যশোরের উন্নয়ন : সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে বক্তারা বলেছেন, যশোরের উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। এজন্য যশোরের নেতৃত্বকে দায়ি করেন তারা। পরে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে এক হয়ে কাজ করলে যশোরের উন্নয়ন সম্ভব। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের দ্বিতীয় আইসিটি পার্ক যশোরে নির্মাণের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, এখনই সময় এসেছে যশোরে দেশের তৃতীয় অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা দেয়ার। কারণ এই যশোর দেশের সবচেয়ে বেশি জেলাভিত্তিক রাজস্ব দেয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রধান জেলা। অন্যসব পুরাতন ও বৃহৎ জেলার অনেক উন্নয়ন ঘটেছে। যশোরের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। যশোরে বিভাগ প্রতিষ্ঠা, সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা, একটি কন্টেইনার টার্মিনাল স্থাপন করা, শিশু পার্ক স্থাপনসহ আরো অনেক উন্নয়নের দাবি উঠে আসে দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত ‘যশোরের উন্নয়ন: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক গোল টেবিল বৈঠকে। সোমবার যশোর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এই গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার, যশোর পৌর মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন, যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান, ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের সাবেক সভাপতি এম আর খায়রুল উমাম, কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ, নওয়াপাড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এনামুল হক বাবুল, বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন, যশোর জেলা হ্যাচারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খাঁন, গদখালী ফুল চাষি সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম, তির্যকের সম্পাদক দীপংকর দাস রতন, ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক রণজিৎ বাওয়ালী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ধারা’র নির্বাহি পরিচালক লিপিকা দাসগুপ্ত, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহ-সভাপতি মাহবুবর রহমান মজনু, দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত প্রমুখ।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ভৈরব সংস্কার আন্দোলনের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আফসার আলী, কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের আহবায়ক অনীল বিশ্বাস, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি হাবিবা শেফা, জয়তী সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক অর্চনা বিশ্বাস, জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ যশোর শাখার সভপাতি শ্রাবণী সুর, রাজারহাট চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দীন মুুকুল, বিশিষ্ট ব্যবসায়ি মিজানুর রহমান মিজান, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি নূর ইসলাম, যশোর জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ফকির শওকত, গাইদঘাট কৃষি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন কেন্দ্রের সম্পাদক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল প্রমুখ।
দৈনিক ইত্তেফাকের যশোর অফিস প্রধান আহমেদ সাঈদ বুলবুলের সঞ্চালনায় গোল টেবিল বৈঠকে যশোরের উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যশোরে আইসিটি পার্ক হবে। সেই অনুযায়ী আইসিটি পার্ক হচ্ছে। কিন্তু এখানে সবজিভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। ফুল চাষিদের জন্য সুখবর রয়েছে যে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এগ্রো প্রোডাক্ট প্রসেসিং বিভাগ খোলা হয়েছে। এই বিভাগ যশোরে কৃষিকে এগিয়ে নিতে কাজ করবে। যশোর বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এগ্রি ফ্যাকাল্টি, বিজনেস ফ্যাকাল্টি ও ট্যানারি টেকনোলজি ইন্সটিটিউট চালু হলে এই এলাকার কারিগরি শিক্ষায় অনেক ভূমিকা রাখতে পারবে। যশোরে শিশুদের জন্য আমরা এখনও কিছুই করতে পারিনি। শিশুদের জন্য এই শহরকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একটি শিশুপার্ক নির্মান করা যেতে পারে।
যশোর পৌর মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন, ভবদহকে ঘিরে টিআরএম প্রকল্প ছিল। সেই প্রকল্প চালু করতে গিয়ে এলাকায় এলাকাবাসী-পুলিশ সংঘর্ষ হয়। প্রকল্প বাতিল হয়। এখন আবার ওই প্রকল্প চালু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসলে যশোর সিটি কর্পোরেশন হবে। আমরা যশোর পৌরবাসী উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। পৌরবাসীর করের টাকা দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটার জন্য প্রকল্পের টাকা দরকার। এর জন্য সরকারের কাছাকাছি যেতে হবে। যশোরে দলমত নির্বিশেষে বলতে হবে, ‘আমরা এই শহরকে ভালবাসি’। এখানে কোন সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই।
বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, উন্নয়নে যশোর পিছিয়ে আছে। দলমত নির্বিশেষে ভেদাভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু যশোরে কেউ ‘মুরব্বী’ হতে পারেনি। উন্নয়নে রাষ্ট্রের টাকার অভাব নেই। সেই উন্নয়ন ঘরে তুলতে আমরা আমাদের অভাব, অভিযোগ রাষ্ট্রের সঠিক জায়গায় উত্থাপন করতে পারিনি। আমরা ছোট করেছি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের একজন পরম ‘শ্রদ্ধেয়’ ব্যক্তি প্রয়োজন, যার কথা যশোরে সবাই শুনবে।
কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবীর বলেন, যশোরের নওয়াপাড়া একটি শিল্পাঞ্চল ও নদীবন্দর। কিন্তু নদীর নাব্যতার সমস্যা ও অবৈধ দখলদারিত্ব নদী বন্দরকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। ভবদহ সমস্যা এই জনপদের অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, যশোরে একটি কন্টেইনার ডিপো স্থাপন করা হোক। কারণ একমাত্র যশোরকে ঘিরে রয়েছে চারটি বন্দর যেমন ভোমরা, বেনাপোল, দর্শনা ও মংলা। এই বন্দরসমূহের সাথে যশোরের রয়েছে রেল, নৌ ও সড়ক পথে যোগাযোগ। ঢাকার পর চট্টগ্রাম যেমন দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল বলা হয়, ঠিক তেমনি যশোরকে তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা যেতে পারে।
জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খাঁন বলেন, যশোরে হ্যাচারি শিল্প গড়ে উঠেছে। কিন্তু অনেক হ্যাচারি বন্ধ হয়ে গেছে। যশোরে ফিশ কোল্ড স্টোরেজ নেই। রেনু উৎপাদন করতে গিয়ে বিদ্যুত পাচ্ছে না। হ্যাচারি শিল্প বলা হলেও শিল্পের প্রণোদনা নেই এখানে।
নওয়াপাড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এনামুল হক বাবুল বলেন, নওয়াপাড়া নদীবন্দর সর্বশেষ ২০০৮ সালে ড্রেজিং করা হয়েছে। নাব্যতার অভাবে নদীবন্দর ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এটাকে বাঁচাতে হবে।
ধারা’র নির্বাহী পরিচালক লিপিকা দাসগুপ্তা বলেন, নকশিকাঁথা তৈরিতে সরকারের কোন পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এ শিল্প এখন অনেক জায়গায় হয়েছে। কিন্তু এর গুনগত মান নিশ্চিত করতে হবে।
গদখালী ফুল চাষি সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, যশোর থেকে ফুল উৎপাদন করে সারাদেশে বাজারজাত করতে সমস্যা হচ্ছে। এজন্য এখানে ফুলের জন্য একটি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা প্রয়োজন। আমাদের ফুল বিদেশ রফতানি করা হয়। ফুল রফতানির কোন সরকারি নীতিমালা নেই। ফুলের গবেষণার জন্য একটি গবেষণা কেন্দ্র যশোরে স্থাপন করা প্রয়োজন।
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বেনাপোল বন্দরে চিঠি দিয়েছে। এখানে মালামাল পরিবহনে তাদের সমস্যা হচ্ছে। আসলে বেনাপোলে মালামাল স্থানান্তরে কোন ক্রেন নেই। এমন একটি অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় বেনাপোল বন্দরের উন্নয়নের জন্য ‘বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা উচিত।
সাংস্কৃতিক সংগঠন তির্যকের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাস রতন বলেন, যশোরে খেলাধুলার একটি একাডেমি হওয়া দরকার। এখানকার তরুন সমাজ মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা রোধ করতে এখনই সঠিক সময়। তিনি বলেন, খেজুরের রসের দেশ যশোরে খেজুরের একটি বড় বাগান তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহ-সভাপতি মাহবুবর রহমান মজনু বলেন, যশোরে ভারতের কনস্যুলেট সেন্টার চালু হওয়া প্রয়োজন। যশোরে একটি শ্রমিক চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণ হলে এখানকার শ্রমিকরা উপকৃত হবেন।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালী বলেন, নদী কাটা বন্ধ করতে হবে। এখানে টিআরএম প্রকল্প লাগবে। প্রকৃতির সঙ্গে বিজ্ঞান দিয়ে যুদ্ধ চলে না।
ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ব্যক্তির প্রভাবই একেক জায়গায় উন্নতি হয়-যেটা এখানে না হয়ে ওখানে হয়-তাহলে কী আমাদের ব্যক্তি প্রভাব নিয়ে ভাবতে হবে ? যশোরে অনেক কাজ আছে। এখান থেকে সরকারের কোষাগারে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব যায়। রেনু, পোনা ও মাছ উৎপাদন, ফুল চাষ, কৃষিতে বিপ্লব-এসবই যশোরের অবদান। যশোরের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে। এখানে নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে আরো উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেন, যশোর অত্যন্ত সম্ভাবনাময়ী একটি জেলা। এই জেলার উন্নয়নের জন্য সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। যশোরের উন্নয়নে লেখনীর মাধ্যমে ইত্তেফাক তার ভূমিকা রাখবে।
প্রতিনিধি বৈঠক
গোল টেবিল বৈঠক শেষে দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন যশোর অফিস প্রধান আহমেদ সাঈদ বুলবুল এবং যশোরের কেশবপুর উপজেলা সংবাদদাতা আশরাফ-উজ-জামান, মণিরামপুর সংবাদদাতা বোরহানউদ্দীন, ঝিকরগাছা সংবাদদাতা একরামউল্লাহ স্বপন, চৌগাছা সংবাদদাতা আবু জাফর, বেনাপোল সংবাদদাতা কাজী শাহজাহান সবুজ ও অভয়নগর সংবাদদাতা বদরুজ্জামানের সঙ্গে যশোর অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ এবং পত্রিকার সার্কুলেশন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এ সময় ইত্তেফাকের উপজেলা সংবাদদাতারা ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অবহিত করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন দৈনিক ইত্তেফাকের খুলনা অফিস প্রধান এনামুল হক ও ফটো সংবাদিক দেবব্রত রায়ের সঙ্গে কথা বলে খুলনা অফিস সম্পর্কে অবহিত হন। এ সময় ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত উপস্থিত ছিলেন।
চাঁদের হাট পরিদর্শন
দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বিকালে সাংস্কৃতিক সংগঠন চাঁদের হাট পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি শিশু কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রায় চাঁদের হাটের ভূমিকার প্রশংসা করেন। এসময় চাঁদের হাটের উপদেষ্টা অশোক রায় ও মোবাশ্বের হোসেন বাবু, তারকা সদস্য ড. বাদল প্রামানিক, কবির উদ্দীন ও তুরানী চৌধুরী এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ সাঈদ বুলবুল উপস্থিত ছিলেন।
