা। সেই চুলায় মাটির হাঁড়িতে রান্না হয় পায়েস। বড়-ছোট সকলে গোল হয়ে বসে পাঁচালি শুনছে। মণ্ডপে আছে বনবিবি, শাহ জঙ্গলি, ধনা, মনা, গাজী কালু, দুঃখে ও দক্ষিণ রায়ের প্রতিমা। এই গ্রামের মানুষ তো বটেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছে পূজায় অংশগ্রহণ করতে। প্রতি বাড়ির সামনে গোলপাতা দিয়ে বানানো হয়েছে গেট। ভক্তকুল সঙ্গে করে নিয়ে আসা প্রসাদ ও টাকাপয়সা রাখছেন বনবিবি আর গাজীর প্রতিমার সামনে।
একসময় পায়েস রান্না শেষ হয়। সেই পায়েস বনবিবিকে নৈবেদ্য দিয়ে তবেই অন্যরা খেতে পারেন। লক্ষণীয় একটা বিষয়, সারা গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় নৌকায় নদী পার হয়ে বনে যাওয়ার প্রবণতা। স্থানীয় প্রশাসন নিষেধ করেছে বনে যাওয়ার। তবুও মানুষ যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন, বনে না গেলে বনবিবি তুষ্ট হবেন না। প্রশাসনের নিষেধের কারণ হচ্ছে ওই পাড়ে গিয়ে রান্না-বান্না ও চিপস- চানাচুর-বিস্কুট খেয়ে প্যাকেট ওখানেই রেখে আসে, পরিবেশ দূষিত হয়। এছাড়া কয়েক বছর আগে বনে গিয়ে মেলামেশার ভিডিও করে সেই ভিডিও আবার ইন্টানেটে আপলোড করা হয়েছিল।
সুন্দরবনের সঙ্গে ঢাংমারী গ্রামকে ঢাংমারী নদী বিভাজন করেছে। এই নদী ঢাংমারীবাসীর জন্য ঢালস্বরূপ। কারণ, বাঘমামা এই নদী পার হয়ে লোকালয়ে আসতে সাহস পায় না। আর যদি আসেও, বানর আর অন্যান্য প্রাণীকুল মানুষ জাতিকে আগেভাগে সাবধান করে দেয়।
এর মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্র পড়া হয়।
এই মন্ত্রের নাম, নিদান—
দয়া করো দরবেশ
রক্ষা করো খোদা
দোহাই আলি, দোহাই আলি
দোহাই আলি (তিনবার পড়তে হবে)
প্রতি বছরের পহেলা মাঘ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনসংলগ্ন লোকালয়ে বনবিবি’র পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ‘বনবিবি’ দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো সুন্দরবনজীবীর ভক্তি, শ্রদ্ধা আর পূজার দেবী। খুলনার দাকোপ উপজেলার বাণীশান্তা ইউনিয়নের ঢাংমারী গ্রামে ছিল আমাদের এবারের মোকাম।
বিষ ধ্বংসের মন্ত্র—
অদ্য কশ মোহম্মদের বাণী
মোহম্মদের কলেমা দিয়ে
বিষ করলাম পানি
পদ্মার সাথে বিষ ভাটি দিয়ে যা।
(সাতবার পড়তে হবে।)
কথিত আছে, বহু বছর আগে সুন্দরবনের পাশের এক গ্রামের এক দরিদ্র মায়ের সাথে তার শিশু থাকত। শিশু ছেলেটির নাম ছিল দুঃখে। একদিন দুঃখে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে যায় ধনে আর মনে নামের দুই মৌয়ালের সঙ্গে। যাবার আগে দুঃখের মা তাকে বলে দেন, ‘বনে আমার মতো তোর আরেক মা আছেন। কোনো বিপদে পড়লে তাকে ডাকবি।’
তখন সুন্দরবনে গাজী নামে এক আউলিয়া থাকতেন। আর দক্ষিণ রায় ছিল বাঘবেশী অপশক্তি। গাজীর সঙ্গে সখ্য ছিল দক্ষিণ রায়ের। এক রাতে দক্ষিণ রায় মৌয়ালী ধনে-মনের স্বপ্নে আসে। দুই ভাইকে প্রচুর মধু আর সম্পদ দেওয়ার লোভ দেখায় দক্ষিণ রায়। এর পরিবর্তে শিশু দুঃখেকে উত্সর্গ করার প্রস্তাব দেয়। অন্যথায় ধনে-মনের নৌকা ডুবে যাওয়া ও মধু না পাওয়ার ভয় দেখানো হয়। ধনে আর মনে ভয়ে দুঃখেকে পানি আনতে পাঠিয়ে নৌকা ছেড়ে লোকালয়ে ফিরে যায়।
দুঃখে ফিরে এসে মৌয়ালদের না পেয়ে, তার মায়ের কথামতো বনের মাকে স্মরণ করে। বনবিবি এসে দুঃখেকে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের কবল থেকে উদ্ধার করেন এবং তাকে কুমিরের পিঠে ভাসিয়ে মায়ের কাছে ফেরত পাঠান। আর বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলি বাঘরূপী দক্ষিণ রায় ও গাজী আউলিয়াকে ধরে বনবিবির কাছে নিয়ে যান। গাজী-দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির পক্ষ নেন। এমন নানা কাহিনিতে বনবিবি সুন্দরবনজীবী মানুষের কাছে দেবীর মর্যাদা পেয়ে পূজিত হতে শুরু করেন। ১৪ শতকের প্রথমার্ধের দিকে দক্ষিণে সুন্দরবন ও পশ্চিমে হুগলি পর্যন্ত বিস্তৃত রাজ্যের প্রতাপশালী রাজা মুকুট রায়। সুন্দরবনের বাঘের দেবতা হিসেবে পূজিত ব্রাহ্মণ দক্ষিণ রায় ছিলেন এই মুকুট রায়ের সেনাপতি। মুকুট রায়ের মেয়ে বনবিবি। হিন্দু-মুসলমান অধ্যুষিত সুন্দরবনের সবাই তাঁকে স্মরণ করেন। তবে মুসলমানরা মনে করেন এই বনবিবি হলো গাজীর স্ত্রী। যাঁর নাম চম্পাবতী। কাজেই তাঁরা চম্পামাই বলে সম্বোধন করে থাকেন।
সুন্দরবনে প্রবেশের আগে হাতজোড় করে বনবিবির পাশাপাশি গাজীর নামে দোহাই দিয়ে বনে প্রবেশ করেন সবাই। মুকুট রায়কে পরাজিত করে তাঁর রাজ্য ও রাজধানী ছারখার করে তাঁর কন্যা চম্পাবতীকে বিয়ে করেন গাজী পীর। পিতা জাফর খান গাজী বা শাহ সিকান্দার ছিলেন ত্রিবেনী ও সপ্তগ্রাম অঞ্চলের শাসনকর্তা। গাজী পীর-এর বংশপরিচয় পুঁথিতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
গোড়া বাজা গয়েপদি, তার বেটা সমসদি
পুত্র তার সাঁই সেকান্দার,
তার বেটা বড়খান গাজী
খোদাবন্দ, মুলুকের কাজী
কুলযুগে তার অবসর বাদশাই ছিড়িল বঙ্গে
কেবল ভাই কালুর সঙ্গে,
নিজ নামে হইলো ফকির।
বাল্যকালেই ফকির-দরবেশের সাহচর্যে আধ্যাত্মিক সাধনায় উন্নতি লাভ করেন গাজী। পিতার ?কাছে শাসনক্ষমতা নিতেও অস্বীকার করেন তিনি। ইসলাম প্রচার শুরু করেন দক্ষিণ বঙ্গের যশোর-খুলনা অঞ্চলে। ধর্ম প্রচারে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে রাজা মুকুট রায়ের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় তাঁর। মুকুট রায়ের স্ত্রী লীলাবতীর ৭ পুত্র। ১ কন্যা চম্পাবতী বা শুভদ্রা। তার রূপের খ্যাতি ছিল জগেজাড়া। এ নিয়ে পিতার গর্ব ছিল সীমাহীন। কিন্তু গাজী তার প্রেমে পড়েন। পুঁথিতে বলা হচ্ছে—
বিধুমুখী চম্পাবতী কার কাছে আছে বসি
জ্বলিতেছে রূপ যিনি লক্ষ কোটি শশী।
হঠাত্ চম্পার রূপ নয়নে হেরিয়া
মূর্চ্ছিত হইয়া গাজী পড়িলো ঢলিয়া।
গাজী ছিলেন সংসারবিবাগী মানুষ। কার্যত মুকুট রায়ের কাল হয় জাতিবিদ্বেষ। ভাই কালুকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে মুকুট রায়ের দরবারে পাঠিয়েছিলেন গাজী। কিন্তু মুকুট রায় তাঁকে বন্দি করেন। এরই জেরে লাউজানিতে মুকুট রায়ের সঙ্গে গাজী পীরের যুদ্ধ হয় ১৩৬৫ সালে। গাজীর দল যুদ্ধে জেতে। মুকুট রায় সপরিবারে আত্মহত্যা করেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র কামদেব ও চম্প?াবতী বন্দি হন গাজী বাহিনীর হাতে। পরে ইসলাম গ্রহণ করে কামদেব হন পীর ঠাকুর। আর ভক্তদের অনুরোধে চম্পাকে বিয়ে করেন গাজী। গাজীর নামেই গড়ে ওঠে গাজীর হাট, গাজীপুর, গাজীর জাঙ্গাল, গাজীডাঙ্গা, গাজীর ঘাট, গাজীর দেউল, গাজীর খাল, গাজীর ঘুটো ইত্যাদি এলাকা। বনে গাজীকে প্রাণভরে স্মরণ করে বনজীবীরা।
