গত বারের মতো এবারও ইংরেজি ও গণিতে ভালো করেছে শিক্ষার্থীরা। কমেছে গণিত ও ইংরেজিভীতি। যার কারণে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল এসেছে। অভিভাবকদের বাড়তি নজর, শিক্ষকদের প্রচেষ্টা আর শিক্ষার্থীদের ভালো করার আগ্রহের কারণে এবার জেএসসি ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ বেড়েছে। অন্যদিকে পিইসির ফলও সন্তোষজনক হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার একযোগে প্রকাশিত হয়েছে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফল। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে পিইসি ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার ফল। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এসব পরীক্ষার ফলাফলের কপি হস্তান্তর করেন। পরে দুপুর ১২টায় শিক্ষামন্ত্রী এবং ১টায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে ফল সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
সারাদেশের অর্ধকোটিরও বেশি পরিবারে এখন উচ্ছ্বাস। বইছে আনন্দের বন্যা। ভালো ফল করে নেচে গেয়ে উত্সব করছে শিক্ষার্থীরা।
সপ্তম বারের মতো অনুষ্ঠিত জেএসসি (অষ্টম শ্রেণি) পরীক্ষায় আটটি বোর্ডে গড় পাসের হার ৯২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত জেডিসি পরীক্ষায় পাসের হার ৯৪ দশমিক ০২ শতাংশ। আর সার্বিক পাসের হার ৯৩ দশমিক ০৬ শতাংশ। আর পিইসিতে পাসের হার ৯৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ও ইবতেদায়ি সমাপনীতে পাসের হার ৯৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
ফল সংগ্রহের জন্য বাবা-মাকে নিয়ে গতকাল দুুপুরেই শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয় স্কুল প্রাঙ্গণে। ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। কোথাও কোথাও ছিল অন্যরকম আয়োজন। স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, ড্রামের তালে তালে নেচে-গেয়ে শিশুরা বাবা-মায়ের সাথে আনন্দ করছে। ভালো ফলের কারণে অনেকের চোখে ছিল আনন্দ অশ্রুও। মিষ্টির দোকানগুলোতেও উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।
জেএসসি-জেডিসি
এবার জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় মোট ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫৯ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ২১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৭৫ জন। এরমধ্যে জেএসসিতে অংশ নেয় ১৯ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৬ জন, পাস করেছে ১৮ লাখ ৯১ হাজার ৪৯৬ জন। জেডিসিতে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৪৭৯ জন। গতবারের চেয়ে জেএসসিতে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ বেড়েছে। জেএসসিতে পাসের হার বেড়েছে দশমিক ৫৮ শতাংশ। জেডিসিতেও বেড়েছে ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এবার জেএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯। গতবার ছিল ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০২ জন। এবার জেডিসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১২ হাজার ৫২৯ জন। গতবার এ সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৭৬১ জন। এবারও জেএসসি এবং জেডিসিতে সেরা প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়নি।
ঢাকা বোর্ড : এই বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৬৫০ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯ জন। পাসের হার শতকরা ৯১ দশমিক ৩৬ ভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৬ হাজার ৩৫০ জন।
রাজশাহী বোর্ড : এই বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ৮৯২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৬১৭ জন। পাসের হার শতকরা ৯৭ দশমিক ৬৮ ভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৪৭১ জন।
কুমিল্লা বোর্ড : এই শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ৮৯ দশমিক ৬৮ ভাগ। এবছর এই বোর্ডে অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৮ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯ হাজার ১৮৬ জন শিক্ষার্থী।
যশোর বোর্ড : এই বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৩৪০ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৪২৮ জন। পাসের হার শতকরা ৯৫ দশমিক ৩৫ ভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২২ হাজার ৩ জন ।
চট্টগ্রাম বোর্ড : এই বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৫ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫২৪ জন। পাসের হার শতকরা ৯০ দশমিক ৭৫ ভাগ। মোট পাস করা পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৪ হাজার ১৩৫ জন ।
বরিশাল বোর্ড : এ বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৪৭ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৭৭১ জন। মোট পাসের হার ৯৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এবার বোর্ডে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৫৭০ জন ।
সিলেট বোর্ড : এই বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৭০৩ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৩৪ জন। পাসের হার শতকরা ৯৩ দশমিক ৩৭ ভাগ। মোট পাস করা পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ হাজার ২৫৫ জন ।
দিনাজপুর বোর্ড : এই বোর্ডে পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৭২১ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৫২৫ জন। পাসের হার ৯২ দশমিক ৯৯ ভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৭ হাজার ৮৯ জন।
প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী
এবার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে পাসের হার ৯৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ও ইবতেদায়ি সমাপনীতে পাসের হার ৯৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় পাসের হার প্রাথমিকে কমেছে শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ ও ইবতেদায়িতে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ।
গত বছর প্রাথমিকে পাসের হার ছিল ৯৮ দশমিক ৫২ ও ইবতেদায়িতে ৯৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। দুটি পরীক্ষায় গত বছরের তুলনায় ৬ হাজার ৩৯৩ জন বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এবার দুটি সমাপনীতে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৬ জন। এরমধ্যে প্রাথমিকে জিপিএ-৫ পেয়েছে দুই লাখ ৮১ হাজার ৮৯৮ জন, অপরদিকে ইবতেদায়িতে পেয়েছে ৫ হাজার ৯৪৮ জন।
গত বছর মোট জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩। এরমধ্যে প্রাথমিকে দুই লাখ ৭৫ হাজার ৯৮০ জন, অপরদিকে ইবতেদায়িতে পেয়েছিলো পাঁচ হাজার ৪৭৩ জন।
দুটি পরীক্ষায় ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ২৩৪ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে পাস করেছে ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ২৫০ জন। প্রাথমিকে মোট পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে ২৮ লাখ ৩০ হাজার ৭৩৪ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩২ জন। অপরদিকে ইবতেদায়িতে অংশ নিয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৮ জন।
পাসের হার বিবেচনায় সাত বিভাগের মধ্যে শীর্ষে বরিশাল বিভাগ। এ বিভাগে পাসের হার ৯৯ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ। ৬৪ জেলার মধ্যে প্রথম রয়েছে মুন্সিগঞ্জ। সেখানে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৯২ ভাগ।
দেশের ৫০৮টি উপজেলার মধ্যে শতভাগ পাস করেছে ১৭টি উপজেলায়। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ৪ হাজার ৩৩২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৪ হাজার ১৬৫ জন। পাসের হার ৯৬ দশমিক ১৪ ভাগ।
ইবতেদায়ি : ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৭৩ জন। ছাত্রী ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২৭ জন। মোট পাস করেছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৮ জন। পাসের হার ৯৫ দশমিক ৮৫ ভাগ। জিপিএ- ৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৯৪৮ জন। ১০৫টি উপজেলায় শতভাগ পাস করেছে। পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে। ছাত্রদের পাসের হার ৯৫ দশমিক ৬৩ ভাগ।
ভাল ফলের কারণ
ইংরেজি ও গণিতে পাসের হার বাড়ায় সার্বিক পাসের হার বেড়েছে। গতবার ৮ সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে ইংরেজিতে পাস করে ৯২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এবার এ হার বেড়ে হয়েছে ৯৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এবার গণিতে পাস করেছে ৯৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। গতবার গণিতে পাস করে ৯৬ দশমিক ১৮ শতাংশ।
পিইসিতে এবার ইংরেজিতে ৯৯ দশমিক ২৭ শতাংশ ও গণিতে ৯৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ পাস করে। ইবতেদায়ি সমাপনীতে ইংরেজিতে ৯৯ দশমিক ২৩ এবং গণিতে ৯৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ পাস করে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, গ্রামের শিক্ষার্থীরা গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল হওয়ায় গ্রামের পাসের হার কম। অন্যদিকে শহরের শিক্ষার্থীদের চিত্র উল্টো। ইংরেজি ও গণিতে বাড়তি নজর দেয়ায় এ দুটি বিষয়ে পাসের হার বেড়েছে।
এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষার গুণগত মান আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী যে মান দরকার তা থেকে আমরা অনেক পেছনে আছি। আমাদের ছেলে-মেয়েদের মান উন্নত করাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করে পাঠদানের ফলে একটা সার্বিক উন্নতি সাধিত হয়েছে। এ উন্নতির সঙ্গে সমস্যাও এসেছে উন্নত সমস্যা। যা আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। প্রতি বছর প্রশ্ন ফাঁস একটি বিপদ যা এখন নেই। প্রাথমিক সমাপনীতে পাসের হার বৃদ্ধির জন্য উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য পৃথক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এটা সত্য নয়। লোকমুখে তো নানা কথা শোনা যায়।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের দুর্বল বিষয়গুলোর প্রতি আমরা বাড়তি যত্ন দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা সাধারণত ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানে দুর্বল থাকে। এ বিষয়গুলোর জন্য অতিরিক্ত ক্লাস নেয়া হয়েছে। এ কারণে ভাল ফল করেছে। এছাড়া আমরা মনিটররিং কর্মকাণ্ড জোরদার করেছি।
ইত্তেফাক/এএন
