বহুতল ভবন যেন মৃত্যুফাঁদ

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৯, ২২:৫৮

রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। নেই ঠিকঠাক জরুরি নির্গমন ব্যবস্থাও। সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা অনুসরণ না করে তৈরি হওয়া ভবনগুলো পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে! ফায়ার সার্ভিস বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে ভবন মালিকদের নোটিস দিলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না ভবন মালিকরা। এমনকি নোটিসের জবাবও দেন না।             ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণে নিয়ম না মানা এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা না মানার ফলে বারবার মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা ও সম্পদের ক্ষতি বেড়েই চলেছে। বছরে কয়েকশ’ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে অগ্নিকাণ্ডে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রধান অফিস। এর সামনের ৬০ গজের মধ্যেই রয়েছে ঘিঞ্জি বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই মার্কেটটিতে আড়াআড়িভাবে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার দোকান। ১৯৯৬ সালে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল পুরো মার্কেটটি। আরো কয়েকবার আগুনে পুড়ে মার্কেটটি। কিন্তু প্রতিকার হয়নি। বিকার নেই কারও। বহুবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার হওয়ার পরও সেখানে নেই জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা। নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও। গতকাল বৃহস্পতিবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার বনানীর ভবনটিতেও ছিল না অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা। ফলে বাঁচার জন্য লাফিয়ে পড়েও মরতে হয়েছে কয়েকজনকে। কাছাকাছি থাকা বনানী সুপার মার্কেটেও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল।

ন্যাশনাল ফায়ার কোড প্রণয়ন কমিটির সদস্য বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালী বলেন, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও প্রতিকারে ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পথ এবং আগুন নেভানোর ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাত্ আগুন লাগলে মানুষ যাতে বেরিয়ে আসতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশস্ত সিঁড়ি এবং এক ভবন থেকে আরেক ভবনের প্রয়োজনীয় দূরত্ব রক্ষা করা জরুরি।

তিনি বলেন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বলতে লোকজন সাধারণত বুঝে ভবনে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকা। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। বহুতল ভবনে আগুন নির্বাপণ ও জরুরি নির্গমনে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি। এগুলো হলো-রাইজার স্থাপন, স্বয়ংক্রিয় স্প্রিং কলার, আন্ডারগ্রাউন্ড পানির রিজার্ভ, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, স্মোক ও হিট ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন ও ফায়ার লিফট নির্মাণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের অল্প কিছু ভবনেই এ নিয়ম মানা হয়। ফলে নিয়মিত বিরতিতেই অগ্নিকাণ্ডে হতাহত ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকার প্রায় তিন হাজার প্রতিষ্ঠানকে ভবনে যথাযথ অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ ব্যবস্থা রাখার জন্য চিঠি দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এরমধ্যে ২ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন এবং ৫০টির বেশি হাসপাতাল রয়েছে। রাজধানীর ১ হাজার ১২৬টি মার্কেটের মধ্যে আগুন ধরলে নেভানোর যথাযথ ব্যবস্থা আছে মাত্র ৪৬টিতে। অনিরাপদ এসব মার্কেটের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মার্কেট যেমন আছে তেমনই আছে নামকরা মার্কেটও।

চিঠি পাওয়া সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানই অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন মেনে চলছে না। অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা থাকলেও তা মানছেন না সিংহভাগ ভবন মালিক। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারা ও অর্থদণ্ডসহ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তির বিধানও রয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও এ আইন প্রয়োগের নিয়ম আছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সীমাবদ্ধতাসহ নানা কারণে এই আইনের প্রয়োগ নেই। নামমাত্র অনুমোদন নিয়ে বা না নিয়েই গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, মার্কেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অনিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কারণে নিয়ম না মানা ভবন মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর নির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভবন থেকে জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা আরো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আইন থাকলেও তা প্রয়োগে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই। অভিযান পরিচালনায় সময়মতো ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া যায় না। নেই পর্যাপ্ত জনবলও। তাই চোখের সামনেই অনেক ত্রুটিপূর্ণ ভবন গড়ে উঠলেও প্রতিরোধ-প্রতিকার করা যাচ্ছে না। রাজউকও এ ক্ষেত্রে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ভবন তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে গলদ থাকলে আগুন লাগতে পারে এবং ছড়িয়ে পড়তে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে। এ অবস্থার প্রতিকার না হলেও অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এবং অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রচেষ্টা সফল হবে না।