শুধু পরীক্ষা নয়, বইয়ের চাপ কমানোও জরুরি

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৯, ২১:৪৪

গত ১৩ মার্চ প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিশুদের উপর চাপ কমাতে ও তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে সুগম করতে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা না নেওয়ার পক্ষে তার মতামত ও যুক্তি তুলে ধরেন। এতদিন নানাভাবে বিষয়টি আলোচিত হলেও এ ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি; কিন্তু ছোট ছোট শিশুকে পরীক্ষার চাপে পিষ্ট হওয়ার দশাটি যেহেতু খোদ প্রধানমন্ত্রীকে ভাবিত করেছে এবং পরীক্ষা না নেওয়ার ব্যাপারে তিনি নির্দেশনাও দিয়েছেন তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা কার্যকর করতে তত্পর হয়ে উঠেছেন যা ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে গতকাল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবও বলেছেন, মূল্যায়ন পদ্ধতি ঠিক করে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বর্তমানে দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলে পা ফেলার পর থেকেই শ্রেণিকক্ষ কেন্দ্রিক পরীক্ষা নামের এক ধরনের উত্পীড়ন শিশুর জীবনে হানা দেয় এবং কেড়ে নেয় স্বাধীন ভাবে হেসে-খেলে বেড়ে ওঠার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা। পরীক্ষা কী তা বোঝার আগেই যেন চাপিয়ে দেওয়া হয় তার সাধ্যের অতিরিক্ত পড়া ও এর পাশাপাশি নানা ধরনের ও নামের গতানুগতিক পরীক্ষার বোঝা। এসব পরীক্ষা নিয়ে শিশুদের মাঝে প্রতিযোগিতা না থাকলেও অভিভাবকদের মাঝে শুরু হয় এক অশুভ প্রতিযোগিতা এবং এই প্রতিযোগিতায় সফলকাম হওয়ার জন্য সন্তানদের জোর করে গেলানো হয় পাঠ্যবই। কোনো কোনো বাবা-মা তো স্কুলের পাশাপাশি নিজেরা সার্বক্ষণিক সন্তানকে পড়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন কিংবা প্রাইভেট টিউটর পর্যন্ত নিয়োগ করেন শিশুসন্তানটি যাতে পরীক্ষায় ভালো ফল করেন। এ যেন শুধু সন্তানের পরীক্ষা নয়, পিতা-মাতারও অগ্নিপরীক্ষা। কেননা সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে বা ফার্স্ট হতে না পারলে তো ইজ্জত থাকবে না। এতে করে অতি অল্প বয়সে শিশুর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ভালো রেজাল্টের প্রতি এক অদৃশ্য প্রবণতা। যে কারণে শিশুরাও শেখার চেয়ে ভালো রেজাল্টকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করে। আর যখনই কেউ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভে ব্যর্থ হয় তখনই অভিভাবকদের দিক থেকে নানা ভর্ত্সনার শিকার হতে হয় যা তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। কেউ কেউ চরমভাবে হতাশায় নিমজ্জিত হয় এমনকি আত্মহত্যার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে।

একটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, বিনোদন অপরিহার্য-সন্দেহ নেই। আমাদের গ্রামীণ জীবনে শিশুর খেলাধুলা বা বিনোদনের সুযোগ এখনো কিছুটা থাকলেও নগর জীবনে তা দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বাসা-বাড়িতে শিশুদের বন্দি জীবনে টিভি বা মোবাইল বিনোদনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলগুলোতে খেলার মাঠ যেমন নেই, তেমনি নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রম। যতটুকু আছে তাও আবার পড়ালেখা বা পরীক্ষার চাপে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে না কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। উপরন্তু এখানে এমনসব বই পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেগুলো শিশুর বয়স, সক্ষমতা, যথার্থতা বিবেচনা করে করা হয়নি। কোনো কোনো স্কুলে অযৌক্তিকভাবে প্রয়োজনাতিরিক্ত বই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক অভিভাবকও মনে করেন, যে স্কুলে যত বেশি বই, যত বেশি পড়া বা পরীক্ষা সে স্কুল তত ভালো। এমনকি শিশুর সাথে যেভাবে আচরণ করার কথা তাও বা কজনই করেন। কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেমন নেই যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক তেমনি শিক্ষার নামে শিশুর উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বইয়ের বোঝা ও পরীক্ষার খড়গ।

আমার মেয়ে রাহা ঢাকার মোটামুটি নামকরা একটি স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ছে। অথচ ওর সিলেবাস, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখে মনে হয় আমরা যা ফাইভ/সিক্সে পড়েছি তা ওদের ক্লাস ওয়ানেই শেখানোর জন্য জবরদস্তি করা হচ্ছে। এতে ওর উপর যে চাপ তৈরি হয়েছে তার ফলে ওর কাছ থেকে বার বার একটি প্রশ্ন শুনতে হয়— বাজান পড়ালেখা, পরীক্ষা কে আবিষ্কার করেছে? অতএব, শুধু পরীক্ষার চাপ কমানোই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি বইয়ের চাপও কমাতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শিশুর জন্য শুধু পাঠদান নয় বরং বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই শিশুর লেখাপড়ার প্রতি যেমন আগ্রহ তৈরি হবে, তেমনি তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত হবে।

n লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়