কাযা নামাজের বিধান :একটি ফিক্হী পর্যালোচনা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৯, ২১:২২

মহান রাববুল আলামীন প্রতিটি এবাদতের যেমন পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছেন, তেমনি প্রতিটি এবাদতের সময়ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এই নির্ধারিত সময়ের বাইরে কোনো এবাদত সম্পন্ন করা যায় না। যেমন-সময়ের পূর্বে নামায আদায় করা যায় না। কারণ কোরআনে করীমে নামায সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে যে, নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সূরা আল-নিসা:১০৩)। অনুরূপভাবে রমযানের রোযা রমযান মাস শুরু হওয়ার পূর্বে আদায় করা যাবে না। এ সম্পর্কে কুরআনে করীমে বর্ণনা এসেছে যে, রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে (সূরা আল-বাকারাহ:১৮৫)। অনুরূপভাবে যাকাত নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সম্পদের যাকাত আদায় করতে হয় এবং  হজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আদায় করে নিতে হয় অন্যথায় তা সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে গণ্য হবে না। তবে যে এবাদত সম্পর্কে কোরআনে করীমে বা হাদিসে অনুমোদন আছে তা অন্য সময়ে কাযা হিসেবে আদায় করা যাবে, যেমন রমযানের রোযা সম্পর্কে বলা হয়েছে, আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে রোযা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না (সূরা আল-বাকারাহ:১৮৫)।

কোরআনে করীমে নামাযের পদ্ধতি ও সময় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা না থাকলেও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসুল (স) কে হযরত জিব্রাঈলের (আ) মাধ্যমে নামায আদায় করার পদ্ধতি ও সময় সম্পর্কে জ্ঞাত করেছেন, যেমন হযরত ইব্ন আব্বাস থেকে বর্ণিত: হাদিসের ভাবার্থ {হযরত জিব্রাঈল (আ) প্রথম দিন নামাযের সময় শুরু হওয়া মাত্র আল্ল­াহর রাসুল (স) কে নিয়ে নামায আদায় করেন এবং দ্বিতীয় দিন একেবারে শেষ সময়ে একই পদ্ধতিতে নামায আদায় করে বলেন: এটি পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণের নামাযের সময় এবং এই দু’সময়ের মধ্যবর্তী সময় আপনি এবং আপনার উম্মাতের নামায আদায় করার নির্ধারিত সময় (সূনানে তিরমিযি ও আবু দাউদ)। সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে অথবা পরে নামায আদায় করার কোনো সুযোগ নেই। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি কোনো কারণে নামায আদায় করা না হয় অন্যান্য এবাদতের (রমযানের রোযা, ফরয যাকাত ও হজ) ন্যায় কাযা হিসেবে নামায আদায় করা যাবে কিনা সেই বিষয়ে ফকীহদের মতোবিরোধ রয়েছে।

নামায আদায়ে ফিক্হী বিধান

কোরআন-সুন্নাহর আলোকে নামায আদায়ের শর্তাবলীর পরিপূর্ণ ব্যতীত নামায আদায় সঠিকভাবে পরিশুদ্ধ নয়, যেমন শরীর, স্থান ও পোশাকের পবিত্রতা, নর-নারীর শরীরের প্রয়োজনীয় অংশ পরিধেয় থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। যদি পবিত্র হওয়ার পানি অথবা মাটি পাওয়া না যায় তাহলে শরয়ী বিধান হলো—উক্ত নামাযের নির্দিষ্ট সময়ের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অতঃপর পানি অথবা মাটি প্রাপ্ত না হলে শেষ সময়ে অপবিত্র অবস্থায় নামায আদায় করে নিতে হবে। অনুরূপভাবে কারো পরিধেয় পোশাক না থাকলে নামাযের নির্দিষ্ট সময়ের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অতঃপর শেষ সময় পর্যন্ত সতর ঢাকার পরিধেয় কোনো বস্তু প্রাপ্ত না হলে নগ্নাবস্থায় বসে নামায আদায় করে নিতে হবে। অনুরূপভাবে নামাযের অভ্যন্তরীণ শর্তাদির ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য, যেমন দাঁড়িয়ে নামায আদায়ে অক্ষম ব্যক্তি বসে নামায আদায় করবে, বসেও নামায আদায়ে অক্ষম ব্যক্তি শুয়ে নামায আদায় করবে, শুয়েও নামায আদায়ে অক্ষম ব্যক্তি ইশারা-ইঙ্গিতে নামায আদায় করবে, তাও যদি করতে না পারে তাহলে নামায আদায়ে সে বিরত থাকবে এবং এ বিষয়ে ফিক্হী মাযহাবের সকল ইমামগণ ঐকমত্য পোষণ করেন, এতে কারো দ্বীমত নেই।

কাযা নামায সম্পর্কে ইমামগণের অভিমত

চার মাযহাবের ইমামগণসহ অধিকাংশ ফকীহগণ কোনো কারণে নামায ছুটে গেলে তা কাযা হিসেবে আদায় করার ব্যাপারে অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং তাঁদের অভিমতের স্বপক্ষে আল্লাহর রাসুল (স)’র নিম্নোক্ত হাদিস প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন, এরশাদ হচ্ছে— ‘যে ব্যক্তি নামাযের সময় ঘুমিয়ে ছিল অথবা নামায আদায় করতে ভুলে গিয়েছিল যখনই ঘুম থেকে জেগে উঠবে অথবা স্মরণ হবে তখনই নামায আদায় করে নিবে, এটি ব্যতীত তার অন্য কোনো বিকল্প নেই (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। আলোচিত হাদিসের মূল বিষয়বস্তু হলো— ঘুমের কারণে অথবা ভুলে নামায ছুটে গেলে তা স্মরণ হওয়া মাত্র নামায আদায় করার নির্দেশনা প্রতীয়মান হয়। এ হাদিসের উপর ভিত্তি করে কোনো কোনো ফিক্হী গ্রন্থে ‘ওমর কাযা’ বা আজীবন কাযা আদায় করার বিষয়েও মতামত ব্যক্ত করা হয় (ফাতয়া আলমগিরী)।

কাযা নামাযের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আল্লাহর রাসুল (স)’র জীবনে এই রকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। প্রথমত আহযাবের যুদ্ধের শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য, মদীনায় বসবাসরত ইহুদি গোত্র বনী কুরাইযাহ’র চুক্তি লঙ্ঘন এবং মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র সব মিলিয়ে যুদ্ধপরিস্থিতি খুবই জটিল আকার ধারণ করলে আল্লাহর রাসুল (স) সরাসরি পরিস্থিতি তদারকি করতে গিয়ে এই যুদ্ধে আসরের নামায আল্লাহর রাসুল (স)’র ছুটে যায় এবং তা সূর্যাস্তের পর কাযা হিসেবে আদায় করেছিলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম ব্যতীত অন্যান্য হাদীস গ্রন্থের বর্ণনায় একাধিক নামায ছুটে গিয়েছিল বলে উল্লে­খ রয়েছে যা আল্লাহর রাসুল (স) নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আদায় করেছিলেন।

তাছাড়া হযরত আবু হুরাইরাহ ও হযরত বেলাল থেকে বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত যে, কোনো এক যুদ্ধ থেকে আল্লাহর রাসুল (স) সাহাবীদের নিয়ে রাতে মদীনায় ফিরেছিলেন এবং দীর্ঘ সফর ও নির্ঘুমের কারণে সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অতঃপর আল্লাহর রাসুল (স) একটু বিশ্রাম নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে হযরত আবু হুরাইরাহ অথবা হযরত বেলালকে নামাযের সময় জাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব প্রদান করেন। ঘুমানোর কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদ্বয় নামাযের সময় জাগিয়ে দিতে ব্যর্থ হন। অতঃপর সূর্যোদয়ের পর ঘুম ভাঙলে আল্লাহর রাসুল (স) দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন:এখানে শয়তানের উপস্থিতি ঘটেছে। তারপর তিনি সাহাবায়ে কিরামদের নিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করে অন্য স্থানে পৌঁছে আযান-ইকামাহসহ ফজরের নামায কাযা হিসেবে আদায় করেছিলেন।

উপরিউক্ত দুটো ঘটনা থেকে কাযা নামায আদায় করা বৈধ প্রতীয়মান হয় অথচ শরীয়তের বিধান মতে প্রতিটি এবাদতের সময় নির্দিষ্ট করা আছে এবং নির্ধারিত সময়ের বাইরে কোনো এবাদত করা যায় না। তাছাড়া নামায সম্পর্কে কোরআনে করীমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদায় করার বিধান আছে, এরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে’(সূরা আল-নিসা:১০৩)। অর্থাত্ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নামায আদায় করতে হবে।

এ কারণে কেউ কেউ মনে করেন যে, যেহেতু কাযা নামাযের শরীয়তে কোনো বিধান নেই তাই নামায কাযা হিসেবে আদায় করা যাবে না। বরঞ্চ গাফলতির কারণে নামায ছুটে যাওয়ায় বেশি বেশি নফল নামায পড়ে মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে ক্ষমা পার্থনা করাই উত্তম (ফাতহুল বারী:২/৪৭, নাইলুল আওতার: ২/২৭)।

তবে উক্ত হাদিসে গাফলতি নয় যৌক্তিক কোনো কারণে নামায ছুটে গেলে তা আদায় করার বিধানের কথা বলা হয়েছে। মূলত অধিকাংশ ফকীহগণের মতে নামায কোনো কারণে ছুটে গেলে তা কাযা হিসেবে আদায় করা আবশ্যক। তারা আল্লাহর রাসুলের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহের উপর ভিত্তি করে অভিমত প্রদান করেন।

lলেখক : হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, সাবেক ডিন,

শরীয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ,

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম