শ্রীমঙ্গলে বিজিবির গুলি একশ প্রতিষ্ঠানে হামলা

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৭, ২৩:৩৩

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের (বিজিবি) সদস্যরা শহরের চৌমুহনায় ব্যাপক ভাংচুর এবং ব্যবসায়ী ও পথচারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসময় বিজিবি সদস্যরা কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। এতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এরা হলেন শাহা আলম (২২) ও ইকবাল (২০)। এদের মধ্যে শাহা আলমের অবস্থা আশংকাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা। গতকাল বিকাল ৪ টার দিকে শহরের ভানুগাছ রোডের পানসী রেস্টুরেন্টের সামনে বিজিবি’র একটি গাড়ি পার্কিং করার সময় একটি মাইক্রোবাসের চালকের সঙ্গে কথা কাটাকাটির জের ধরে এই ঘটনা ঘটে বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন। ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনতা সিলেট-মৌলভীবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে। প্রায় পর মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তোফায়েল আহমদ ঘটনাস্থলে এসে ব্যবসায়ীদের আশস্ত করলে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়।

 
বিজিবি’র সদস্যদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের বিষয়ে ঢাকায় বিজিবি সদর দফতরে জনসংযোগ দফতর থেকে জানানো হয়েছে যে, বিকাল ৩ টার দিকে পানসী রেস্টুরেন্টের সামনে বিজিবি’র একটি গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছিল। ঐসময় একটি মাইক্রোবাস পার্কিংয়ের স্থানে প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বিজিবি’র গাড়িতে একজন মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন। মাইক্রোবাসটিকে সরে যেতে বললে ঘটনার সূত্রপাত হয়। ঐ মাইক্রোবাসের চালক গাড়ি থেকে নেমে বিজিবি’র গাড়ি চালকের সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে লিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে ঐ মাইক্রোবাস সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। এর আধঘন্টা পর বিজিবি’র ঐ গাড়ি সেখানে থেকে চলে যায়। শ্রীমঙ্গল বাস স্ট্যান্ডের কাছে কতিপয় ব্যক্তি বিজিবি’র গাড়িটি আটক করে। তারা গাড়ি থেকে বিজিবির গাড়ি চালককে নামিয়ে মারধর করে। এসময় বিজিবি’র ঐ মেজর ও তার বডিগার্ড বাধা দিলে তাদের ওপর চড়াও হয় তারা। অজ্ঞাত পরিচয় ঐ ব্যক্তিরা বিজিবি’র মেজরকে লাঞ্ছিত করে।
 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকাল ৪ টার দিকে বিজিবি’র চারটি গাড়ি শহরে প্রবেশ করে। তারা পানসী রেস্টুরেন্টে এসে ব্যাপক হামলা চালায়। রেষ্টুরেন্টের মালিক বেলাল হোসেন জানান, বিজিবির সদস্যরা রেস্টুরেন্টের চেয়ার টেবিল, ফ্রিজ ও সিসি ক্যামেরা ভাংচুর করে। এসসময় আশেপাশের জনতা বিজিবি’র সদস্যদের কাছে এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে তারা গুলি ছোঁড়ে।
 
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানায়, বিজিবির সদস্যরা শ্রীমঙ্গল শহরের বিভিন্ন মার্কেটের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। তারা মল্লিকা ভ্যারাইটি স্টোর, ইব্রাহিম টেলিকম, সেলিনা সাইকেল পার্টস, মৌসুমী স্টোর, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ, পেটুক নাইরী মিষ্টির দোকান, রেনুশ্রী বস্ত্রালয়, মিনি কসমেটিক, মায়া হার্ডওয়্যার, জনতা ফার্মেসি ও জামাল স্টোরসহ শতাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জিনিসপত্র ভাংচুর করে। এক পর্যায়ে বিজিবি’র সদস্যরা শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। এসময় তারা রাস্তায় কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। অভিযোগ রয়েছে, বিজিবি’র সদস্যরা অর্ধশত কার ও মাইক্রোবাস ভাংচুর করে। ৩ টি মিনিবাসের জানালার কাঁচও রেহাই পায়নি তাদের হামলা থেকে।
 
বিজিবি’র সদস্যদের এই হামলায় আহতদের মধ্যে শাহ আলম (২২), ইকবাল (২০), বিকাশ দেব(২৫), আব্দুল নূর বুলবুল (২৭), মাসুদ (৩৫), মুক্তি গ্লাস হাউসের কর্মচারী কুদ্দুস মিয়াসহ (২৫) ১০ জনকে শ্রীমঙ্গল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ইকবালকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
 
শ্রীমঙ্গলে কর্মরত গণমাধ্যম কর্মীদের ওপরও লাঠিপেটা করেছে বিজিবি’র সদস্যরা। এমন অভিযোগ তুলে স্থানীয় একজন গণমাধ্যম কর্মী জানান, সাংবাদিকররা ছবি তোলার সময় বিজিবি সদস্যরা তাদের ক্যামেরা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তারা সংবাদকর্মীদের ব্যাপক মারধরও করে।
 
শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি মামুন আহমেদ বলেন, বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনকভাবে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালিয়েছে। চোখের সামনে তারা কোটি কোটি টাকার জিনিসপত্র ভাংচুর করে। এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ সকালে শ্রীমঙ্গলের চৌমোহনায় ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
 
এদিকে শ্রীমঙ্গলে এমন হামলার প্রতিবাদে স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাধারণ জনতা ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। তারা বিক্ষোভ মিছিল করে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান। এক পর্যায়ে জনতা ঢাকা-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার মহাসড়কটি অবরোধ করে।
 
ঘটনার প্রায় ২ ঘন্টা পর মৌলভীবাজারের জেলা প্রসাশক মো. তোফায়েল আহমদ শ্রীমঙ্গলে আসেন। এসময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রনধীর কুমার দেব, নির্বাহী অফিসার মো. শহীদুর হক প্রমুখ। জেলা প্রশাসক জনগণের জানমাল ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সবাইকে নির্বিঘ্নে দোকান খোলার জন্য আদেশ দেন। প্রসাশনিকভাবে স্থানীয়দের সহযোগিতায় একটি কমিটি করে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস দেন। জেলা প্রশাসকের এমন আশ্বাসের প্রেক্ষিতে সড়ক অবরোধ তুলে নেয় স্থানীয় জনতা।

ইত্তেফাক/এএন