চট্টগ্রামে কয়েক হাজার ভবন ও মার্কেট অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। এরমধ্যে নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, তামাকুমন্ডি লেন, জহুর হকার মার্কেট, পাহাড়তলী, খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ এলাকার বেশকিছু মার্কেট ও ভবন অন্যতম। এসব এলাকার আবাসিক ভবন ও মার্কেটের অধিকাংশেরই ফায়ার লাইসেন্স নেই, থাকলেও নবায়ন করা হয় না। ভবনের পাশে কোনো উন্মুক্ত স্থান কিংবা জলাশয়ও নেই। ভূমিকম্পেও এসব ভবন চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।
ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, শীত মৌসুমে ভবনের ভেতরে থাকা মালামাল, আসবাবপত্র শুষ্ক থাকে। ফলে শটসার্কিট থেকে সহজেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শীতকালের অগ্নিকাণ্ডে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়।
সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে অন্তত পাঁচটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে চট্টগ্রামের প্রশাসন। জেলা প্রশাসন এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট ও ভবনগুলোতে অভিযান শুরু করেছে। অনেক ভবনের মালিক ও ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে সতর্ক করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান মুক্ত ইত্তেফাককে বলেন, বাণিজ্যিক এলাকা আসাদগঞ্জে একশ’টি ক্যামিকেলের দোকান রয়েছে। প্রতি দোকানের আলাদা গুদামও আছে। কিন্তু এদের বেশিরভাগেরই ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই। দুর্ঘটনা ঘটলে আশ-পাশের অন্তত দু’শ স্থাপনা ছাই হয়ে যাবে।
নগরীর তামাকুমন্ডি লেনে দেখা গেছে, সেখানকার অনেক মার্কেটই পুরনো হওয়ায় এমনিতে ঝুঁকিপূর্ণ। তার সাথে প্রতিটি মার্কেটের গলি এতো সরু যে একসাথে একাধিক লোক হাঁটার সুযোগও নেই। অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের সুযোগ নেই। আগুন নেভানোর জন্য পানির কোনো উত্স নেই। এই লেনে পাঁচ হাজারের অধিক দোকান রয়েছে। যেগুলো বেশিরভাগই ইলেকট্রনিক্স, কাপড়, জুতো, কসমেটিকসের। আবার বেশিরভাগ মার্কেটের দ্বিতীয় তলা থেকে উপরের দিকে গুদাম এবং কোনো কোনো ভবনের উপরের অংশ আবাসিক হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে। আবার মার্কেট ও ভবনগুলোর গা ছুঁয়েই বিদ্যুতের তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর রাতের বেলায় এসব মার্কেটের বেশিরভাগ প্রবেশপথ বন্ধ থাকে। এমন অবস্থায়- এই এলাকায় আগুন লাগলে বিপুল পরিমাণ জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা আছে। ভবন থেকে বের হতে না পেরে ধোঁয়ার কারণেও মৃত্যুর আশঙ্কা আছে।
জানতে চাইলে তামাকুমন্ডি বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল খালেক বলেন, এখানকার দোকান ও মার্কেটগুলো বেশিরভাগই পুরনো হওয়ায় এই অবস্থা বিরাজ করছে। তবে ধীরে ধীরে পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই অবস্থা থাকবে না। জহুর হকার্স মার্কেটে দেখা গেছে, সেখানকার দোকানগুলোও ঘিঞ্জি পরিবেশে তৈরি করা হয়েছে। আগুন নেভানোর জন্য পানির কোনো উত্স নেই। হাতেগোনা দু’একটা দোকান ব্যতিত অন্য কোনো দোকানে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই।
একই অবস্থা জিইসি মোড়ের সেন্ট্রাল প্লাজায়। ১৬৬টি দোকানের এই মার্কেটে অন্তত দুইবার আগুন লাগার পরও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জোরদার করেনি ভবনের মালিকপক্ষ। বরং মার্কেটের তিনটি সিঁড়ির একটি সার্বক্ষণিক বন্ধ থাকে। গত সপ্তাহে এই মার্কেটকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এছাড়া খাতুনগঞ্জ-আসাদগঞ্জ, পাইকারি কাপড়ের দোকান টেরিবাজার, রেয়াজউদ্দিন বাজার, আগ্রাবাদ এলাকার সিঙ্গাপুর মার্কেট, পাহাড়তলী এলাকার চাল-ডালসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়তসহ বেশিরভাগ মার্কেট ও ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু রুটিন অভিযানে থেমে না থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা পরিষদ, চিটাগাং চেম্বার, বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়িক মালিক সমিতিকে নিয়ে শীঘ্রই একটি সভার আয়োজন করা হবে।
ইত্তেফাক/এএন
