আলোচনার শীর্ষে জঙ্গি হামলা, অভিযান

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০৯:৪৫
 
বিদায়ী বছরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সারাদেশে জঙ্গি হামলা। বছরজুড়ে জঙ্গিদের পৃথক হামলায় ৩৫ জন নিহত হন। আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত হয় ৩৭ জন। এদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জঙ্গি হামলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এছাড়া পরিবারের সকল সদস্যের জঙ্গি খাতায় নাম লেখানোর বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এরই জের ধরে বছরের শেষ সময়ে আশকোনায় সন্তানসহ নারী জঙ্গির আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ছিল বেশ আলোচিত।
 
বিশেষ করে জঙ্গি হামলায় গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ১৭ বিদেশিসহ ২২ জন এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদ জামাতে এক নারী ও দুই পুলিশ নিহতের ঘটনা সারা দুনিয়ায় হৈচৈ ফেলে দেয়। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। গ্রেফতার হয় দুই শতাধিক নারী, পুরুষ ও কিশোর জঙ্গি। যাদের অধিকাংশই আত্মঘাতী স্কোয়াডের সদস্য। এরপর থেকেই জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা বিশ্বের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে প্রমাণ করার যে চক্রান্ত চলছিল, তা নস্যাৎ হয়ে যায়।
 
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, ২০১৬ সালের শুরু থেকে সারাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী একের পর এক জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালিয়ে অনেকটা নিধন করতে পেরেছে। বছরের শুরুতে জঙ্গিদের যেভাবে উত্থান হয়েছে, শেষের দিকে এসে জঙ্গিদের পতনও তরান্বিত হয়েছে। সে হিসাবে আগামী বছর হয়ত জনগণের মাঝে শান্তি ফিরে আসবে। পুলিশও জঙ্গিদের সমূলে উত্পাটন করতে আরো জোরে কাজ করবে।
 
এ বছরের ১ জুলাই রাত সাড়ে ৯ টার দিকে গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়ি হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। নব্য জেএমবির পাঁচ জনের একটি দল এই হামলায় অংশ নেয়। ওই হামলায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন নিহত হন। রেস্তোরাঁর ভিতর জিম্মি করে আরো ১৭ বিদেশি নাগিরকসহ ২০ জনকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করে জঙ্গিরা। এ ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ চালায় সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো টিম। এতে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। তারা হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সাবিহ মোবাশ্বের, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল।
 
গুলশান হামলার মাধ্যমেই নব্য জেএমবি তাদের নাশকতার সামর্থ্যের জানান দেয়। এরপর নড়েচড়ে বসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। দেশের বিভিন্ন জেলা, বিভাগ এবং রাজধানীতে ব্লক রেইড চালান হয়। একের পর এক অভিযানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাশায়ী হয় নব্য জেএমবির সদস্যরা।
 
গুলশানের ঘটনার সাত দিনের মাথায় ৮ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের দিন পুলিশের ওপর হামলা চালায় নব্য জেএমবি’র একটি গ্রুপ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আবীর রহমান নামে নব্য জেএমবির এক সদস্য। আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয় শফিউল নামে আরেক জঙ্গি। পরে ৫ আগস্ট র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শফিউল ও তার সহযোগী আবু মোকাতিল নিহত হয়।
 
২৬ জুলাই কল্যাণপুরের তাজ মঞ্জিলের জঙ্গি আস্তানায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অভিযানে নিহত হয় ৯ জঙ্গি। যাদের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় মিললেও একজনের পরিচয় জানা যায়নি। পরিচয় পাওয়া ৮ জন হচ্ছে দিনাজপুরের আব্দুল্লাহ, টাঙ্গাইলের আবু হাকিম নাইম, ঢাকার ধানমণ্ডির তাজ-উল-হক রাশিক, ঢাকার গুলশানের আকিফুজ্জামান খান, ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সেজাদ রউফ অর্ক, সাতক্ষীরার মতিউর রহমান, রংপুরের রায়হান কবির ওরফে তারেক এবং নোয়াখালীর জোবায়ের হোসেন।
 
২৭ আগস্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালান হয় নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায়। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে নিহত হয় নব্য জেএমবির মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহম্মেদ চৌধুরী। এ সময় তামিমের সঙ্গে  নিহত হয় তার আরও দুই সহযোগী। তাদের একজন ধানমন্ডির তওসিফ হোসেন ও যশোরের ফজলে রাব্বী।
 
গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট অভিযান চালায় মিরপুরের রূপনগরে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম। গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সেখানে নব্য জেএমবি’র অন্যতম শীর্ষ নেতা ও আশ্রয়দাতা তানভীর কাদেরী নিহত হয়। সেখান থেকে আটক করা হয় তিন নারী জঙ্গি ও তানভীরের ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর গাজীপুরে র্যাব ও পুলিশের পৃথক অভিযানে ৯ জঙ্গি ও টাঙ্গাইলে ২ জঙ্গি এবং আশুলিয়ায় এক জঙ্গি নিহত হয়।
 
২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর আশকোনায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট অভিযান চালালে নারী জঙ্গি আত্মঘাতী হামলা চালায়। এতে শাকিরা নামে এক নারী জঙ্গি ও তানভীর কাদরীর ১৪ বছরের ছেলে আবীর নিহত হয়। পুলিশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আত্মসমর্পণ করে দুই নারী ও তাদের দুই সন্তান।গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, মেজর জিয়া ও মারজান গ্রেফতার হলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারের ধারা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশ সরকারের জঙ্গিবাদ নির্মূলে চালানো সাঁড়াশি অভিযানের প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে।