রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের তুলসীবরাট গ্রামে মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে—যাহা খুবই নিন্দনীয় বলিয়া আমরা মনে করি। ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাত্রে এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করা সম্ভব না হইলেও বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়াছেন। ঘটনাটি দুঃখজনক অভিহিত করিয়া তিনি এই মর্মে আশ্বস্ত করিয়াছেন যে, ঘটনার সহিত জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। অচিরেই তাহাদের আইনের আওতায় আনা হইবে। ঘটনাটি যে খুবই উদ্বেগজনক তাহাতে সন্দেহ নাই। দেশের আনাচে-কানাচে এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যে মাঝেমধ্যে ঘটে—তাহাও অস্বীকার করা যাইবে না। তবে স্বস্তির বিষয় হইল— দেশে চমত্কার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও স্বস্তির পরিবেশ বিরাজমান। তাহার তাত্পর্যপূর্ণ একটি প্রমাণ হইল, এমনকি মন্দিরে চোরাগুপ্তা হামলার ঘটনাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পাইয়াছে গত কয়েক বত্সরে। আমরা মনে করি, ইহা সম্ভব হইয়াছে প্রধানত এই ব্যাপারে সরকারের আপসহীন মনোভাব এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন ভূমিকার কারণে। পাশাপাশি, স্থানীয় প্রশাসনের অবদানও অনস্বীকার্য।
বিশ্বজুড়িয়া যখন ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি নানা অছিলায় নিরীহ নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরিতেছে, তখন বাংলাদেশে শান্তি ও সম্প্রীতির এই বাতাবরণ গর্বের বিষয় শুধু নহে, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য অপরিহার্যও বটে। বাংলাদেশের সাফল্য এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে আত্মতুষ্টিতে ভুগিবার কোনো অবকাশ নাই। হিংসা ও বিভেদের শক্তি যেইভাবে দিকে দিকে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলিতেছে, তাহাতে এক মুহূর্তের জন্যও শৈথিল্য প্রদর্শনের উপায় নাই। আমাদের চোখের সম্মুখে কত দেশ তছনছ হইয়া গিয়াছে, আরও কত দেশকে তছনছ করিবার ষড়যন্ত্র চলিতেছে—তাহা বিস্মৃত হইলে চলিবে না। তবে আমাদের সফলতা হইল, ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। শত শত বত্সর ধরিয়া বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করিয়া আসিতেছে। তাহা সত্ত্বেও এই মাটিও যে সাম্প্রদায়িকতার রক্তে কলুষিত হয় নাই—এমন কথা বলা যাইবে না। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটিলে দেখা যাইবে, ইহার জন্য এই জনপদের সাধারণ মানুষ দায়ী নহে। দায়ী হইল উপরতলার কুচক্রীরা। হীন রাজনৈতিক স্বার্থে বারবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টা হইয়াছে। আর এই ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শক্তির কূটচালের বিষয়টিও সর্বজনস্বীকৃত।
অতএব, আমাদের সতর্ক থাকিতে হইবে। দেশি-বিদেশি কোনো অপশক্তিই যাহাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই বাতাবরণকে বিন্দুমাত্র ব্যাহত করিতে না পারে, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে যেকোনো মূল্যে। বলা বাহুল্য, যত সদিচ্ছাই থাকুক প্রশাসনের একার পক্ষে ইহা কখনোই সম্ভব নহে। এই ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকাটি পালন করিতে হইবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণকে। কারণ প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা রাত্রির অন্ধকারে কাহারা মন্দিরের মূর্তি ভাঙচুর করিয়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করিয়া ফায়দা লুটিতে চাহে—তাহা জনপ্রতিনিধিদের চাইতে ভালো করিয়া আর কেই-বা জানে!
