: টিংকুর আম্মা!
এক প্রবল ধ্বনি বেশ জোরেশোরেই হাতুড়ি পিটিয়ে গেল বুকের পাঁজরে। ধড়ফড় করে চমকে উঠলেন জাহানারা রাব্বী। ঘুমোননি তিনি। তন্দ্রার ঘোরে কখন যেন চোখ দুটো বুজে এসেছিল।
তিনি খাটে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। অন্ধকার নিকষ কালো ঘর। ছুমছাম। সারা শহরে বিদ্যুত্ নাই। ব্ল্যাক আউট। আবার শহর জুড়ে কার্ফ্যুও। এ সময়ই বাতাসের তরঙ্গে গম্ভীর আওয়াজটা যেন ভেসে এল। ডা. ফজলে রাব্বীর কণ্ঠস্বর। প্রতিটি শব্দ পরিষ্কার।
এ কেমন ধ্বনি? শুধুই কি আহ্বান? মৃত্যুগামীর আর্তচিত্কার? নাকি বিজয়ধ্বনি?
ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালেন জাহানারা। টিংকুর আব্বা ফিরে এসেছেন! অন্ধকারেই ছুটে গেলেন তিনি। হাতড়ে হাতড়ে দরজার ছিটকিনি খুললেন। রাতের আঁধার তোয়াক্কা না করে পড়িমরি ছুটে গেলেন সিঁড়ি বেয়ে। নিচতলায়। সিঁড়ির দরজা বন্ধ। জাহানারা ব্যাকুল। খুঁজছেন তাঁর স্বামীকে। ছুটে এল বাবুর্চি-দারোয়ানরা।
না তিনি নেই। তিনি আসেননি। ফেরেননি।
তারা জাহানারাকে ধরাধরি করে এনে শোবার ঘরে এনে রাখল।
আত্মমগ্ন জাহানারার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে : তিনি আসেননি। তিনি নেই। তবে কণ্ঠস্বরটি যে তাঁরই। এল কোত্থেকে।
ফজলে রাব্বী তখন রায়েরবাজার ইটখোলায়। রক্তাক্ত দেহ নিয়ে প্রিয় স্বদেশের মাটি আঁকড়ে ধরে আছেন। তাঁর উষ্ণ রক্তস্রোত ভিজিয়ে দিচ্ছে মাটি—ভোরেই মুক্তির সূর্য উঠবে বলে।
তিনি আটক ছিলেন লালমাটিয়া ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে। ১৫ই ডিসেম্বর দিবাগত রাতে পাকিস্তানি ঘাতকরা তাঁকে সেখান থেকে ট্রাকে তুলে নিয়ে আসে রায়েরবাজার।
আজব লোক এই ডাক্তার। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সা করেছেন। আর্থিক সহযোগিতাও দিয়েছেন। কিছুই স্বীকার করানো যায় নাই তাঁকে দিয়ে। ঘাতকরা তাঁকে ভয় দেখাতে চেয়েছে নানা কায়দায়। ভয়ও নেই তাঁর। শান্ত। স্থির।
ধরে আনা লোকেরা ঘাতকদের হাতে-পায়ে ধরে। অনুনয় বিনয় করে মুক্তি চায়। ভয়ে কাঁপে। ফজলে রাব্বীই তাঁদেরকে বলেন, আমাদের যখন মেরেই ফেলবে, ওদের সাথে কথা বলে কী হবে?
রায়েরবাজার নেয়ার আগে রাত দশটায় পাক আর্মি তাঁকে জেরা করে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কোনো কথাই বের করতে পারেনি। মেপে মেপে জবাব দিয়েছেন।
বিরক্ত ঘাতকরা তাঁকে তুলে নিল মৃত্যুপথের ট্রাকে।
যেতে যেতে ফজলে রাব্বী ভাবলেন, তাঁর স্ত্রীর স্বপ্ন কী আশ্চর্যভাবে ফলে যাচ্ছে। পরপর দুদিন একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। জাহানারা তাঁর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা জায়গা জিয়ারত করছেন। তাঁর গায়ে সাদা চাদর। জায়গাটায় কী যেন রাখা আছে। তার চার পাশে চারটি কালো থাম।
ফজলে রাব্বী স্বপ্নটা শুনে গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন : তুমি বোধহয় আমার কবর দেখেছ টিংকুর আম্মা।
রায়েরবাজার ইটখোলা। মুখোমুখি ঘাতক। ফজলে রাব্বীর চোখ বাঁধা। হাত বাঁধা পিছমোড়া করে। তাঁর ভেতর কোনো ভয়-আতঙ্ক নেই। এখনি ছুটে আসবে বুলেট। এই তো দেশ। স্বাধীন হচ্ছে। এর বুকে বেড়ে উঠবে তাঁর তিন সন্তান। টিংকুর আম্মা ওদেরকে দেখো।
ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে বিদ্ধ করল তাঁকে। চিত্কার করে উঠলেন ফজলে রাব্বী : টিংকুর আম্মা!
এ আর্তনাদ নয়, আগামীকালের মুক্ত সূর্যোদয়ের প্রতি আহ্বান।
