দেশপ্রেমের এক অপূর্ব প্রেরণার উত্স

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৯, ২১:৪৪

মুক্তিযোদ্ধারা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনকে করেছে গৌরবোজ্জ্বল ও মহিমান্বিত। বাঙালি জাতি এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য গর্বিত এবং তাঁদের নিকট চিরকৃতজ্ঞ।

এ দেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এ দেশের আপামর জনতা মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেশের মুক্তিকামী জনতার সঙ্গে বিজিবি (তত্কালীন ইপিআর) মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে ঢাকার পিলখানাস্থ ইপিআর সদর দপ্তর। তত্কালীন ইপিআর বাহিনী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়্যারলেসযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা কয়েকজন ছাত্রনেতার মাধ্যমে পিলখানার ২ নম্বর গেটে তত্কালীন ইপিআর-এর সুবেদার মেজর শওকত আলীর নিকট পৌঁছে। সুবেদার মেজর শওকত আলী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পিলখানাস্থ ইপিআর ওয়্যারলেসযোগে টেলিগ্রাফিক মেসেজ এর মাধ্যমে কোম্পানি হেডকোয়ার্টার, চট্টগ্রামে প্রেরণ করেন। চট্টগ্রামে ইপিআরের কর্তব্যরত সিগন্যালম্যান মো. আবুল খায়ের মেসেজটি গ্রহণ করেন এবং ইপিআর এর বাঙালি অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিক এর নিকট হস্তান্তর করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা-বার্তাটি প্রেরণের অপরাধে সুবেদার মেজর শওকত আলীকে পিলখানাস্থ বাসা থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আটক করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা-বার্তা প্রেরণকারী এই দুঃসাহসী বীরযোদ্ধাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত অমানুষিক নির্যাতন করে এবং পরবর্তীকালে তাঁকে হত্যা করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাড়িতে মুক্তিকামী উত্ফুল্ল জনতার মাঝে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে ধরেন। একই দিনে তত্কালীন ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) সদর দপ্তরে মুক্তিকামী জোয়ানরাও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ইপিআর এর বাঙালি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদাপূর্ণ সাহসী এ কাজের জন্য এ বাহিনীর (বিজিবি) প্রত্যেক সদস্য আজ গর্বিত।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে ইপিআর এর বাঙালি সদস্যরা রণকৌশলগত কারণে বুড়িগঙ্গা নদীর অপর তীরে জিঞ্জিরায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তত্কালীন ইপিআর এর বাঙালি সৈনিকেরা ১১টি সেক্টরে ৯ মাস যুদ্ধে নিয়োজিত থাকেন। ইপিআর এর প্রায় ৮ হাজার বাঙালি সদস্য সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও সিলেটে ইপিআর এর বাঙালি সদস্য ও পাক বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। দেশের প্রতিটি সেক্টর ও উইং হেডকোয়ার্টারের বাঙালি অফিসার, জেসিও এবং বিভিন্ন পদবির সৈনিকেরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ, গেরিলা যুদ্ধ, আত্মঘাতী আক্রমণ ও শত্রুঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করতে অসংখ্য দুর্ধর্ষ অপারেশন পরিচালনা করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অপরিসীম বীরত্বের জন্য এ বাহিনীর দু’জন সৈনিক সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত হন। তাঁরা হলেন শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স (ইপিআর) এ যোগ দেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টর, যশোরের অধীনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর পর যখন মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করা শুরু হয় তখন তিনি যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানার গোয়ালহাটি গ্রামে স্থাপিত একটি ক্যাম্পের অধিনায়কের দায়িত্ব পান। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গোয়ালহাটি গ্রামের এক প্রান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে শহীদ হন।

দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত বিজিবি’র সৈনিকেরা তাদের পূর্বসূরি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মহিমায় গর্বিত ও অনুপ্রাণিত। তাই এ বাহিনী দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে তার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সর্বদা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানিয়ে থাকে। বাহিনীর সদর দপ্তরসহ রিজিয়ন, সেক্টর ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের আওতাধীন অঞ্চলে বসবাসকারী অত্র বাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যগণকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিশেষ করে বিজিবি সদর দপ্তরে মুক্তিযোদ্ধাগণের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ বাহিনীর দুইজন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স  নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফের পরিবারের সদস্যগণকে বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়ে থাকে।

দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দায়বদ্ধতা থেকে বিজিবি’র গৃহীত পদক্ষেপগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়, যা দেশবাসীর কাছে প্রেরণার উত্স হিসেবে কাজ করে। 

n লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ, পিলখানা, ঢাকা